

রংপুরে বহুল আলোচিত একই পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাটি উদ্ঘাটনে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের তদন্তে চরম গাফিলতি ও বিভ্রান্তির অভিযোগ উঠেছে। গত ২২ আগস্ট থেকে চালানো এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ ঘটনায় রহস্য উন্মোচনের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা, এক গৃহশিক্ষিকা এবং চাঁদাবাজ চক্রকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ভূমিকার মধ্যে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারকে হত্যার রহস্য উদঘাটনে ‘ইভা রহমান’ নামের এক নারীকে খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি মেরিল সুমন, ধীমান ঠাকুর ও প্রাণ ভট্টাচার্য নামের তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলতে পারে।
ইতোমধ্যেই সন্দেহভাজন মেরিল সুমন এবং গৃহশিক্ষিকা ইভা রহমান আত্মগোপনে চলে গেছেন। গত ২২ আগস্ট (২০২৬) থেকে মাছুয়াপাড়ার ‘ইভা ভাবি’ নামে পরিচিত ওই নারী নিখোঁজ রয়েছেন।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ইভা রহমানের। আর এই ইভার সুবাদেই রংপুরের পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদের সাথে প্রীতিলতার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। ইভা ও প্রীতিলতাকে কমিশনার মাবুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।
অভিযোগ রয়েছে, রংপুরের দাসপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের তদন্তের গতিপথ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু।
ঘটনার নেপথ্যে হেনস্তা ও হুমকি
স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, স্থানীয় প্রভাবশালী জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমানের ব্যাংকার ছেলে আশফাক সিফাতের প্ররোচনায় গণপতির মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে প্রতিনিয়ত উত্ত্যক্ত ও হেনস্তা করে আসছিল সন্দেহভাজন খুনি মেরিল সুমনের (মোবাইল: ০১৯২১৩৩৩২৬০) নেতৃত্বাধীন পারভেজ, পারভেল, মোমিন মিয়া, আবু হুমায়রাসহ একটি চক্র।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনে চক্রবর্তী পরিবার বিএনপিকে ভোট দিয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে আগামীকে একাধিকবার হুমকি দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ওই নির্বাচনে বৃহত্তর রংপুরের সবকটি আসনেই বিজয়ী হয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনের পর থেকেই স্থানীয় জামায়াত নেতারা হিন্দু পরিবারগুলোকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাছুয়াপাড়ায় চক্রবর্তী পরিবারের প্রতিবেশী ইভা রহমান নিহত গণপতির ছোট ছেলে আয়ুষের গৃহশিক্ষিকা ছিলেন। নিয়মিত আসা-যাওয়ার সুবাদে আয়ুষ ও আগামী চক্রবর্তীর মা প্রীতিলতার সাথে ইভার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
আশফাকের প্ররোচনায় ‘সুমন গ্যাং’ আগামীকে উত্ত্যক্ত করা শুরু করলে, আগামী তার মাকে পুলিশের কাছে অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেয়। বিষয়টি নিয়ে সে তার প্রতিবেশী ও বন্ধু প্রথাকেও জানিয়েছিল।
পরে প্রীতিলতা ও ইভা রহমান ডিবি কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তীর সাথে দেখা করেন। সব শোনার পর সনাতন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে পরামর্শ করে সাহায্য চাওয়ার জন্য প্রীতিলতা ও ইভাকে পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদের কাছে পাঠান। অভিযোগ রয়েছে, এর পর থেকেই কমিশনার মাবুদের সাথে ইভার এক ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ গড়ে ওঠে।
তবে বিএনপি নেতা সামু এবং জামায়াত নেতা মাহবুবুর রহমানের দ্বিমুখী রাজনৈতিক চাপের কারণে কমিশনার মাবুদ শেষ পর্যন্ত আগামী ও তার পরিবারের ওপর চলা হেনস্তা বন্ধ করতে ব্যর্থ হন।
পেনশনের টাকা ও চাঁদার দাবি
খুনের কয়েক সপ্তাহ আগে গণপতি চক্রবর্তী তার অসমাপ্ত বাড়ির নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করেন। এর ১০-১৫ দিন আগে তিনি জিপিএফ ফান্ড থেকে ১৫ লাখ টাকা তোলেন। তবে নথিপত্র অনুযায়ী, সেই টাকা ব্যাংকেই জমা রাখা ছিল।
