ঢাকা রবিবার, ৩১ আগস্ট ২০২৫, ১৬ ভাদ্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২২ জুন ১৯৭১: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ ও মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৫, ১১:০৫ এএম
ছবি: রঘু রাই
ছবি: রঘু রাই

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ১৯৭১ সালের ২২ জুন, নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ফাঁস হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পাকিস্তানের জন্য অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। 'পদ্মা' ও 'সুন্দরবন' নামে দুটি পাকিস্তানি জাহাজ মার্কিন অস্ত্র নিয়ে করাচির উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। 'সুন্দরবন' ৮ মে নিউইয়র্ক থেকে যাত্রা শুরু করে ২১ জুন করাচি পৌঁছায়, আর 'পদ্মা' ২২ জুন যাত্রা করে আগস্টের মাঝামাঝি পাকিস্তানে পৌঁছানোর কথা ছিল।

জাহাজ দুটিতে আটটি জঙ্গিবিমান, প্যারাস্যুট, কামান, ট্যাংকের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ছিল। এসব অস্ত্র মার্কিন বিমানবাহিনীর উদ্বৃত্ত মজুদ থেকে সস্তায় বিক্রি করা হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানো নীতিবিরুদ্ধ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এই সরবরাহ অব্যাহত থাকে। এমনকি, অপারেশন সার্চলাইটে ব্যবহৃত অস্ত্রও মার্কিন সরবরাহ থেকে এসেছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

এই খবরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করে, তবে তা তাদের পূর্বের প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন।" অন্যদিকে, জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তাও সমালোচিত হয়।

মুজিবনগর সরকারের তৎপরতা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মুজিবনগরে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, "এ মুহূর্তের প্রধান লক্ষ্য শত্রুমুক্ত ভূমিতে শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনা।" তিনি ভারতের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান, যারা লক্ষাধিক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে।

নেদারল্যান্ডস সফররত বাংলাদেশের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ডাচ সংসদীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশের গণহত্যার বিবরণ দেন। ডাচ সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান বলেন, "পাকিস্তানের এই নৃশংসতার পর বাংলাদেশের পৃথক রাষ্ট্র হওয়াই যুক্তিযুক্ত।"

ভারতের রাজনৈতিক আলোচনা দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী-র সভাপতিত্বে নব কংগ্রেসের সংসদীয় দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে কয়েকজন সাংসদ বাংলাদেশের পক্ষে সরাসরি হস্তক্ষেপের দাবি তোলেন। কাশ্মীরের সৈয়দ আহমদ আগার বলেন, "পাকিস্তানের বিভক্তি মুসলিমবিরোধী নয়; বরং পাকিস্তানের অত্যাচারই ইসলামবিরোধী।" অন্ধ্রপ্রদেশের পি. ভেঙ্কট সুদ্বিয়ার প্রশ্ন তোলেন, "আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও ভারত কি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা নিতে প্রস্তুত?"

এদিন সুচেতা কৃপালনি-র নেতৃত্বে আদি কংগ্রেসের একটি দল পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে। তিনি বলেন, "ভারত সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে।" পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় রেডিওতে ভাষণ দিয়ে শরণার্থীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘাত এড়ানোর আহ্বান জানান।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা করাচিতে জুলফিকার আলী ভুট্টো বিদেশি সাহায্য বন্ধের হুমকিকে "অপমানজনক" বলে আখ্যায়িত করেন। পাকিস্তান মুসলিম লীগের খান আবদুল কাইয়ুম খান শেখ মুজিবুর রহমানের সমর্থকদের রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলেন। জামায়াতে ইসলামীর গোলাম আযম ও নেজামে ইসলামীর মওলানা শামসুল হক সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত করার পক্ষে অবস্থান নেন।

ঢাকায় সামরিক প্রশাসন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সব দেয়াললিখন ও নির্বাচনী প্রতীক মুছে ফেলার নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এস.বি. জামান সেনাবাহিনীর দমননীতির প্রশংসা করে বলেন, "শান্তি কমিটির মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।"

মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযান মুক্তিবাহিনী সেদিন কুমিল্লার রাজাপুর, খুলনার বৈকরি, যশোরের বেনাপোল ও বগুড়ার পাঁচবিবিতে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর সফল আক্রমণ চালায়। কুমিল্লার অপারেশনে একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন, তবে ১৫ জন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়।

ব্রিটিশ প্রতিনিধিদলের পাকিস্তান সফর যুক্তরাজ্যের একটি সংসদীয় দল পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে করাচি পৌঁছায়। দলে ছিলেন লেবার পার্টির আর্থার বটমলি ও কনজারভেটিভ পার্টির জেমস র্যামডেন। তারা ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা করে ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করার কথা বলেন।

২২ জুন ১৯৭১-এ পাকিস্তানকে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করে, অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযান ও কূটনৈতিক তৎপরতা স্বাধীনতা সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়। ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বৈশ্বিক সমর্থন বাংলাদেশের পক্ষে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

সূত্র

  • নিউইয়র্ক টাইমস, ২২ জুন ১৯৭১

  • বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র

  • দৈনিক ইত্তেফাক, পাকিস্তান, অমৃতবাজার পত্রিকা (২৩ জুন ১৯৭১)

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ক্র্যাক প্লাটুনের অদম্য সাহসিকতা ও ত্যাগের গল্প

৩০ আগস্ট ১৯৭১: দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের উদ্বোধন

২৮ আগস্ট ১৯৭১: মোগরার বিল গণহত্যা (মোহনপুর, রাজশাহী)

২৮ আগস্ট ১৯৭১: পাকুড়িয়া গণহত্যা (মান্দা, নওগাঁ)

২৮ আগস্ট ১৯৭১: দিরাই ও শাল্লা এলাকা হানাদারমুক্ত হয়

২৭ আগস্ট ১৯৭১: দেয়াড়া গণহত্যা (খুলনা)

২৭ আগস্ট ১৯৭১: কচুয়া বধ্যভূমি (বাগেরহাট)

২৭ আগস্ট ১৯৭১: লাতিন আমেরিকায় পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রস্তাব

২৬ আগস্ট ১৯৭১: নারী নির্যাতনে ইয়াহিয়ার সৈন্যরা মধ্যযুগের বর্বরতাকে হার মানিয়েছে

২৫ আগস্ট ১৯৭১: সিলেটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অমানুষিক অত্যাচার

১০

২৫ আগস্ট ১৯৭১: মানসা গণহত্যা ও বধ্যভূমি (বাগেরহাট)

১১

২৭ আগস্ট ১৯৭১: লন্ডনে প্রবাসী সরকারের কূটনীতিক মিশন উদ্বোধন

১২

২৫ আগস্ট ১৯৭১: কানলা গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৩

২৬ আগস্ট ১৯৭১: পূর্বপাড়া ওয়ারলেস কেন্দ্র গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৪

২৬ আগস্ট ১৯৭১: পশ্চিমগ্রাম গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৫

২৬ আগস্ট ১৯৭১: দাসপাড়া গণহত্যা (ইটনা, কিশোরগঞ্জ)

১৬

২৬ আগস্ট ১৯৭১: কুণ্ডুবাড়ি হত্যাকাণ্ড

১৭

২৬ আগস্ট ১৯৭১: তীব্র আক্রমণের মুখে হানাদার বাহিনী কানসাট ছেড়ে পালায়

১৮

২৫ আগস্ট ১৯৭১: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক ঘটনাবহুল দিন

১৯

২৪ আগস্ট ১৯৭১: দেশজুড়ে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ যুদ্ধ

২০