

১৯৭১ সালের ২৩ জুন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সংঘাতময় ও ঘটনাবহুল দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। একদিকে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর গণহত্যা ও তার বিপরীতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চোরাগোপ্তা ও সাঁড়াশি আক্রমণ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পরাশক্তিগুলোর দ্বিমুখী অবস্থান এবং ভারতের কঠোর অবস্থান—সব মিলিয়ে এই দিনটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এক টার্নিং পয়েন্ট। বিশেষ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পাকিস্তানকে গোপনে অস্ত্র সরবরাহের খবর ফাঁস হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
১. শেখ মুজিবের মুক্তি ও রাজনৈতিক সমাধান: ইন্দিরা গান্ধীর অনমনীয় অবস্থান
১৯৭১ সালের ২৩ জুন দিল্লির এক অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ও কড়া বার্তা দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
"আপনারা সমঝোতায় আসতে চান ভালো কথা। আমরাও রাজনৈতিক সমাধান আসুক তা-ই চাই। পূর্ববঙ্গে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নেই। শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ববঙ্গের জাতীয় নেতা। পূর্ববঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা চাইলে আগে শেখ মুজিবের সঙ্গেই আলোচনা করতে হবে। আগে তাঁর মুক্তির বিষয়ে পাকিস্তানকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সমঝোতা হলে তবেই ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।"
একই দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং বিশ্ব সফর শেষে দেশে ফিরে জানান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের কেবল পূর্ববঙ্গেই নয়, সমগ্র পাকিস্তানেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ এবং শেখ মুজিবের সঙ্গেই একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছানো ছাড়া সংকটের কোনো সমাধান নেই।
২. মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া
২২ জুন ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় মার্কিন সাংবাদিক ট্যাড সুলচের বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দুটি জাহাজভর্তি সমরাস্ত্র পাকিস্তান অভিমুখে রওনা হয়েছে। ২৩ জুন এই খবরটি চাউর হওয়ার পর ঢাকা থেকে ওয়াশিংটন—সর্বত্র তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে।
মুজিবনগর সরকারের প্রতিক্রিয়া: প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে এক জরুরি তারবার্তা পাঠান। তিনি গভীর মর্মবেদনা প্রকাশ করে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র কি দেখছে না বাংলাদেশে কীভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে? ঘরবাড়ি সব পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ এখনো যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দিয়েই যাচ্ছে।" তিনি অবিলম্বে এই অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের আহ্বান জানান। একই সাথে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান পাকিস্তানকে বিশ্বব্যাংক কনসোর্টিয়াম কর্তৃক আর্থিক ঋণ ও সাহায্য স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান।
মার্কিন প্রশাসনের স্বীকারোক্তি ও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা: ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের (পেন্টাগন) মুখপাত্র জেরি ফ্রিড হাইস স্বীকার করেন যে, সমরাস্ত্রবাহী জাহাজ পাকিস্তান যাত্রা করেছে। তবে তিনি দাবি করেন, ২৬ মার্চের নিষেধাজ্ঞার আগেই এই অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, ভারতে সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শরণার্থী বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফ্রাংক এল কেলাগ দিল্লির পুনর্বাসন মন্ত্রী আর কে খাদিলকরের সাথে দেখায় করে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর খবরটি সঠিক নয় বলে দাবি করেন এবং একে একটি "ভুল বোঝাবুঝি" বলে অভিহিত করেন।
মার্কিন সিনেটের ক্ষোভ: মার্কিন ডেমোক্র্যাট দলের সিনেটর স্টুয়ার্ড সিমিংটন এক বিবৃতিতে এই অস্ত্র সরবরাহকে "পুরোপুরি অবৈধ ও মানবতাবিরোধী" বলে আখ্যা দেন। প্রশাসন সিনেটকে ধোঁকা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর তীব্র কৈফিয়ত দাবি করেন।
ভারতীয় সংসদের বিক্ষোভ: ভারতের পররাষ্ট্র সচিব টি এন কাউল মার্কিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গলেন স্টোনকে জরুরি ভিত্তিতে দুবার তলব করে কড়া বার্তা দেন যে, এই অস্ত্র সরবরাহ গণহত্যার তীব্রতা বাড়াবে এবং ভারতের ওপর শরণার্থীদের চাপ আরও বৃদ্ধি করবে। একই সাথে ভারতীয় সংসদের সর্বদলীয় সাংসদদের একটি প্রতিনিধিদল মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে স্মারকলিপি দেয় এবং "দুমুখো খেলা বন্ধ কর" স্লোগানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
