ঢাকা মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২৮ জুন ১৯৭১: ইয়াহিয়ার সামরিক ছত্রচ্ছায়ায় সরকার গঠনের প্রস্তাব ও মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৫, ১১:১৩ এএম
ছবি: অমিও চক্রবর্তী

১৯৭১ সালের ২৮ জুন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান একটি বেতার ভাষণ দেন, যেখানে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) একটি নতুন সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে, মুজিবনগর সরকারসহ আন্তর্জাতিক মহলে এই প্রস্তাবের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এদিন মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত ঘটনাবলি, গণহত্যা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং শরণার্থী পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।

ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণ ও সরকার গঠনের প্রস্তাব

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৮ জুন একটি বেতার ভাষণে ঘোষণা দেন যে, শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, চার মাসের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে, তবে "পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা" ফিরে না আসা পর্যন্ত দেশ সামরিক শাসনের অধীনেই থাকবে।

প্রধান ঘোষণাগুলো:

  • আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ: যদিও নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ব্যক্তিগতভাবে তাদের পদ ধরে রাখবেন, তবে যারা "রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে" জড়িত তাদের সদস্যপদ বাতিল করা হবে।

  • উপনির্বাচনের মাধ্যমে শূন্য আসন পূরণ: আওয়ামী লীগের শূন্য আসনগুলোতে নতুন করে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি নেওয়া হবে।

  • সামরিক ছত্রচ্ছায়ায় সরকার: ইয়াহিয়া দাবি করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে সরকার চলবে।

মুজিবনগর সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইয়াহিয়ার প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা করে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার (মুজিবনগর সরকার) এবং আন্তর্জাতিক মহল।

১. বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়া:

  • এ এইচ এম কামারুজ্জামান (স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী) বলেন, "ইয়াহিয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রধান। তাঁর বিশেষজ্ঞ কমিটি পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য সংবিধান তৈরি করবে, পূর্ব বাংলার জনগণের এতে কোনো ভূমিকা নেই।"

  • মুজিবনগরে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের বৈঠক: তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা দেয় যে, শীঘ্রই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি অধিবেশন বসবে। এতে মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি, বৈদেশিক সাহায্য ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে।

২. ভারতের প্রতিক্রিয়া:

  • পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং লোকসভায় বলেন, "আওয়ামী লীগের কিছু দলত্যাগী সদস্যকে নিয়ে সরকার গঠন করা হলে তা বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তরই একমাত্র সমাধান।"

  • প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী দলনেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, "এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই। ভারতের ভূমিকা সহায়কের, কিন্তু মূল লড়াই তাদেরই করতে হবে। অসময়ে স্বীকৃতি দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।"

৩. অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া:

  • পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)-এর নুরুল আমিন ইয়াহিয়ার প্রস্তাবকে "জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ইতিবাচক পদক্ষেপ" বলে অভিহিত করেন।

  • জামায়াতে ইসলামীর গোলাম আযম বিবৃতিতে বলেন, "ইয়াহিয়ার ঘোষিত কর্মসূচিই জাতির জন্য একমাত্র পথ।"

সামরিক আদালতের রায় ও ছাত্রনেতাদের সাজা

ঢাকায় একটি সামরিক আদালত ছয় জন ছাত্রনেতাকে ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। এরা হলেন:

  • আ স ম আবদুর রব

  • আবদুল কুদ্দুস মাখন

  • নূরে আলম সিদ্দিকী

  • শাজাহান সিরাজ

  • মোস্তফা মহসীন মন্টু

  • খায়রুল ইনাম খসরু

এই রায় দেওয়া হয় অনুপস্থিতিতে, কারণ এ সময় তারা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি ও গণহত্যা

১. মুক্তিবাহিনীর অপারেশন:

  • কুমিল্লা: মুক্তিযোদ্ধারা রাজারমার দীঘিতে পাকিস্তানি ক্যাম্পে আক্রমণ করে একটি বাঙ্কার ধ্বংস করে এবং অস্ত্র লুট করে।

  • মনোহরপুর (কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক): মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশে কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। প্রতিশোধ হিসেবে হানাদার বাহিনী মনোহরপুর ও মাগুরা গ্রামে অগ্নিসংযোগ করে।

  • ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম): পাকিস্তানি সেনারা ভূরুঙ্গামারী দখল করে নেয়, মুক্তিযোদ্ধারা সোনাহাট সীমান্তে পুনর্গঠিত হয়।

২. কলসকাঠি গণহত্যা (বরিশাল):

