ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

যেভাবে সমন্বিত ডিজিটাল-রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল ‘গুমচর’

গুগল ম্যাপস, সাক্ষী এবং রাজনৈতিক যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে একটি বিশেষ ঘটনা; যা নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করার একটি তৈরি করা গল্প বলে অভিযোগ উঠে এসেছে।
এনায়েত কবির
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫২ এএম
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৮ পিএম
যেভাবে সমন্বিত ডিজিটাল-রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল ‘গুমচর’

‘নর্থইস্ট নিউজ’-এর এক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন প্রসিকিউশন দল, একটি জলদস্যু নেটওয়ার্ক, তাদের তথাকথিত “চুক্তিভিত্তিক” সাংবাদিক মনিরুল এবং নাবিলে গ্রুপ যৌথভাবে কীভাবে ‘গুমচর’ কেন্দ্রিক এই ন্যারেটিভ বা গল্পটি সাজিয়েছিল। প্রিয়ভূমি পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি অনুবাদ করে দেয়া হলো।

গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে জানা যায়, সুন্দরবনের স্থানীয়ভাবে ‘মাঝের চর’ নামে পরিচিত একটি এলাকাকে ‘গুমচর’ বা ‘গুমের দ্বীপ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে একটি সংঘটিত ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হয়।

গত দুই বছরে সুন্দরবনের কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ আবার নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে জলদস্যু ও বনদস্যুদের কয়েকটি গোষ্ঠী, যাদের ইতিপূর্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই দস্যু গোষ্ঠীগুলোই ‘গুমচর’ সংক্রান্ত গল্প তৈরিতে অর্থায়ন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ২০০৭ সালে অত্যন্ত তীব্র ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় প্রাণ হারানো বেশকিছু মরদেহ উদ্ধারকারীরা এই মাঝের চরেই গণকবর দিয়েছিলেন। সম্ভবত এই কারণেই এলাকাটির নামের সাথে ‘গুম’ শব্দটি পরবর্তীতে যুক্ত করা সহজ হয়েছে।

বিষয়টি তদন্তকারী তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন যে, সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম যে মাসে তার প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিলেন—অর্থাৎ নভেম্বর মাসে—ঠিক সেই মাসেই একজন স্থানীয় অবদানকারী (contributor) গুগল ম্যাপসে 'মাঝের চর’কে ‘গুমচর’ নামে বুকমার্ক করেছিলেন। পরবর্তীতে মনিরুল তার প্রতিবেদনে চাঞ্চল্য সৃষ্টির জন্য সেই নামটাই ব্যবহার করেন।

গুগল ম্যাপসে ‘গুমচর’ লিখে সার্চ করলে দেখা যায়, এই নামের সাথে সম্পর্কিত সবচেয়ে পুরোনো রিভিউটি ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের। অন্য কথায়, স্টার নিউজের প্রতিবেদনটি সম্প্রচারিত হওয়ার আনুমানিক এক সপ্তাহ আগে, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘চর দুয়ানী মাঝের চর’কে ‘গুমচর’ হিসেবে বুকমার্ক করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনটি সম্প্রচারিত হওয়ার দিনে আরও প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন স্টার নিউজের স্থানীয় প্রতিনিধি জানান যে, গল্পটি এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে সেখানেও কিন্তু স্থানটিকে তার প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় নাম ‘মাঝের চর’ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছিল।

ইসলামী ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগে চাপে থাকা নাবিল গ্রুপ মূলত স্টার নিউজ চালুর পর ধীরে ধীরে সরকারি চাপ থেকে রেহাই পেতে শুরু করে। পরবর্তীতে ‘গুমচর’ শীর্ষক তথাকথিত ডকুমেন্টারিটি প্রচারের পর, গ্রুপটিকে সেই চাপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

কিন্তু কথিত এই ‘গুমচর’ ডকুমেন্টারিতে ঠিক কী ছিল? আর কেনই বা এই ডকুমেন্টারির বিনিময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউটররা (যাকে এই গল্পে জামায়াত-ই-ইসলামী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে) নাবিল গ্রুপকে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন?

