

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিশিষ্ট লেখক ড. নাহিদা বেগম এবং ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর শোক ও চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর (শনিবার) দুপুরে কুবি সংলগ্ন সানন্দা পাহাড়ি এলাকা থেকে সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মর্মান্তিক এই ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মূল অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম তুহিন (২০)-সহ তিনজনকে আটক করেছে। একই সাথে উন্মোচিত হয়েছে এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও অপকর্মের নানান চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত ও উদ্ধার অভিযান
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) বিকেল ৩টার দিকে অপ্রতিম বাসা থেকে হেঁটে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেনি। নিখোঁজের পর তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় জিডি দায়ের করেন।
পরদিন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে পুলিশ দেখতে পায়, অপ্রতিমের সাথে অভিযুক্ত তুহিন হেঁটে যাচ্ছে। শনিবার বিকেলে তুহিনকে আটক করে পুলিশ এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তুহিনের নিজ বাড়ি থেকে নিহত অপ্রতিমের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যে শাহরিয়ার আনাস ও মো. ফাহিম আহমেদ নামে আরও দুজনকে আটক করে পুলিশ।
পাহাড়ে তুহিনদের খামারঘরে নির্যাতন
স্থানীয়দের তথ্যমতে, অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়া স্থানটি তুহিনের বাবার মালিকানাধীন। সেখানে টিলার ওপর তাদের একটি খামারঘর রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অপ্রতিমকে ওই খামারঘরেই ডেকে নিয়ে নৃশংসভাবে মারধর ও নির্যাতন করা হয়েছিল। পাহাড়ি এলাকাটি কুবি ক্যাম্পাস থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার এবং অপ্রতিমের বাসা থেকে চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এলাকায় সক্রিয় একাধিক কিশোর গ্যাং ও তুহিনের অপরাধ সাম্রাজ্য
কোটবাড়ি ও সানন্দা এলাকার স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, এলাকাটিতে ‘ফ্লাইং বার্ড’, ‘কিংস অব কোটবাড়ি’ ও ‘গ্যাং র্যাপ’-সহ একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যাদের শতাধিক সদস্য রয়েছে।
আটক তুহিন ও তার সহযোগী ফাহিম এসব গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিতেন। তুহিন দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন ছিনতাই, ঘুরতে আসা পর্যটকদের জিম্মি করে টাকা আদায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাইক বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার মতো অপরাধে জড়িত ছিলেন।
প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
তুহিনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে থাকার কারণে সে প্রতিবারই পার পেয়ে যেত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এক ভুক্তভোগী আসাদুল্লাহ সোহাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২০২৫ সালের একটি অভিযোগের কপি পোস্ট করে লেখেন— তুহিন আগে তার বাইক ছিনতাই করেছিল। সেসময় সদর দক্ষিণ মডেল থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে কেবল জিডি গ্রহণ করে এবং রাজনৈতিক চাপের কথা উল্লেখ করে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ছোট অপরাধে পার পেয়ে যাওয়ায় তুহিন পরবর্তীতে এমন বড় অপরাধ করার সাহস পেয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিবারের শোকের ছায়া
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় কুবি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও সর্বস্তরের জনগণ অংশ নেন। জানাজায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে অপ্রতিমের বাবা বলেন, “আমার একটাই ছেলে... আমার ছেলে যদি কোনো ভুল করে থাকে মাফ করে দেবেন।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দীন এ হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন এবং ক্যাম্পাস এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জানান।
পুলিশের বক্তব্য
কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. লুৎফর রহমান জানান, সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধারকৃত আলামত এবং আটকদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। পুরো ঘটনার বিস্তারিত তথ্য পুলিশ সুপার আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরবেন।
মন্তব্য করুন