এদিকে, বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করার পর স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতা গণপতির কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক সহকারী শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী অবসর গ্রহণের পর হোমওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করেন। মিঠাপুকুরের দেউলপুরের রাজারাম এলাকার পৈতৃক ভিটা ছেড়ে তিনি রংপুর নগরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুয়াপাড়ায় বসবাস শুরু করেছিলেন।
গণপতির প্রতিবেশী জনৈক দেবু মণ্ডলের ৩ তলা নির্মাণাধীন বাড়িতে বাস করেন তার মামাতো ভাই হিমাংশু কুমার মণ্ডল। হিমাংশু কুরিগ্রামের উলিপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের ইতিহাসের সাবেক অধ্যাপক। তার মেয়ে প্রথা মণ্ডল কারমাইকেল কলেজের স্নাতকোত্তরের ছাত্রী এবং নিহত আগামীর বান্ধবী ছিলেন।
গত ১৯ আগস্ট অজ্ঞাত ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বুলা (৫০), কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্রী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৬) এবং রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ও ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।
বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ও চাঁদার সংযোগ
হিন্দুপ্রধান মাছুয়াপাড়া এলাকায় পুরোহিত ধীমান ঠাকুর ও তার ছেলে প্রাণ ভট্টাচার্য পরানের বেশ প্রভাব রয়েছে। ধীমান দাসপাড়া মন্দির পরিচালনা করেন এবং ওই এলাকায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও চাঁদা আদায়ের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেন।
সম্প্রতি নিজেকে বিএনপির সমর্থক হিসেবে জাহির করে ধীমান রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামুর সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। অভিযোগ রয়েছে, সামুর প্ররোচনায় গণপতি চক্রবর্তী ঘর তোলার সময় তার ছেলে পরান ভট্টাচার্য গণপতির কাছে চাঁদা দাবি করেন।
এছাড়া, ধীমান ঠাকুর তার ছেলে পরানের সাথে আগামীর বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু গণপতি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পরিবারের একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘আদিত্যকর’ নামের এক যুবকের সাথে ইতোমধ্যে আগামীর বিয়ের তারিখ চূড়ান্ত হয়েছিল।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি—বাড়ি নির্মাণের চাঁদা দাবি, পরানের বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং পরবর্তী এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্যে একটি গভীর যোগসূত্র থাকতে পারে।
ঘটনার কিছুদিন আগে আগামী তার বান্ধবী প্রথাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে জিজ্ঞাসা করেছিল—পুলিশ স্টেশনে জিডি বা এফআইআর করলে তার সরকারি চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে কিনা। সে মূলত পুলিশের কাছ থেকে নিরাপত্তা চাচ্ছিল।
মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী জানান, গৃহনির্মাণকে কেন্দ্র করে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে চাঁদাবাজরা প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে আসছিল।
অসামাপ্ত তদন্ত ও প্রশ্ন
অনুসন্ধানে বারবার সন্দেহভাজন খুনি মেরিল সুমন এবং প্রাণ ভট্টাচার্য পরানের নাম উঠে এসেছে। তাদের সাথে আরও অন্তত চারজন এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের মতে—মেরিল সুমন, ইভা রহমান, সাবেক এমপি-পুত্র আশফাক, বিএনপি নেতা সামু, ধীমান ঠাকুর ও তার ছেলে প্রাণ ভট্টাচার্যকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এই ৪ খুনের আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।
স্থানীয়রা জানান, ডিবি কর্মকর্তা সনাতন নিয়মিত মাছুয়াপাড়ায় যেতেন এবং ধীমান ও পরানের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। অন্যদিকে, পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদকেও ইভা রহমানের সাথে বেশ কয়েকবার গণপতির বাড়িতে ঢুকতে দেখা গেছে।
তবে মূল প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে—হত্যাকাণ্ডের পর বা আগে পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ কি কখনো সামু, মেরিল সুমন কিংবা পরানের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন?
মন্তব্য করুন