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জামায়াত সমর্থিত এক প্রসিকিউটর, নাবিল গ্রুপ এবং স্টার নিউজের মধ্যে এক ধরণের অনৈতিক সমঝোতা বা যোগসূত্র ছিল, যার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন নামে পরিচিত একটি স্থানকে ‘গুমচর’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

অভিযোগ অনুসারে, আগে থেকে প্রস্তুত করা এবং কী বলতে হবে তা শিখিয়ে দেওয়া ব্যক্তিদের সাথে ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল একটি সাজানো নাটকের মাধ্যমে। মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে তথাকথিত গুম ও হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।

এটি ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘তারুণ্যের উৎসব’ নামে একটি কনসার্ট চলছিল। ভিড়ের ভেতর থেকে এক যুবক ধীরে ধীরে বের হয়ে শহীদ মিনারের দিকে হেঁটে যান। ফোনে কথা বলতে বলতে তিনি রাস্তার পাশের ফুটপাতে গিয়ে দাঁড়ান।

তখনই একটি গাড়ি এসে তার সামনে থামে এবং যুবকটি গাড়িতে গিয়ে ওঠেন। এই যুবকের নাম মনিরুল ইসলাম, যিনি তখন ঢাকার শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার ছিলেন।

গাড়ির ভেতর আরও দুজন ব্যক্তি ছিলেন: শেখ মাহাদী এবং মইনুল করিম। তারা দুজনই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ছিলেন।

কিছুক্ষণ কথা বলার পর মনিরুল গাড়ি থেকে নেমে আবার কনসার্টে ফিরে যান। গাড়িটি সচিবালয় রোডের দিকে চলে যায়।

একটি গোয়েন্দা সংস্থা সেদিনের সেই সাক্ষাৎ পর্যবেক্ষণ করেছিল, যদিও সেদিন তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল তা জানা যায়নি।

তবে এর দুই দিন পর, বনানীর ১৭ নম্বর রোডের ‘ডি’ ব্লকের একটি ভবনে তাদের আবার একসাথে দেখা যায়। ইসলামী ব্যাংকের ঋণ অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা নাবিল গ্রুপের করপোরেট কার্যালয়ে তারা একটি দীর্ঘ বৈঠক করেন।

সেখানে নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন এবং আরেক পরিচালক মোখছেদুল কামালও উপস্থিত ছিলেন।

২০২৫ সালের আগস্টে মনিরুল ইসলাম নাবিল গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্টার টেলিভিশনে একটি দায়িত্বশীল পদে যোগ দেন। মোখছেদুল কামাল হন এর সিইও।

নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে মনিরুল ইসলামের তৈরি করা কথিত ডকুমেন্টারি "গুমচর" এই স্টার টিভিতেই সম্প্রচার করা হয়।

এই গল্পের মূল উৎস বুঝতে হলে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার ‘চর দুয়ানী’ এবং বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার ‘রায়ন্দা’ ইউনিয়নে যেতে হবে।

স্টার নিউজের প্রতিবেদনে এই দুই এলাকার মাঝখানে বলেশ্বর নদীর বুকে জেগে ওঠা একটি চরকে কথিত ‘গুমচর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

প্রতিবেদনে মনিরুল ইসলামকে বলতে শোনা যায়: “এমনকি গুগল ম্যাপসেও আমরা ‘গুমচর’ শব্দটির অস্তিত্ব পেয়েছি।”

অথচ স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, স্টার নিউজের প্রতিবেদন সম্প্রচারের আগে তারা ‘গুমচর’ নামে কিছুর কথা কখনোই শোনেননি। তারা স্থানটিকে ‘চর দুয়ানী মাঝের চর’ নামেই চিনতেন।

ডিজিটাল কারসাজির এই সূক্ষ্ম রূপটির আসল উদ্দেশ্য কী ছিল?