২৮ মে ১৯৭১-এ পাকিস্তানি বাহিনী বরিশালের কলসকাঠি গ্রামে ৮৭ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। লাশগুলি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় এবং গ্রামটিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও শরণার্থী পরিস্থিতি

১. ব্রিটিশ সংসদীয় প্রতিনিধিদলের বিবৃতি:

বাংলাদেশ সফর শেষে টবি জেসেল সাংবাদিকদের বলেন,

  • "গ্রামে গ্রামে গণহত্যা ও লুণ্ঠন চলছে। স্থানীয়রা পালিয়ে গেছে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, শরণার্থীদের ফিরে যাওয়া এখন নিরাপদ নয়।"

২. বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধির রিপোর্ট:

হেমডিক ফ্যানডং কুষ্টিয়া সফর শেষে বলেন,

  • "কুষ্টিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মতো। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিমান হামলা ও লুটপাটে শহরটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।"

৩. যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকা:

  • রিচার্ড নিক্সন (মার্কিন প্রেসিডেন্ট) ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠিতে লেখেন, "পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে আমরা ইয়াহিয়াকে রাজি করাব। তবে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখাই আমাদের লক্ষ্য।"

  • ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুহার্তো ইয়াহিয়াকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, "পূর্ব পাকিস্তান ইস্যুতে পাকিস্তানের সিদ্ধান্তকে আমরা শ্রদ্ধা করি।"

২৮ জুন ১৯৭১-এ ইয়াহিয়ার সরকার গঠনের প্রস্তাব ছিল মূলত একটি কৌশলগত প্রপাগান্ডা, যা মুক্তিযুদ্ধের গতিকে থামাতে পারেনি। মুজিবনগর সরকার, ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে। এদিন মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ অপারেশন, গণহত্যার নির্মমতা এবং বিশ্বজনমত গঠনে প্রবাসী নেতাদের ভূমিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরও বেগবান করে তোলে।

সূত্র:

দৈনিক ইত্তেফাক, ২৯ ও ৩০ জুন ১৯৭১

দৈনিক আজাদ, ২৯ ও ৩০ জুন ১৯৭১

আনন্দবাজার পত্রিকা (ভারত), ২৯ জুন ও ২ জুলাই ১৯৭১

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (সপ্তম, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড)

দৈনিক পাকিস্তান, ২৯ মে ১৯৭১

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ২৯ মে ১৯৭১

সেক্টরভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস (সেক্টর ২, ৫ ও ৭)

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন

৭ জুন ১৯৭১: বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক তৎপরতা ও অবরুদ্ধ বাংলায় প্রতিরোধ

৬ জুন ১৯৭১: অসাম্প্রদায়িকতার ডাক, রাজনৈতিক সমাধানের ৪ শর্ত

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর অতিরিক্ত মার্কিন শুল্ক, কোন দেশে কত?

বাড়ল বিদ্যুতের দাম, মূল্যস্ফীতির আগুনে নতুন চাপ

নাটোরের ছাতনী গণহত্যা

৪ জুন ১৯৭১: ছাতনীতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, আন্তর্জাতিক চাপ ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধ

৩ জুন ১৯৭১: জাতিসংঘে তোলপাড়, বিশ্ব জনমত গঠন ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত

তোফায়েল আহমেদ / বর্ণাঢ্য রাজনীতির এক ফিনিক্স পাখি

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদ আর নেই

১০

১ জুন ১৯৭১: নগরকান্দা গণহত্যা, রণাঙ্গনে বিজয় ও বিশ্ব কূটনীতির নতুন মোড়

১১

৩১ মে ১৯৭১: ‘সমঝোতার সুযোগ নেই’, বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ ও রণাঙ্গনের খণ্ডচিত্র

১২

৩০ মে ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা, রণাঙ্গনের প্রতিরোধ ও বিশ্ব কূটনৈতিক অঙ্গন

১৩

রক্তস্নাত বুরুঙ্গা গণহত্যা (সিলেট)

১৪

২৬ মে ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা, প্রতিরোধ ও বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গন

১৫

ভীমনালী গণহত্যা: যে নির্মম ট্র্যাজেডি আজও এক উপেক্ষিত

১৬

২২ মে ১৯৭১: গণহত্যা, প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি

১৭

১৬২ পয়েন্টে ১৬০০ গডফাদার: কার ইশারায় ঢুকছে মাদক?

১৮

হত্যা মামলায় রক্তাক্ত সাংবাদিকতা

১৯

১৮ মে ১৯৭১: পাকিস্তানের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তীব্র প্রতিবাদ ও কূটনৈতিক যুদ্ধ

২০