

সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের বোঝা ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়েছে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমলেও ক্রমবর্ধমান ঋণের দায় মেটাতে রাজস্ব আদায়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।
ঋণের পরিসংখ্যান: এক নজরে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে মোট দেশীয় ঋণ ছিল ৯,২৪,০০০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের অক্টোবর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০,৩৬,৫৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে মোট দেশীয় ঋণ বেড়েছে ১,১২,৫৫০.৬ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ১০ শতাংশ।
ঋণের উৎস ও নির্ভরতা
সরকারের এই বিশাল ঋণের উৎস মূলত দুটি খাতে বিভক্ত:
ব্যাংকিং খাত: ৫,৪৮,৯১৪.৬ কোটি টাকা।
ব্যাংকবহির্ভূত উৎস (ট্রেজারি বিল ও বন্ড): ৪,৮৭,৬৩৬.০ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সামাল দিতে শক্তিশালী রাজস্ব কাঠামোর কোনো বিকল্প নেই।
অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, "বিগত কয়েক বছরের পুঞ্জীভূত ঋণের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। রাজস্ব না বাড়লে এই বিশাল দেশীয় ঋণ ব্যবস্থাপনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। ঋণ-রাজস্ব অনুপাতের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।"
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, “ট্রেজারি বিল বা বন্ডের মাধ্যমে নেওয়া ঋণের মেয়াদ ৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। সরকার যদি নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতে পারে তবে সমস্যা নেই, কিন্তু বাজেটের বড় অংশ যদি ঋণ পরিশোধে চলে যায়, তবে তা টেকসই হবে না।”
ঋণ গ্রহণের গতি কি কমছে?
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুর দিকের তথ্য কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) সরকার ঋণ নিয়েছে ১৪,৮২০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই অংক ছিল ৩৯,২১৮ কোটি টাকা।
সঞ্চয়পত্র থেকেও সরকারের অর্থ সংগ্রহের হার কমেছে। গত বছরের ৫,১০৮ কোটি টাকার বিপরীতে এবার নিট বিক্রি হয়েছে মাত্র ২,৩৭০ কোটি টাকা।
সামনের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ঋণ নেওয়ার গতি কিছুটা কমলেও আগের নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ এখন প্রধান পরীক্ষা। দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং ঋণের বোঝা কমানোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
মন্তব্য করুন