ঢাকা রবিবার, ৩১ আগস্ট ২০২৫, ১৬ ভাদ্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২৩ জুন ১৯৭১: পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ

এই দিনটি মুক্তিযুদ্ধের গতিপথকে ত্বরান্বিত করেছিল, আন্তর্জাতিক সমর্থন বৃদ্ধি করেছিল এবং পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বজনমতকে ক্রমশ নেতিবাচক করে তুলেছিল।
প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৫, ১২:২৭ পিএম
ছবি: আনন্দবাজার
ছবি: আনন্দবাজার

১৯৭১ সালের ২৩ জুন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এদিন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের খবর প্রকাশিত হওয়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও মুজিবনগর সরকারের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এছাড়া, বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে বিবৃতি দেন এবং রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ

২২ জুন নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করছে। এ খবর প্রকাশের পর ভারত ও মুজিবনগর সরকার তীব্র নিন্দা জানায়।

  • মুজিবনগর সরকারের প্রতিবাদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে পাঠানো এক তারবার্তায় বলেন, "পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানোর সংবাদে আমরা মর্মাহত। বাংলাদেশে গণহত্যা চলছে, বাড়িঘর পোড়ানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ বাঙালিদের ওপর আরও নির্যাতনের সুযোগ করে দেবে।"

  • যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান প্রতিরক্ষা দপ্তরের মুখপাত্র জেরি ফ্রিড হাইস স্বীকার করেন, একটি জাহাজে অস্ত্র পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, ২৬ মার্চের পূর্বেই এ অস্ত্রের লাইসেন্স মঞ্জুর করা হয়েছিল।

  • ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গলেন স্টোনকে দু’বার তলব করে। পররাষ্ট্রসচিব টি এন কাউল সতর্ক করে বলেন, "পাকিস্তানকে অস্ত্র দেওয়া হলে পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটবে। ভারত ইতিমধ্যে ৬০ লাখ শরণার্থীর বোঝা বহন করছে।"

  • যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বিতর্ক ডেমোক্র্যাট সিনেটর স্টুয়ার্ট সিমিংটন বলেন, "পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানো অবৈধ ও নৈতিকতাবিরোধী। এটি পূর্ব বাংলার নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে।" তিনি পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহিতা দাবি করেন।

ব্রিটেন ও জাতিসংঘের অবস্থান

  • যুক্তরাজ্য ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালেক ডগলাস হিউম কমন্স সভায় ঘোষণা দেন, "পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক সমাধান না আসা পর্যন্ত ব্রিটেন পাকিস্তানকে নতুন কোনো সাহায্য দেবে না।"

  • জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, "শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি।"

ভারতীয় নেতৃত্বের সোচ্চার ভূমিকা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে এক ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে স্পষ্ট বার্তা দেন:

“পূর্ববঙ্গে শান্তি ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া বিকল্প নেই। শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার জাতীয় নেতা। তার সঙ্গেই আলোচনা করতে হবে এবং তাকে মুক্তি দিতে হবে।”

  • সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত নিকোলাই পেগভ ইন্দিরা গান্ধীর কাছে প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের বার্তা পৌঁছে দেন এবং বলেন, "সোভিয়েত ইউনিয়ন যেকোনো পরিস্থিতিতে ভারতের পাশে আছে।"

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা

  • জুলফিকার আলী ভুট্টোর বক্তব্য পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা ভুট্টো বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ইয়াহিয়া খানের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।

  • মাহমুদ আলীর বিদেশ সফর পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা মাহমুদ আলী সরকারি দূত হিসেবে "পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি" ব্যাখ্যা করতে বিদেশ সফরে যান।

মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ

২৩ জুন মুক্তিবাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে সফল অপারেশন চালায়:

  • কুমিল্লা: মুক্তিযোদ্ধারা ইয়াকুবপুর ও খৈনলে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ৮ জনকে হত্যা করে।

  • মাদারীপুর: নড়িয়ায় যুদ্ধে ৭-৮ জন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করে।

  • কুষ্টিয়া: ভেড়ামারায় মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে ২০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।

সূত্র

  • বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (৫ম, ১০ম, ১২শ, ১৩শ খণ্ড)

  • দৈনিক আনন্দবাজার, যুগান্তর, অমৃতবাজার পত্রিকা (২৩-২৫ জুন ১৯৭১)

  • নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন (২২ জুন ১৯৭১)

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ক্র্যাক প্লাটুনের অদম্য সাহসিকতা ও ত্যাগের গল্প

৩০ আগস্ট ১৯৭১: দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের উদ্বোধন

২৮ আগস্ট ১৯৭১: মোগরার বিল গণহত্যা (মোহনপুর, রাজশাহী)

২৮ আগস্ট ১৯৭১: পাকুড়িয়া গণহত্যা (মান্দা, নওগাঁ)

২৮ আগস্ট ১৯৭১: দিরাই ও শাল্লা এলাকা হানাদারমুক্ত হয়

২৭ আগস্ট ১৯৭১: দেয়াড়া গণহত্যা (খুলনা)

২৭ আগস্ট ১৯৭১: কচুয়া বধ্যভূমি (বাগেরহাট)

২৭ আগস্ট ১৯৭১: লাতিন আমেরিকায় পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রস্তাব

২৬ আগস্ট ১৯৭১: নারী নির্যাতনে ইয়াহিয়ার সৈন্যরা মধ্যযুগের বর্বরতাকে হার মানিয়েছে

২৫ আগস্ট ১৯৭১: সিলেটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অমানুষিক অত্যাচার

১০

২৫ আগস্ট ১৯৭১: মানসা গণহত্যা ও বধ্যভূমি (বাগেরহাট)

১১

২৭ আগস্ট ১৯৭১: লন্ডনে প্রবাসী সরকারের কূটনীতিক মিশন উদ্বোধন

১২

২৫ আগস্ট ১৯৭১: কানলা গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৩

২৬ আগস্ট ১৯৭১: পূর্বপাড়া ওয়ারলেস কেন্দ্র গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৪

২৬ আগস্ট ১৯৭১: পশ্চিমগ্রাম গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৫

২৬ আগস্ট ১৯৭১: দাসপাড়া গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৬

২৬ আগস্ট ১৯৭১: কুণ্ডুবাড়ি হত্যাকাণ্ড

১৭

২৬ আগস্ট ১৯৭১: তীব্র আক্রমণের মুখে হানাদার বাহিনী কানসাট ছেড়ে পালায়

১৮

২৫ আগস্ট ১৯৭১: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক ঘটনাবহুল দিন

১৯

২৪ আগস্ট ১৯৭১: দেশজুড়ে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

২০