

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশি ঋণের কিস্তি। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমলেও পুরোনো ঋণের পাহাড়সম কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই (জুলাই-মার্চ) ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৩৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় বিশাল এক অংকের বোঝা।
পরিশোধের অঙ্ক ছাড়িয়ে যাচ্ছে রেকর্ড
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঋণ পরিশোধের চাপ প্রতি বছরই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৩৭ কোটি ডলার শোধ করতে হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৪ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। চলতি অর্থবছরের মাত্র ৯ মাসেই যেভাবে ৩৫২ কোটি ডলার চলে গেছে, তাতে বছর শেষে এই অংক ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এক নজরে ৯ মাসের হিসাব:
আসল ঋণ পরিশোধ: ২২৭ কোটি ৬৪ লাখ ডলার।
সুদ বাবদ ব্যয়: ১২৫ কোটি ডলার।
প্রাপ্তি: একই সময়ে ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে এসেছে ৩৮৯ কোটি ডলার।
ঋণ ছাড় ও প্রতিশ্রুতির হালচাল
বর্তমানে ঋণ ছাড়ে সবাইকে ছাড়িয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে রাশিয়া। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পের কারণে রাশিয়ার কাছ থেকে এসেছে সর্বোচ্চ ৮৩ কোটি ডলার। তালিকার পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি।
শীর্ষ ঋণদাতাদের চিত্র (কোটি ডলারে):
| ঋণদাতা সংস্থা/দেশ | ঋণ ছাড়ের পরিমাণ |
| রাশিয়া | ৮৩ |
| বিশ্বব্যাংক | ৭৬ |
| এডিবি | ৬১ |
| চীন | ৫২ |
| জাপান | ৩১ |
| ভারত | ২৪ |
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে। গত বছরের প্রথম ৯ মাসে যেখানে ৩০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি মিলেছিল, এবার তা নেমে এসেছে ২৮০ কোটি ডলারে।
অভ্যন্তরীণ ঋণেও নাজেহাল অবস্থা
শুধু বিদেশি ঋণই নয়, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশের ব্যাংকগুলো থেকেও দুহাত ভরে ঋণ নিচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের এই উচ্চ হার মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন এই নাভিশ্বাস?
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত এক দশকে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া বড় অংকের ঋণের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ (কিস্তি শুরুর আগের সময়) শেষ হয়ে গেছে। ফলে এখন সুদ ও আসলের বড় কিস্তি একসঙ্গে পরিশোধের সময় শুরু হয়েছে। রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সের প্রবাহ কিস্তি পরিশোধের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
উত্তরণের পথ কী?
বর্তমান সংকট সামাল দিতে বিশেষজ্ঞরা তিনটি প্রধান পরামর্শ দিচ্ছেন: ১. প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা: নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করে ঋণের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। ২. স্বচ্ছতা: উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা। 3. উপার্জন বৃদ্ধি: বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসগুলো (রপ্তানি ও রেমিট্যান্স) আরও শক্তিশালী করা।
সব মিলিয়ে, বিদেশি ঋণের ওপর অতি-নির্ভরতা এখন অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিস্তি পরিশোধের এই ক্রমবর্ধমান চাপ সামলে সরকার কীভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষিত রাখে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মন্তব্য করুন