তা বুঝতে হলে নাইম আহমেদ নামের এক ব্যক্তির দিকে নজর দিতে হবে।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী হিসেবে গোপনে রাজনীতি করতেন। ২০১৩ সালে তিনি ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি’র (জাগপা) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে সামনে আসেন। পরবর্তীতে তিনি জামায়াত-শিবিরের তথাকথিত ‘গোপন’ এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।

পরে তিনি ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ এবং ‘আপ বাংলাদেশ’-এর সাথে যুক্ত হন এবং বর্তমানে ‘জাস্টিস পার্টি’র প্রধান সংগঠক হিসেবে পরিচিত।

আইসিটির সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের সাথে নাইমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। তামিরুল মিল্লাত মাদরাসার সাবেক ছাত্র হিসেবে স্টার নিউজের রিপোর্টার মনিরুল ইসলামের সাথেও তার গভীর সখ্য ছিল।

নাইমের বাড়ি বাগেরহাটের শরণখোলায় হওয়ায় তাকেই এই ‘গুম’ সংক্রান্ত গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র বা বাস্তবায়নকারী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

তার ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে তিনি প্রতি মাসে ওই এলাকায় যাওয়া শুরু করেন এবং চর দুয়ানী মাঝের চর থেকে মানুষ ‘গুম’ হয়েছে বলে স্থানীয়দের মাঝে প্রচারণা চালাতে থাকেন।

নাইমের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো মাঝের চরে নাম পরিবর্তন করে ‘গুমচর’ রাখার পেছনেও তার ভূমিকা ছিল বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শরণখোলার একাধিক বাসিন্দা জানান, স্টার নিউজের সংবাদটি সম্প্রচারের পর নাইম ওই এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের বলেছিলেন—যখনই কোনো পর্যটক আসবে, তাদের যেন মাঝের চরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে গুমের ভয়াবহ গল্পগুলো শোনানো হয়।

শরণখোলায় নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নাইম আহমেদের একটি ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়:

“আমাদের এই চরকে আরও বেশি ব্র্যান্ডিং করতে হবে। গুমের এই চরকে হাসিনার বর্বরতার একটি প্রতীকী আইকন বানিয়ে ফেলতে হবে। যাতে মানুষ এই চর দেখলেই হাসিনা সরকারের কথা মনে পড়ে। আমরা একটি প্রচারণাও চালাতে চাই যে, এই চরের নাম পরিবর্তন করে ‘গুমচর’ রাখা যায় কি না।”

তার এই কর্মকাণ্ড এবং বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, গুগল ম্যাপসে একটি মিথ্যা নাম অন্তর্ভুক্ত করা আসলে রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক প্রচারণারই অংশ ছিল।

বরগুনার পাথরঘাটার চর দুয়ানী বাসিন্দাদের মনেও এই তথাকথিত "গুমচর" সংক্রান্ত প্রচারণা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক চাপের কারণে বাসিন্দারা প্রকাশ্যে কথা বলতে ইতস্তত করলেও, এলাকায় টানা পাঁচ দিনের অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে যে—স্টার নিউজে প্রচারিত ‘গুমচর’ এর গল্পটি মূলত একটি বিশেষ রাজনৈতিক শিবিরের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনালের মামলায় সাক্ষীও বানানো হয়।

চর দুয়ানীর বাসিন্দা সাইদুর রহমান জানান, এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে জলদস্যুদের উৎপাতে ভুগছিল। মাঝের চরটি নির্জন, ফাঁকা এবং যাতায়াত কঠিন হওয়ায় জলদস্যু দলগুলো এটিকে অস্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করত।

এই সমস্যা দমনে ২০১০ সাল থেকে সেখানে র‍্যাবের অভিযান প্রত্যক্ষ করেছেন স্থানীয়রা। ওই চরে র‍্যাব ও জলদস্যুদের মধ্যে তীব্র বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও ঘটেছিল।

