

একদিকে মিলনায়তনে ভেসে আসছিল কবিতা ও সুরের মূর্ছনা, অন্যদিকে বাইরের খোলা প্রাঙ্গণে ক্যানভাসজুড়ে তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছিল ঘরছাড়ার যন্ত্রণা, পথের ক্লান্তি আর বেঁচে থাকার ব্যাকুল আকুতি। আবৃত্তি, গান, প্রামাণ্যচিত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণ ও জীবন্ত চিত্রকলার এক অনন্য সমন্বয়ে একাত্তরের শরণার্থী জীবনের আবেগঘন স্মৃতিতে ফিরে গেল মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘স্মৃতি ৭১’-এর উদ্যোগে আয়োজিত হয় স্মারক অনুষ্ঠান ‘৭১-এর শরণার্থী জীবন’ ও ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জিন্নাত আরা হক।
গিন্সবার্গের কবিতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
অনুষ্ঠানের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ফারুক এইচ খান বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতন এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া কোটি মানুষের দুর্দশা দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এসে শরণার্থী শিবিরের মানবিক বিপর্যয় নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। পরবর্তীতে সুরারোপিত এই দীর্ঘ কবিতাটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে।
অনুষ্ঠানে ১৫২ লাইনের এই কবিতাটি থেকে নির্বাচিত অংশ বাংলা ও ইংরেজিতে আবৃত্তি করেন মুস্তাক আহমেদ, নাজনীন পাপ্পু ও ফারুক এইচ খান। কবিতার সুর ধরে মৌসুমি ভৌমিকের বহুল পরিচিত গানটি পরিবেশন করেন নবনিতা হাবিব চৌধুরী। এছাড়া প্রদর্শিত হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘একাত্তরের শরণার্থী’।
রক্তঝরা দিনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও স্বজন হারানোর বেদনা
মঞ্চে সরাসরি নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন একাত্তরের প্রত্যক্ষদর্শীরা। আবৃত্তিশিল্পী ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে এক হৃদয়বিদারক স্মৃতিচারণ করেন। ১৯৭১ সালে অপারেশন সার্চলাইটের সময় খুলনা থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, "পথিমধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছিলাম আমরা। কোনো মতে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে শরণার্থী শিবিরে পৌঁছাই।" সেখানে নিজের মাকে হারানোর করুণ কথা স্মরণ করে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, ইতিহাসের বিশাল ক্যানভাসের আড়ালে একটি পরিবারের বিচ্ছেদ আর সন্তানের শোক চিরকাল চাপা পড়ে থাকে।
স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠশিল্পী শাহীন সামাদ স্মরণ করেন সাংস্কৃতিক সংগ্রামের দিনগুলো। তিনি জানান, কীভাবে শরণার্থী শিবির ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল জোগাতে কাজ করেছিলেন। অনুষ্ঠানে তিনি একাত্তরের কয়েকটি অনুপ্রেরণামূলক গান গেয়ে শোনান।
অনুষ্ঠানে আরও স্মৃতিচারণ করেন শঙ্কর লাল সাহা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ ফারাজি। পাশাপাশি, মুক্তিযুদ্ধের সময় ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে শিল্পীরা যেভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, সেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের মঞ্চে নিয়ে আসেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব জামান। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা উত্তরীয় পরিয়ে তাঁদের সম্মাননা জানান।
সংগ্রামের চিত্রশিল্প ও প্রামাণ্য দলিল
মিলনায়তনের পরিবেশনার পাশাপাশি বাইরে চলছিল এক ভিন্নধর্মী শিল্পযাত্রা। দেশের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পীরা ক্যানভাসে তুলির আঁচড়ে দৃশ্যমান করছিলেন যুদ্ধ, দেশত্যাগ, ক্ষুধা, মহামারি ও আশ্রয়ের তাগিদে ছোটা মানুষের জীবন্ত চিত্র।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, লেখক ও প্রকাশক মফিদুল হক তাঁর বক্তব্যে বলেন, "একাত্তরের শরণার্থী অভিজ্ঞতা কেবল কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি লাখো মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষতি ও অভিজ্ঞতার এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দলিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অনেক কাজ হলেও এক কোটি মানুষের শরণার্থী জীবন নিয়ে পৃথক গবেষণার তাগিদ এখনো রয়ে গেছে।" তৎকালীন সময়ে আশ্রয় ও সহায়তা দেওয়ার জন্য ভারতের অবদানকে স্মরণ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপে তরুণ প্রজন্মকে দিয়ে এই ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করানো উচিত।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে অভিভাবক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোগী হতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একদিন শিশুদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তাঁরা বলেন, যত বেশি সত্য ইতিহাস তুলে ধরা হবে, দেশপ্রেম তত বেশি জাগ্রত হবে।
কবিতা, গান, স্মৃতিচারণ ও ক্যানভাসের এই আবেগঘন আয়োজন একাত্তরের শরণার্থী সংকটকে কেবল একটি পুরনো ঘটনা হিসেবে নয়, বরং নতুন প্রজন্মের সামনে মানবিক ইতিহাসকে পুনরাবিষ্কারের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে উপস্থিত করেছে।
মন্তব্য করুন