ঢাকা শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৭ মার্চ ভাষণের বিশ্বজনীন তাৎপর্য

শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০২:১৭ এএম
৭ মার্চ ভাষণের বিশ্বজনীন তাৎপর্য

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি সত্যিকার অর্থে গোটা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেই সময় বিলেতে ছাত্র হিসেবে অবস্থান করায় আমার সুযোগ হয়েছিল বিলেতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নামিদামি পত্রিকা পাঠ করার। মার্চ মাসের শুরু থেকেই পত্র-পত্রিকায় ৭ই মার্চের ভাষণ সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে খবর ছাপানো হয়। বেশিরভাগ পত্র-পত্রিকায় এই মর্মে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে, ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু যে ময়দানে ভাষণ প্রদান করবেন, সেই স্থানে জালিয়ানওয়ালাবাগের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

সেদিন সে ময়দানে কয়েক হাজার মানুষের লাশ পড়ে যেতে পারে ইত্যাদি। তারা এই মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সম্ভবত ৭ তারিখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন এবং সে অবস্থায় ঢাকায় অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত সবার উপরেই বন্দুক-কামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং আকাশ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের হেলিকপ্টার থেকে গোলাবর্ষণ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করবে।

ঢাকা শহরে তখন বিদেশি পত্রিকার কয়েক ডজন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের প্রতিনিয়ত পাঠানো প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসব শঙ্কা ও ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশ করা হচ্ছিল। শঙ্কার পাশাপাশি এই ধরনের খবরও প্রকাশিত হচ্ছিল যে, বাংলার একচ্ছত্র নেতা শেখ মুজিব অতি প্রজ্ঞাবান এবং দূরদর্শী নেতা, যিনি পরিস্থিতি সুচারুরূপে এবং সাফল্যের সাথে মোকাবিলা করতে পারবেন। ৭ই মার্চ আমাদের কয়েকজনের সুযোগ হয়েছিল বিবিসি বাংলা বিভাগের কয়েকজন— যথা সিরাজুর রহমান, কমল ঘোষ, শ্যামল লোধ প্রমুখের সহায়তায় তাদের স্টুডিওতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার। শোনার পর আমরা নিশ্চিত হয়েছিলাম যে, এই ভাষণ একদিন বিশ্ব দরবারে নন্দিত হবে।

৭ তারিখেই লন্ডনের বেতার এবং টেলিভিশনে বলা হয়, বাংলার নেতা যে ধরনের বিচক্ষণতা নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন, পৃথিবীর খুব কম রাষ্ট্রনায়কই তা করতে পারতেন। তারা বলেছিলেন, শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি এটা যেমন ঠিক, তিনি কিছু বলতে বাকিও রাখেননি। অর্থাৎ যেকোনো সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ঠিকই বুঝতে পেরেছেন যে, শেখ মুজিব বাস্তব অর্থে স্বাধীনতাই ঘোষণা করেছেন।

তারা লিখেছেন, শেখ সাহেব আক্ষরিক অর্থে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানই নয়, বরং গোটা ঢাকা শহর এমনকি গোটা বাংলাদেশের মাটি পাকিস্তানি সেনাদের গোলাবারুদের সক্রিয়তায় রক্তে রঞ্জিত হয়ে যেত।

তারা বলেন, এটাই শেখ মুজিবের কৃতিত্ব যে, তিনি প্রকাশ্য স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়েও পূর্ব বাংলার মানুষদের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন, যা আজ হোক কাল হোক বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করবে। ৭ মার্চের ভাষণের কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ‘নিউজউইক’ সাময়িকী বঙ্গবন্ধুকে রাজনীতির কবি বা “পয়েট অব পলিটিক্স” বলে আখ্যায়িত করে বলে— এত অল্প সময়ে বঙ্গবন্ধু যা বলার প্রয়োজন তার সবই বলে প্রমাণ করেছেন যে তার প্রজ্ঞা আকাশ সমান উঁচু। ৭ই মার্চের পরে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, বঙ্গবন্ধু আক্ষরিক অর্থে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও বাংলার জনগণের এটা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি যে, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় নিশ্চিতভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা নিহিত ছিল। সেই কথা মনে রেখেই জনগণ ৭ই মার্চ থেকেই স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে, বিক্ষিপ্তভাবে পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রতিরোধ করতে শুরু করে।

এরই ধারাবাহিকতায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম মোজাম্মেল হক, যিনি এখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, ১৯ মার্চ ভাওয়াল এলাকায় প্রকাশ্য যুদ্ধে নেমে সেখান থেকে একজন পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ারকে পরাজিত এবং বিতাড়িত করতে পেরেছিলেন। তিনি যুদ্ধে নামার জন্য ২৬ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করেননি, কারণ অন্য সবার মতো তিনিও ৭ মার্চের ভাষণকে সুচতুরভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা বলে নিশ্চিত হয়েছিলেন। সমস্ত পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে পরিষ্কারভাবে ধরে নেওয়া যায় যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর পরবর্তী বিএনপি/জামায়াতের কথিত অবৈধ ক্ষমতা দখলদাররা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বন্ধ করে না দিলে সেটি বহু আগেই বিশ্বভাণ্ডারের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পুরস্কৃত হতো। ’৭৫-এর পরে যারা বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণটিকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল, তারা দেশকে পাকিস্তানে পরিণত করার জন্যই সেটি করেছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব পাকিস্তানি দোসরদের ঘৃণার চোখেই দেখবে।

প্রথম প্রকাশ: সময় নিউজ, ৬ মার্চ ২০২৩

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রেমিট্যান্সের রেকর্ডের আড়ালে ঢাকা পড়ছে লাশের মিছিল

আসিফ নজরুলের ১৮ মাস: দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ‘বদলি বাণিজ্য’

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ: আমিরাতকে রক্ষায় ঢাল হলো ইসরায়েলি ‘লেজার প্রযুক্তি’

১ মে ১৯৭১: ইতিহাসের আয়নায় রক্তঝরা দিন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

উনুস সওদাগরের সালতামামি

ঋণের জালে পিষ্ট অর্থনীতি

খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশ পার, বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আদায়

রাউজানে থামছে না লাশের মিছিল: নেপথ্যে আধিপত্য ও বালুমহাল

নাফ নদী থেকে আরাকান আর্মির হাতে ৭ জেলে অপহৃত

৩০ এপ্রিল ১৯৭১: ‘বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামীরা যুদ্ধে জয়ী হবেই’

১০

নিবর্তনমূলক আইনে মামলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

১১

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: জাতীয় স্বার্থ সংকট ও প্রতিবাদের আওয়াজ

১২

ডিজিটাল অরাজকতা বনাম কর্পোরেট শাসন / সোশ্যাল মিডিয়া কি ‘প্যারালাল সরকার’?

১৩

২৯ এপ্রিল ১৯৭১: গণহত্যার বিভীষিকা ও আন্তর্জাতিক জনমতের প্রবল চাপ

১৪

শেখ জামাল: এক অকুতোভয় বীর ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক উত্তরাধিকার

১৫

নতুন সরকারের আড়াই মাসে ১ হাজার ১৩০টি হত্যা-ধর্ষণ মামলা

১৬

পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ: রূপপুরে শুরু হলো ইউরেনিয়াম লোডিং

১৭

ফজলুর রহমানের মন্তব্যে তোলপাড় সংসদ / শহীদ পরিবারের কোনো সদস্যের জামায়াতের রাজনীতি করা অসম্ভব

১৮

২৮ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের ডাক ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধের নতুন মাত্রা

১৯

২৭ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের জাগ্রত কণ্ঠ ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম

২০