ঢাকা সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১৭ জুন ১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৫, ১২:১৮ পিএম
১৭ জুন ১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

১৯৭১ সালের ১৭ জুন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এদিন কূটনৈতিক অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক সমর্থন, শরণার্থী সংকট এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনসহ নানা ঘটনা সংঘটিত হয়।

কূটনৈতিক অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে ১৭ জুন যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত তার কূটনৈতিক পরিচয়পত্র ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সরকারি বাসভবন বাকিংহাম প্যালেসে পেশ করা হয়। ব্রিটিশ সরকারের প্রাপ্তিস্বীকারপত্র বাংলাদেশের প্রতি তাদের অলোচিত সমর্থনকে ইঙ্গিত করে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা

ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে আলোচনায় বলেন, "পূর্ব বাংলার সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান হলো নির্বাচিত নেতা শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা।" তিনি আরও বলেন, বিশ্ব সম্প্রদায় যদি আগে থেকেই পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করত, তবে সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব হতো।

জাতিসংঘের শরণার্থী হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খানের সঙ্গে বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধী শরণার্থীদের ভয়াবহ অবস্থা তুলে ধরেন এবং পাকিস্তানের গণহত্যা বন্ধের দাবি জানান।

যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের অবস্থান

  • যুক্তরাষ্ট্র: ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের বলেন, "বাংলাদেশের মানুষ সার্বভৌমত্ব চায়, ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে চায় না।"

  • জাতিসংঘ: মহাসচিব উ থান্টের মধ্যস্থতায় ঢাকা থেকে ভারতীয় ও কলকাতা থেকে পাকিস্তানি কূটনীতিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব পাকিস্তান মেনে নেয়।

  • ইউরোপীয় দেশসমূহ: সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরি একত্রে পাকিস্তানের ওপর চাপ বৃদ্ধির আহ্বান জানায়।

  • নিউইয়র্ক টাইমস: সম্পাদকীয়তে পাকিস্তানকে মার্কিন সাহায্য বন্ধের দাবি করা হয় যতক্ষণ না তারা গণহত্যা বন্ধ করে রাজনৈতিক সমাধানে আসে।

ব্রিটিশ সংসদীয় দলের বিতর্কিত বক্তব্য

পাকিস্তান সফররত ব্রিটিশ এমপি জেমস টিন ও জিল নাইট ঢাকায় বলেন, "ব্রিটিশ মিডিয়া পাকিস্তানের পক্ষের খবর কম দেখায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল।" তাদের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের মাঠপর্যায়: সংঘর্ষ ও গণহত্যা

জগদীশপুর গণহত্যা

ঝালকাঠির জগদীশপুর, খাজুরা, রামপুর ও মিরাখালি গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জগদীশপুর স্কুল মাঠে জড়ো করে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। এতে প্রায় ৬০ নিরীহ মানুষ নিহত হন।

মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য

  • টাঙ্গাইল: বাশাইল থানার কামুটিয়া নর্থখোলায় কাদেরিয়া বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের সংঘর্ষে ৫ সেনা নিহত হয়।

  • চট্টগ্রাম: মুক্তিবাহিনীর চাঁদগাজী ঘাঁটিতে পাকিস্তানিরা ট্যাংক-মর্টার দিয়ে আক্রমণ চালালেও ক্যাপ্টেন অলি, শামসুল হুদা ও মতিউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণ করে ৪৫ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে।

  • ফেনী: বিলোনিয়ায় পাকিস্তানি বিমান হামলার মুখে মুক্তিযোদ্ধারা সরে গিয়ে চিতলিয়ায় নতুন ঘাঁটি গড়ে তোলেন।

  • দিনাজপুর: ঠনঠনিয়াপাড়ায় মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানিরা ব্যূহ ভেঙে পালাতে বাধ্য হয়।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া

  • দ্য স্টেটসম্যান (লন্ডন): ১২০ ব্রিটিশ লেবার এমপি বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান।

  • গায়ানা ইভনিং পোস্ট: সম্পাদকীয়তে ভারতের শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহায়তার আহ্বান জানানো হয়।

উপসংহার

১৭ জুন ১৯৭১ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক ও সামরিক অগ্রগতির একটি মাইলফলক। আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়, শরণার্থী ইস্যুতে ভারতের ভূমিকা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য এই দিনকে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। পাকিস্তানের গণহত্যা ও দমননীতির বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গঠনে এদিনের ঘটনাবলি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

তথ্যসূত্র

  • বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড)

  • দৈনিক ইত্তেফাক, পাকিস্তান, অমৃতবাজার পত্রিকা (১৮ জুন ১৯৭১)

  • নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য স্টেটসম্যান, গায়ানা ইভনিং পোস্টের প্রতিবেদন

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

টিআইবির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ / আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনের ‘অন্তর্ভুক্তি’ নিয়ে প্রশ্ন

সহিংসতার নতুন উচ্চতা / মব হত্যা দ্বিগুণ, অজ্ঞাত লাশ বেড়েছে, সংখ্যালঘু নির্যাতন তীব্র

জঙ্গি সংগঠনগুলোর ন্যারেটিভ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তির আহ্বান ও শ্বাশত মুজিব’

সবচেয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে ‘বীর’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জয় বাংলা’

ফরিদপুর স্টেডিয়াম বধ্যভূমি

ইতিহাসের সাক্ষী ঝিনাইদহের ‘প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ফলক’

স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য / রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

পবিপ্রবির ‘মুক্ত বাংলা’: উপকূলীয় জনপদে স্বাধীনতার অবিনাশী প্রতীক

১০

কারাগারের গেটে স্ত্রী-সন্তানের লাশ: একটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের চিত্র

১১

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি নারী ও তাদের বিলাতযাত্রা

১২

নির্বাচনের মাঠে ধর্মের কার্ড: গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?

১৩

নারী ভোটারদের এনআইডি কপি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ আশঙ্কাজনক: মাহদী আমিন

১৪

সরকারের কাছে পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকা / অর্থাভাবে বন্ধ হতে পারে বাঁশখালী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র

১৫

নয়া প্ল্যাটফর্ম নয়, পুরানো ভণ্ডামির নতুন দোকান

১৬

ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ের উদ্যোগ বন্ধ হোক

১৭

জামায়াতে ইসলামী অনুতপ্ত নয় একাত্তরের জন্য ক্ষমা চায়নি

১৮

নিজে নিজে না নিভলে নেভে না যে আগুন

১৯

বৈষম্যের অভিশাপ / নতুন প্রজন্ম কি কেবলই একটি ‘বন্দি’ প্রজন্ম?

২০