

ঢাকার অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, চট্টগ্রামে বিপুল পরিমাণ জমি, দোকান ও বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা—দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এবার বিশ্বের অন্তত ১০টি দেশে ছড়িয়ে থাকা সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ আদালতের আদেশে ক্রোক ও অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা হয়েছে।
সর্বশেষ সিঙ্গাপুরে তার ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ এবং বাড়ির তথ্য উন্মোচিত হওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পাচার করা সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করেছে।
অর্থপাচার ও ঋণ জালিয়াতির নিত্যনতুন ছক
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদ, তার স্ত্রী রুকমিলা জামান এবং সহযোগীরা গড়ে তুলেছেন এক বিস্তৃত ‘অবৈধ সম্পদের মানচিত্র’। সংস্থাটি এখন পর্যন্ত অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে জাবেদের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা দায়ের করেছে, যেখানে অভিযুক্ত অর্থের পরিমাণ ৬১৮ কোটি টাকারও বেশি। এর বাইরে আরও অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও ঘুষ গ্রহণের অনুসন্ধান চলছে।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, মূলত তিনটি কৌশলে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার করা হতো:
এছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ সুবিধা দেওয়ার নামে প্রায় ২১৪ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগেও পাঁচটি আলাদা মামলা দায়ের করেছে দুদক।
দেশে ও বিদেশে সম্পদের পাহাড়
যুক্তরাজ্যে সাম্রাজ্য: যুক্তরাজ্যের ল্যান্ড রেজিস্ট্রি ও ব্লুমবার্গের তথ্য এবং দুদকের অনুসন্ধানে জাবেদ ও তার স্ত্রীর নামে দেশটিতে ৫ ১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের সন্ধান মিলেছে।
অন্যান্য দেশ: যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউএই, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ভিয়েতনামী, কম্বোডিয়া ও ফিলিপিন্সে জাবেদের সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজের আওতায় আনা হয়েছে।
সিঙ্গাপুরে নতুন তথ্য: সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের সেন্ট থমাস ওয়াক এলাকায় একটি ফ্ল্যাট, আটটি ব্যাংক ও বিনিয়োগ হিসাব এবং একটি কোম্পানির পরিচালক পদের তথ্য পাওয়ায় তা জব্দের জন্য আদালতের আদেশ নিয়ে 'পারস্পরিক আইনি সহায়তা' (MLAR) পাঠানো হচ্ছে।
দেশের ভেতরের সম্পদ: ঢাকায় ২টি এবং চট্টগ্রামে ১০টি ফ্ল্যাট, ৯টি দোকান, ২৭টি জমি এবং কালুরঘাট এলাকার ৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে ঢাকায় ফ্ল্যাট ক্রোক করে রিসিভার নিয়োগ করা হয়েছে এবং চট্টগ্রাম ও আনোয়ারার জমি ও কোম্পানির শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
সম্পদ ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়া
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম এবং কৌঁসুলি দেলোয়ার জাহান রুমি জানিয়েছেন, বিদেশে থাকা সম্পদ ফ্রিজ করার পাশাপাশি তা বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহায়তা পেতে এমএলএআর সহ আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। তবে বিদেশে সম্পদ শনাক্ত হলেও তা আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয় বলে জানিয়েছেন দুদক কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে, সকল অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে জাবেদের বক্তব্য, তাদের পারিবারিক ঐতিহ্যবাহী ব্যবসার আইনি আয় ও ব্যাংক ঋণের অর্থ দিয়েই এসব সম্পত্তি কেনা হয়েছে।
মন্তব্য করুন