সাইদুরের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেসব অভিযানে নিহত জলদস্যুদের মরদেহ উদ্ধার করে চর দুয়ানী হয়ে নিয়ে যেত। স্থানীয় বাসিন্দারা সেসব মরদেহ দেখেছেন, আবার অনেক সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদেরও আহত অবস্থায় ফিরতে দেখেছেন।

কিন্তু এই চরটিকে যে গুমের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে—এমন কথা তারা প্রথম শোনেন গত বছরের নভেম্বর মাসে।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা ছাগীর বিশ্বাস জানান, জেলেরা একসময় সমুদ্রে যাওয়ার সময় বা ট্রলারে নদীতে চলাচলের সময় জলদস্যুদের আতঙ্কে থাকতেন। দস্যুদের হাতে অনেক জেলে নিহত হয়েছেন, আবার অনেকে মুক্তিপণের জন্য অপহৃত হয়েছেন।

তার ভাষ্যমতে, র‍্যাবের অভিযানের ফলেই জেলেরা দীর্ঘদিন ধরে কোনো বড় বাধা ছাড়াই ট্রলার চালাতে এবং জীবিকা নির্বাহ করতে পেরেছিলেন। তবে সম্প্রতি আবারও জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে।

কয়েকজন ট্রলার মালিক ও জেলে জানান, গত কয়েক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জলদস্যু দমনে আগের চেয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে, যার সুযোগে দস্যু দলগুলো আবার তাদের পুরোনো প্রভাব ফিরিয়ে এনেছে।

তারা জানান, দস্যুরা এখন সেই কথিত ‘গুমচর’কেই ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জলদস্যুরা বেশ কয়েকবার ট্রলারে হামলা চালিয়েছে, যেখানে জেলেরা গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে পুরো এলাকাটি জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন একটি দল এবং অপর একটি জলদস্যু গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতারা এই উভয় দস্যু দলের সাথেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন।

পাশের ছায়েরাবাদ এলাকার আব্দুল কুদ্দুস জানান, র‍্যাব ও কোস্টগার্ডের নিয়মিত অভিযানে কেবল দস্যু নয়, অনেক অপরাধীও এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

চর দুয়ানীর সিদ্দিক স্মরণ করে বলেন, র‍্যাব যখন দস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাত, তখন তাদের যানবাহন একটি বরফ কলের কাছে রেখে ট্রলার নিয়ে অভিযানে যেত।

কিন্তু স্টার নিউজ সেই একই স্থানটি দেখিয়ে দাবি করেছে যে, গুমের ঘটনার সাথে সম্পর্কিত বলেই সেখানে র‍্যাবের গাড়ি পার্ক করা থাকত। স্থানীয় বাসিন্দারা তাই এই দাবিটিকে অবিশ্বাস্য বলে মনে করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, স্টার নিউজে যার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল—সেই জসিম উদ্দিন নিজেই জলদস্যুতার সাথে জড়িত ছিলেন।

তারা জানান, র‍্যাবের এক অভিযানে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এই জসিম।

বাসিন্দারা প্রশ্ন তোলেন, সাক্ষাৎকারদাতা হিসেবে জসিমকেই কেন বেছে নেওয়া হলো? সত্যিই যদি সেখানে গুম বা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে থাকত, তবে জসিম নিশ্চয়ই বেঁচে থাকতেন না।

তারা আরও জানান, জসিম এখন প্রকাশ্যে আবার জলদস্যুদের সাথে জড়িয়ে পড়েছে এবং এলাকায় মানুষকে হুমকি দিয়ে বলছে যে, র‍্যাব আর সেখানে আসবে না।

তাদের আরও অভিযোগ, স্টার নিউজে যাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল, তাদের অধিকাংশই আগে র‍্যাবের সোর্স বা তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। পরবর্তীতে তাদের অনেকেই বিভিন্ন মামলার আসামি হয়ে পড়ে।

