ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা
শহীদ বুদ্ধিজীবী

প্রফুল্ল রঞ্জন ভট্টাচার্য

প্রিয়ভূমি ডেস্ক
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৫, ০৪:২৫ পিএম
প্রফুল্ল রঞ্জন ভট্টাচার্য

পাহাড়ঘেরা সবুজ সুন্দর জমিজুরি গ্রামে সেদিন ভোর হয়েছিল অন্য সব দিনের মতেই। সূর্য তার সকালবেলার স্নিগ্ধ আলোর পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল অরণ্যের পাতায় পাতায়। এমন সময় অকস্মাৎ সামরিক উর্দিপরা একদল ঘাতক গ্রামের ঘরে ঘরে ঢুকে চালাল নির্মম গণহত্যা। নিমেষে গুলির শব্দ, বারুদের গন্ধ, অসহায় মানুষের আর্তনাদ, রক্তস্রোত আর খুনিদের উল্লাসের এক নারকীয় বিভীষিকা নেমে এল চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার এই পাহাড়ি গ্রামে।

সেদিন ছিল একাত্তরের ২৮ এপ্রিল। জমিজুরি হিন্দুপাড়ার বাড়িতে প্রতিদিনের মতোই প্রভাতি প্রার্থনা শেষে প্রাতরাশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন প্রফুল্ল রঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি জমিজুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সাত্ত্বিক সজ্জন মানুষ ও আদর্শ শিক্ষক হিসেবে এলাকায় সর্বজনশ্রদ্ধেয়। তখন আটটার মতো বাজে। সকালের শান্ত পরিবেশ ভেঙে গেল বহু মানুষের ভয়ার্ত চিৎকারে। ঘটনা কী, জানতে কৌতূহলী হয়ে যেই তিনি ঘর থেকে উঠানে বেরিয়ে এসেছেন, ঠিক তখনই অস্ত্র বাগিয়ে ঢুকে পড়েছে পাকিস্তানি হানাদার সেনার দল। কোনো কথার সুযোগ না দিয়ে গুলি চালিয়ে দিল তারা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলিতে ঝাঁঝরা তাঁর বুক। প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়ল উঠানে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে স্বামীর হত্যাদৃশ্য দেখলেন তাঁর স্ত্রী নীহার কণা দেবী।

রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে ঘাতক সেনার দল সেদিন জমিজুরি গ্রামের গণহত্যা চালিয়ে ১৩ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে। পরে তারা হিন্দু বাড়িগুলোতে লুটপাট চালায় ও আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তথ্য চেয়ে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে শহীদ শিক্ষক প্রফুল্ল রঞ্জন ভট্টাচার্যের ছবি ও তথ্য পাঠান তাঁর মেজ ছেলে মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা তপুব্রত ভট্টাচার্য। পরে তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলে প্রফুল্ল রঞ্জন ভট্টাচার্য এবং জমিজুরির গণহত্যা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেছে।

শহীদ প্রফুল্ল রঞ্জন ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯২০ সালে। তাঁর বাবা প্রতাপ চন্দ্র ভট্টাচার্য দক্ষিণ চট্টগ্রামের খ্যাতনামা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ছিলেন। মা মণি ভট্টাচার্য গৃহিণী। চার ছেলের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। প্রফুল্ল রঞ্জন স্থানীয় বড়মা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করে শিক্ষকতায় যুক্ত হন। পরে তিনি পটিয়া টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে পিটিআই প্রশিক্ষণ নেন। এলাকার বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। সর্বশেষ জমিজুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁদের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে। স্ত্রী নীহার কণা ২০১০ সালে এবং বড় ছেলে নিপু রতন ভট্টাচার্য ২০১৯ সালে মারা গেছেন। ছেলেদের মধ্যে তিনজন ঢাকায় এবং একজন যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। মেয়ে গৃহিণী।

এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ গ্রন্থের চতুর্থ খণ্ডে চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধ গবেষক শামসুল আরেফিন চন্দনাইশের জমিজুরির গণহত্যার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। সেখানে শিক্ষক প্রফুল্ল রঞ্জন ভট্টাচার্যের নাম রয়েছে। এই গণহত্যায় সহায়তাকারী ২ অবাঙালি ও ১৬ রাজাকারের নামও উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া তপুব্রত ভট্টাচার্য নিজেও মুক্তিযুদ্ধ ও আমি নামে স্মৃতিকথা লিখেছেন। তাতে জমিজুরির গণহত্যার বিবরণ রয়েছে।

জমিজুরি গণহত্যার শহীদেরা কেউ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। তবে ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ গণহত্যার স্থানটি সংরক্ষণ করে। তবে শহীদেরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পাওয়ায় তাঁদের মনঃকষ্ট রয়েছে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সহিংসতার নতুন উচ্চতা / মব হত্যা দ্বিগুণ, অজ্ঞাত লাশ বেড়েছে, সংখ্যালঘু নির্যাতন তীব্র

জঙ্গি সংগঠনগুলোর ন্যারেটিভ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তির আহ্বান ও শ্বাশত মুজিব’

সবচেয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে ‘বীর’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জয় বাংলা’

ফরিদপুর স্টেডিয়াম বধ্যভূমি

ইতিহাসের সাক্ষী ঝিনাইদহের ‘প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ফলক’

স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য / রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

পবিপ্রবির ‘মুক্ত বাংলা’: উপকূলীয় জনপদে স্বাধীনতার অবিনাশী প্রতীক

কারাগারের গেটে স্ত্রী-সন্তানের লাশ: একটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের চিত্র

১০

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি নারী ও তাদের বিলাতযাত্রা

১১

নির্বাচনের মাঠে ধর্মের কার্ড: গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?

১২

নারী ভোটারদের এনআইডি কপি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ আশঙ্কাজনক: মাহদী আমিন

১৩

সরকারের কাছে পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকা / অর্থাভাবে বন্ধ হতে পারে বাঁশখালী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র

১৪

নয়া প্ল্যাটফর্ম নয়, পুরানো ভণ্ডামির নতুন দোকান

১৫

ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ের উদ্যোগ বন্ধ হোক

১৬

জামায়াতে ইসলামী অনুতপ্ত নয় একাত্তরের জন্য ক্ষমা চায়নি

১৭

নিজে নিজে না নিভলে নেভে না যে আগুন

১৮

বৈষম্যের অভিশাপ / নতুন প্রজন্ম কি কেবলই একটি ‘বন্দি’ প্রজন্ম?

১৯

ঋণের বোঝায় বাড়ছে আত্মহত্যা: অর্থনৈতিক সংকটের ছায়ায় এক চলমান মানবিক বিপর্যয়

২০