৩. আন্তর্জাতিক শক্তির অন্যান্য তৎপরতা
সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃঢ় সমর্থন: ভারতে নিযুক্ত সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত নিকোলাই পেগভ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিনের একটি চিঠি হস্তান্তর করেন। তিনি ভারতের পররাষ্ট্র সচিবকে আশ্বস্ত করে বলেন, পাকিস্তানের অবস্থান যাই হোক না কেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন সবসময় ভারতের পাশে থাকবে।
যুক্তরাজ্যের আর্থিক নিষেধাজ্ঞা: যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক মন্ত্রী স্যার অ্যালেক ডগলাস হিউম ব্রিটিশ কমন্স সভায় ঘোষণা করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে কোনো রাজনৈতিক সমাধান না আসা পর্যন্ত পাকিস্তানকে দেওয়া সমস্ত নতুন ব্রিটিশ অনুদান ও সাহায্য বন্ধ থাকবে।
জাতিসংঘের উদ্বেগ: জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান জেনেভায় ফিরে সাংবাদিকদের বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে তিনি ধ্বংসের বহু চিহ্ন দেখেছেন। শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সেখানে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সমাধান প্রয়োজন।
পাকিস্তানের অপপ্রচার ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: পাকিস্তানের সামরিক জান্তা বিশ্বকে বিভ্রান্ত করতে তাদের বিশেষ দূত মাহমুদ আলীকে (পিডিপির সহ-সভাপতি) মাসব্যাপী বিদেশ সফরে পাঠায়। অপরদিকে, পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো কোয়েটায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে কিছু সুপারিশ জমা দিয়েছেন। একই দিনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল আব্দুল হামিদ খান পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল নিয়াজিকে সাথে নিয়ে ফেনী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করে সামরিক প্রস্তুতি জোরদারের নির্দেশ দেন।
৪. রণাঙ্গনের চিত্র: দেশব্যাপী প্রতিরোধ ও গেরিলা যুদ্ধ
২৩ জুন বাংলাদেশের ভেতরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ পাকিস্তানি বাহিনীকে চরম কোণঠাসা ও আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে। ভারতীয় পত্রিকা ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, মুক্তিযোদ্ধারা যেকোনো মুহূর্তে আচমকা আক্রমণ চালাতে পারে এই ভয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা অসামরিক পোশাকে ছদ্মবেশে চলাফেরা শুরু করেছে।
কুমিল্লা সেক্টর: কুমিল্লার আপানিয়াপুলে বীর মুক্তিযোদ্ধা নায়েক সুবেদার শামসুল হক ও হাবিলদার মন্তাজের অকুতোভয় আক্রমণে দুই পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। এছাড়া কুমিল্লার ইয়াকুবপুর, কুয়াপাইনা ও খৈনলে চতুর্থ বেঙ্গলের ‘ডি’ কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি টহল দলের ওপর সাঁড়াশি অ্যামবুশ পরিচালনা করে ৮ জন হানাদারকে খতম এবং ৩ জনকে গুরুতর আহত করে।
কুষ্টিয়া সেক্টর: কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার মহিষকুন্ডিতে মুক্তিবাহিনীর একটি দল পাকিস্তানি এক কোম্পানির ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে ২০ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়।
মাদারীপুর সেক্টর: মাদারীপুরের নড়িয়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। শত্রুপক্ষ গুলি চালালে তুমুল যুদ্ধ বাঁধে, যার ফলে ৭-৮ জন শত্রু সেনা ও রাজাকার নিহত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা ৭টি রাইফেলসহ ৩৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে।
বুদ্ধিজীবীদের সংহতি: কলকাতা এক সমাবেশে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ আর মল্লিক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় জনগণের নৈতিক ও সর্বাত্মক সমর্থনের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
১৯৭১ সালের ২৩ জুনের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল দেশের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা বিশ্ব রাজনীতির এক বিশাল দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছিল। মার্কিন প্রশাসনের অনৈতিক অস্ত্র সহায়তার বিপরীতে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ব্রিটেনের শক্ত অবস্থান এবং রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের একের পর এক সফল অভিযান বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়ের পথকে আরও তরান্বিত করেছিল।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (পঞ্চম, দশম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড)
২. দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা (২৪ ও ২৫ জুন, ১৯৭১)
৩. দৈনিক যুগান্তর (২৩, ২৪ ও ২৫ জুন, ১৯৭১)
৪. দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা (২৪ জুন, ১৯৭১)
৫. দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক আজাদ (২৪ ও ২৫ জুন, ১৯৭১)
মন্তব্য করুন