

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা এখন এক ভয়াবহ অস্থিরতার জনপদ। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত এখানে ২৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার শিকার অধিকাংশ ব্যক্তিই বিএনপির নেতাকর্মী। এই ‘হত্যারাজ’ নিয়ন্ত্রণে আনতে রাউজানকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করে অতিরিক্ত ১৫০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হলেও জনমনে আতঙ্ক কাটছে না।
তদন্ত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাউজানের এই অস্থিরতার নেপথ্যে রয়েছে চারটি প্রধান কারণ: আধিপত্যের লড়াই, বালু ও মাটি ব্যবসা, রাজনৈতিক দলবদল এবং পুলিশের সীমাবদ্ধতা।
পক্ষবদলু সন্ত্রাসীদের উত্থান
প্রতিবেদনে দেখা যায়, অপরাধীদের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ নেই। ভোটের আগে এক দলে থাকলেও পরে তারা স্বার্থের প্রয়োজনে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে নাম লেখাচ্ছে।
ফজল হক: ১০টি হত্যাসহ ৪২ মামলার এই আসামি প্রবাসে থাকলেও রাউজানের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছেন। আগে সাবেক এমপি গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারী থাকলেও বর্তমানে তিনি ক্ষমতাসীন বলয়ের ছায়ায় থেকে নিজের আধিপত্য বজায় রাখছেন।
রায়হান: ১৯ মামলার এই আসামি ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ থাকলেও এখন নতুন রাজনৈতিক বলয়ের আশ্রয়ে ত্রাস সৃষ্টি করছেন।
কেন এই রক্তপাত? (চারটি প্রধান কারণ)
১. আধিপত্যের দ্বন্দ্ব: দক্ষিণ রাউজানের সাতটি ইউনিয়নে প্রবাসে বসে ফজল হক ও তার ভাই জানে আলমের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বনাম উত্তর রাউজানের সাত ইউনিয়ন ও পৌরসভায় রায়হানের আধিপত্যের লড়াই এই খুনাখুনির মূলে।
২. বালু ও মাটি ব্যবসা: প্রবীণ রাজনীতিবিদ আবু জাফর চৌধুরীর মতে, রাউজানের অধিকাংশ খুনের মূল উৎস অবৈধ মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন। এই অর্থ আয়ের উৎস বন্ধ না হলে সন্ত্রাস কমবে না।
৩. দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও অসহায়ত্ব: সন্ত্রাসীরা এখন কোনো না কোনো বড় নেতার অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এমনকি বর্তমান এমপি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও নিজের অনুসারীদের জানাজায় অংশ নিয়ে নিজ বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে ‘অসহায়ত্ব’ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
৪. পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাসান মোহাম্মদ জসিমের দাবি, পুলিশ যদি ‘নিয়ন্ত্রিত’ ভূমিকা পালন না করে কঠোর হতো, তবে এই খুনাখুনি থামানো সম্ভব ছিল।
কিশোর গ্যাং ও নতুন বলয়
রায়হান ও ফজল হকের নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে অন্তত অর্ধশত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সক্রিয়। তারা উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ২৫টি ছোট-বড় গ্যাং পরিচালনা করছে। ট্যাক্সি চালক থেকে শুরু করে উঠতি বয়সের কিশোরদের নিয়ে গড়ে তোলা এই নেটওয়ার্কের কারণে পুলিশ অনেক সময় অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে।
স্বজনদের আর্তনাদ
গত ২৫ এপ্রিল গুলিতে নিহত কাউসার উজ জামান বাবলুর বাবা আবুল কালাম সওদাগর আক্ষেপ করে বলেন, "ছেলের খুনিদের নাম দিয়ে মামলা করেছি, কিন্তু পুলিশ প্রধান আসামিদের ধরছে না।" ২৬ এপ্রিল নিহত যুবদল কর্মী নাসির উদ্দিনের স্ত্রী বেদুরা বেগমও বিচার চেয়ে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
প্রশাসনের বক্তব্য
রাউজানকে শান্ত করতে পুলিশ কঠোর অবস্থানে যাওয়ার দাবি করছে। রাউজান থানার ওসি সাজিদুল ইসলাম জানান, প্রতিটি খুনের তদন্ত হচ্ছে এবং তদ্বির উপেক্ষা করেই আসামিদের ধরা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান বলেন, “রাউজানের পাহাড়ি এলাকা দুর্গম হওয়ায় অপরাধীরা অপরাধ করে দ্রুত সেখানে আত্মগোপন করে। আমরা সেই দুর্গ ভাঙার চেষ্টা করছি। অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে এবং বিশেষ অভিযান অব্যাহত আছে।”
তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কেবল পুলিশ বাড়িয়ে কি দীর্ঘদিনের এই আধিপত্য আর বালু ব্যবসার রক্তক্ষয়ী চক্র বন্ধ করা সম্ভব? নাকি এর জন্য প্রয়োজন জোরালো রাজনৈতিক সদিচ্ছা?
মন্তব্য করুন