ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা
আঁধারেই ডুবে আছে রাজধানী

বাতিহীন রাস্তায় বাড়ছে ছিনতাই, দুর্ঘটনা আর নিরাপত্তাহীনতার ভয়

মগবাজারের অন্ধকার গলিতে নিত্যদিনের আতঙ্ক
সামিহা সামান্থা
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম
বাতিহীন রাস্তায় বাড়ছে ছিনতাই, দুর্ঘটনা আর নিরাপত্তাহীনতার ভয়

রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে ব্যস্ততম সড়ক—রাতের ঢাকায় নেমে এলেই যেন চোখে পড়ে একটাই চিত্র: নিভু নিভু বা একেবারেই নিভে থাকা স্ট্রিটলাইট। মগবাজারের একটি গলিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো বাতি না থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন বাসিন্দারা। স্থানীয় এক পথচারী জানান, “এই রাস্তাটা অনেক দিন ধরেই এমন। বৃষ্টির সময় ড্রেনের নোংরা পানি রাস্তায় উঠে গেলে অন্ধকারে পা আর কাপড় ভেজা ছাড়া উপায় থাকে না।” শুধু মগবাজার নয়, পুরো ঢাকা শহরজুড়েই আলোহীন রাস্তা এখন ছিনতাইকারী আর দুর্ঘটনার আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে।

মগবাজার এলাকার একটি গলি দিয়ে হাঁটার সময় দেখা যায়, রাস্তাটিতে কোনো স্ট্রিটলাইট নেই। ফলে আচমকা উল্টো দিক থেকে আসা রিকশা বা মোটরসাইকেল ঠাহর করা কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় এক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মগবাজারের ভেতরের আরও কয়েকটি গলিতেও কোনো বাতি নেই, যা ছিনতাইকারীদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। বর্ষার সময় রাতের আঁধারে পথ চেনাই দায় হয়ে পড়ে।

এই অভিজ্ঞতা একা মগবাজারের নয়। ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে, মগবাজার এলাকায় ভাঙা ফুটপাত ও বাতিহীন রাস্তায় রাতে হাঁটতে গিয়ে একজন শিক্ষার্থী খোলা ম্যানহোলে পড়ে গিয়েছিলেন, কোনোমতে কিনারা ধরে রক্ষা পান। প্রতিবেদনটি আরও জানাচ্ছে, ঢাকায় হাঁটার উপযোগী ফুটপাতের পরিমাণ মাত্র ৫১৫ কিলোমিটার, অথচ প্রয়োজন প্রায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ARI-BUET) তথ্য অনুযায়ী, সড়কে প্রাণ হারানো মানুষের প্রায় ৪৩ শতাংশই পথচারী।

মেট্রোরেলের নিচে সাত কিলোমিটার আঁধার

রাজধানীর আগারগাঁও থেকে পল্লবী পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার সড়ক মেট্রোরেল নির্মাণের সময় আলো হারিয়েছিল, যা চালুর পরও এখনো ফেরেনি। ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অন্ধকার সড়কেই এক রাতে রিকশায় থাকা এক মা ও তাঁর সন্তানের ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা; যেখানে নগদ টাকা, পাসপোর্টসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিল। একই এলাকার আরেক বাসিন্দা অন্ধকার ফুটপাতে হাঁটতে গিয়ে ড্রেনে পড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, বাতি বসানোর দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

খামারবাড়ি-মিরপুর সড়কেও একই চিত্র। এক দম্পতি রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন অন্ধকারেই। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রায় ৩১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে স্মার্ট এলইডি বাতি বসানোর যে প্রকল্প হাতে নিয়েছিল, তার ১৪টি ধাপের মধ্যে আটটি সম্পন্ন হলেও, ব্যস্ততম এই সড়কটি এখনো রয়ে গেছে অন্ধকারে।

বাতি আছে, তবুও নেই আস্থা

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের এক গবেষণায় ঢাকার চারটি সড়কে ৫১৩ জন বাসিন্দার মতামত নেওয়া হয়। জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যমান স্ট্রিটলাইট ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট নন, আর ৮৫ শতাংশ মনে করেন এর উন্নতি জরুরি। প্রায় ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, গাছের ডালপালার আড়ালে বাতির আলো পথেই পৌঁছায় না। গবেষণায় আন্তর্জাতিক মান নির্ধারক সংস্থা ‘আশটো’ (AASHTO)-র নির্দেশিকা অনুযায়ী ঢাকার সড়কবাতির বিন্যাস অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সরকারি উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়নে ধীরগতি

দেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও নগর উন্নয়নের অংশ হিসেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) অর্থায়নে ছয়টি সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় এক হাজার কিলোমিটার সৌর-এলইডি স্ট্রিটলাইট বসানোর একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যার ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। তবে বাস্তবে এখনো ফ্লাইওভারের নিচে ও নতুন সড়কে বাতিহীন এলাকা রয়ে গেছে বলে ‘দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’-এর একটি পাঠক-মতামতেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে দ্রুত সব সড়কে এলইডি বাতি বসানোর দাবি জানানো হয়।

সচেতনতা ও দ্রুত বাস্তবায়নই সমাধান

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বরাদ্দ বা প্রকল্প ঘোষণা করলেই চলবে না, প্রয়োজন দ্রুত ও সমন্বিত বাস্তবায়ন। প্রতিটি অলিগলি পর্যন্ত আলো পৌঁছে দেওয়া, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ শোনার একটি সহজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা একসঙ্গে কাজ করলে রাতের ঢাকাকে নিরাপদ করা কঠিন কিছু নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ততদিন পর্যন্ত মগবাজারের মতো অসংখ্য গলি অন্ধকারেই পার করছে প্রতিটি রাত।

তথ্যসূত্র

Islam, M. J. (2023). Suffering as roads beneath the metro rail still in the dark. The Business Standard.

Islam, M. J. (2022). Khamarbari-Mirpur Road, without lights, turns snatching hotspot. The Business Standard.

Ifti, H. U. R. (2022). Dhaka: An unwalkable city. The Daily Star (Shout).

The Financial Express (2023). Improving city's street lighting (reader opinion, Editorial).

Hossain, M. S., Nur, B. M. A., Shoulin, S., & Rahman, M. M. A Case Study on the Evaluation of Street Lighting Performance Efficiency in the Dhaka Metropolitan Area. BUET.

Asian Development Bank (2011). Resettlement Plan: Solar-LED Streetlights, Power System Efficiency Improvement Project, Bangladesh.

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আঁধারেই ডুবে আছে রাজধানী / বাতিহীন রাস্তায় বাড়ছে ছিনতাই, দুর্ঘটনা আর নিরাপত্তাহীনতার ভয়

নগরায়ণের চাপ, পাল্টে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর / শোক, স্মৃতি আর বিচার পাওয়ার আকুতিতে কাটল বিষাদময় দিন

স্পেনের বিশ্বজয়, মেসির বিষাদ / ১৬ বছর পর আবার বিশ্বসেরা লা রোখারা

স্থানীয় সরকার নির্বাচন / পরিস্থিতি খারাপ হলে মাঠে থাকবে সেনাবাহিনী, বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ ইসির

দুদকে ফাইলবন্দি ৮ হাজার অভিযোগ, পদের জন্য ৩২৭ আবেদন

শেখ হাসিনা ও আজিজসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা

ভাঙছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, অন্ধকারে প্রশাসন ও সওজ!

জুলাই অভ্যুত্থানের মামলায় নজিরবিহীন জালিয়াতি / জুলাই অভ্যুত্থানের ‘শহীদ’ সৌদি আরবে কর্মরত, অস্তিত্বহীন বাদীর ভুতুড়ে মামলা

ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা, অবসান ঘটছে দীর্ঘ ২৩ বছরের অধ্যায়ের

১০

এমবাপ্পেদের ‘শ্বাস রোধ’ করে ফাইনালে স্পেন

১১

হামের উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৭৫৯

১২

মা-বাবার হাতে কিশোরী খুন, বস্তাবন্দী করে মোটরসাইকেলে লাশ সড়কে ফেলেন বাবা

১৩

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চাঞ্চল্যকর দাবি / আইনি লড়াই করতেই ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা

১৪

চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি, ঢল ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ৩০

১৫

মার্শাল আর্টের আড়ালে বোমার চর্চা: ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ এর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাবির

১৬

বগুড়ায় মিল মালিকের হাত-পা বেঁধে নৃসংশ হত্যাকাণ্ড, ট্রান্সফরমারের মালামাল লুট

১৭

সুপার টাইফুন ‘বাভি’র তাণ্ডব: লণ্ডভণ্ড মার্কিন দ্বীপপুঞ্জ রোটা ও গুয়াম

১৮

৮ কোটি টাকা বিতরণে পরামর্শক ও আমলাদের খরচ ৫৩ কোটি

১৯

পরকীয়ার অভিযোগে তরুণ ও গৃহবধূকে গাছে বেঁধে নির্যাতন, জোরপূর্বক বিয়ে

২০