র‍্যাবের সূত্রের বরাত দেওয়া তথ্য সমর্থন করার জন্য স্টার নিউজ যে দুজন নির্বাচিত প্রতিনিধির সাক্ষাৎকার নিয়েছিল, তাদের একজন মিজানুর রহমান জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত। অন্যজন, সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম, বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা।

আইসিটির সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও অন্য প্রসিকিউটরদের সাথে সাংবাদিক মনিরুল ইসলামের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল বলেই জানা গেছে।

যমুনা টিভিতে কাজ করার সময় ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের অনুরোধে তাদের কাছে আর্কাইভ ফুটেজ সরবরাহ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে, স্টার নিউজের সিইও মোখছেদুল কামাল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক হওয়ার পর, তিনি সাবেক প্রসিকিউটর শেখ মাহাদীকে বিসিবি-র আইনি উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন বলে জানা যায়।

এই সমস্ত সূত্র ও যোগসূত্রগুলোকে একত্র করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—‘গুমচর’ এর গল্পটি কি স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল, নাকি রাজনৈতিক সুবিধাবাদী, প্রসিকিউটর, সংবাদমাধ্যম কর্মী ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সমন্বয়ে গঠিত একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছিল?

তাই মূল প্রশ্নটি কেবল এটি নয় যে—কেন গুগল ম্যাপসে একটি অচেনা নাম দেখা গেল; বরং প্রশ্ন হলো, কে এটি যুক্ত করল, কখন করল, কেনই বা পরবর্তীতে এটিকে স্বাধীন বা নিরপেক্ষ প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হলো এবং রাজনৈতিকভাবে তৈরি করা একটি গল্পকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেওয়ার জন্যই এই ডিজিটাল কারসাজি করা হয়েছিল কি না।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

যেভাবে সমন্বিত ডিজিটাল-রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল ‘গুমচর’

শাহজালাল বিমানবন্দরের সামনে প্রবাসীর ২০০ গ্রাম স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগ

এনবিআরে বড় রদবদল: একযোগে ৩৬ অতিরিক্ত কর কমিশনার বদলি

প্রণোদনার দ্বিতীয় ধাপ: ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণে আরও ১০ ব্যাংকের চুক্তি

প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেল: কোন গ্রেডে কত বেতনের প্রস্তাব?

বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা / বাংলাদেশে চাকরি হারাবে ছয় লাখ মানুষ, বাড়বে দারিদ্র্য

গাজীপুরে নিখোঁজের পরদিন ব্রহ্মপুত্র নদে ভেসে উঠল শিশুর মরদেহ

ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে প্রধান শিক্ষিকার করুণ মৃত্যু

নেপালে ভয়াবহ বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে ৬২৬, নিখোঁজ আড়াই হাজার

১০

রঙ-তুলিতে সম্প্রীতি ও স্বাধীনতার গল্প, পুরস্কার পেল ১২ শিশু-কিশোর

১১

রংপুরে ৪ খুনের বিচার দাবিতে ধানমন্ডিতে মানববন্ধন, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে বিতণ্ডা

১২

৪৭৬ বিদেশি সহ নিখোঁজ দেড় হাজার / নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধস ও ভয়াবহ বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৭০

১৩

রোমান্টিক নাটক-সিনেমা নির্মাণ বন্ধে লিগ্যাল নোটিশ

১৪

গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ২৮ আগস্ট

১৫

ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৫ জনের মৃত্যু

১৬

২০০৭-এর নিপীড়ন ও প্রতিরোধের ইতিহাস / ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কালো দিবস’ আজ

১৭

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন চার্জ দিচ্ছে বাংলাদেশ

১৮

বঙ্গোপসাগরে পণ্যবাহী জাহাজ ডুবি: বাংলাদেশি সহ ২২ জন নিখোঁজ

১৯

বঙ্গভবনে উঠলেন নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

২০