

প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সুপার টাইফুন ‘বাভি’র আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ ও গুয়াম। সর্বোচ্চ ‘ক্যাটাগরি-৫’ হারিকেনের সমতুল্য এই দানবীয় ঝড়টির কেন্দ্রস্থল সরাসরি আঘাত হেনেছে ছোট দ্বীপ ‘রোটা’র ওপর। ঘণ্টায় ২৯০ কিলোমিটার বেগের ধ্বংসাত্মক বাতাস এবং প্রবল জলোচ্ছ্বাসে দ্বীপ দুটির যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো জানা যায়নি।
রোটা দ্বীপে ধ্বংসযজ্ঞ, অবরুদ্ধ বাসিন্দারা
মার্কিন জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা (এনডব্লিউএস) জানিয়েছে, সুপার টাইফুন ‘বাভি’র কেন্দ্রটি যখন রোটা দ্বীপের ওপর দিয়ে অতিক্রম করছিল, তখন বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৯০ কিলোমিটার। ঝড়ের ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে আগেই দ্বীপের প্রায় ১ হাজার ৫০০ বাসিন্দাকে ঘরের সবচেয়ে নিরাপদ কক্ষে অথবা সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে অবরুদ্ধ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, প্রবল বাতাস ও আকস্মিক বন্যায় দ্বীপের বহু ঘরবাড়ি এবং সরকারি স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। একটি মূল মোবাইল ফোন টাওয়ার ভেঙে পড়ায় পুরো দ্বীপের যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এনডব্লিউএস চরম আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছে, টাইফুনের আঘাতে রোটার বেশির ভাগ গাছপালা ও মৌলিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে দ্বীপের অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
গুয়ামে আকস্মিক বন্যা ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়
টাইফুনের প্রভাবে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের পাশাপাশি মার্কিন নৌঘাঁটি সমৃদ্ধ গুয়াম দ্বীপেও ব্যাপক তাণ্ডব চলছে। গুয়ামে ইতিমধ্যে ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার (৮ থেকে ১২ ইঞ্চি) পর্যন্ত রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে, যার ফলে দ্বীপজুড়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। আজ সোমবার (৬ জুলাই) বিকেল পর্যন্ত সেখানে ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া এবং ১৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে গুয়ামের শত শত মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বিভিন্ন হোটেলে আশ্রয় নিয়েছেন। সুপারমার্কেটসহ সব ধরনের দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। প্রবল বাতাসের হাত থেকে বাঁচতে বহুতল ভবন ও ঘরবাড়ির জানালাগুলো প্লাইউড দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে তাঁদের প্রধান উদ্বেগ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে। গত এপ্রিল মাসে আঘাত হানা আরেকটি টাইফুনের ক্ষত কাটিয়ে যে সমস্ত এলাকায় মাত্র কয়েক দিন আগে বিদ্যুৎ সংযোগ সচল হয়েছিল, সুপার টাইফুন বাভি’র আঘাতে সেগুলো আবারও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
নেপথ্যে জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনো
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রশান্ত মহাসাগরে সক্রিয় ‘এল নিনো’ (El Niño) জলবায়ু চক্রের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। আর এই উষ্ণ সমুদ্রের কারণেই টাইফুন ‘বাভি’ এত দ্রুত ও ভয়াবহ শক্তি সঞ্চয় করতে পেরেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে চলতি মৌসুমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই ধরনের আরও একাধিক অতি-শক্তিশালী ক্রান্তীয় ঝড়ের সৃষ্টি হতে পারে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন কোস্ট গার্ড এবং ফেডারেল জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থা (FEMA) উদ্ধারকাজের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তবে ঝড় পুরোপুরি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত দুর্গম দ্বীপগুলোতে ত্রাণ বা উদ্ধারকারী দল পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
তথ্যসূত্র: এএফপি ও মার্কিন জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা
মন্তব্য করুন