ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা
আবু সাঈদ হত্যা

এক মৃত্যুর হাজারো প্রশ্ন

এনায়েত কবির
৩০ জুলাই ২০২৬, ০২:২৬ পিএম
৩০ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
এক মৃত্যুর হাজারো প্রশ্ন

অনলাইন পোর্টাল ‘নর্থইস্ট নিউজ’-এ প্রকাশিত মূল প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক এনায়েত কবির। ‘জুলাই কেলেঙ্কারি’ (July Scam) নিয়ে ৮ পর্বের মূল প্রতিবেদনের ৫ম পর্ব প্রিয়ভূমি পাঠকদের জন্য হুবহু বাংলায় অনুবাদ করে নিচে তুলে ধরা হলো।

রংপুর আবু সাঈদের মৃত্যুর দুই বছর পর, পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্য, বিতর্কিত ফরেনসিক প্রমাণ এবং দাপ্তরিক বিবরণী নিয়ে আলোচনা থামেনি।

দুটি দৃশ্য যদি গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়, তবে একটি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর, বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস ঢাকায় আগমন করেন এবং একটি নাগরিক সংবর্ধনায় উভয় হাত প্রসারিত করে ঘোষণা করেন, “জাতির বুক চওড়া হয়েছে।”

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, রংপুরে আবু সাঈদ ঠিক একই ভঙ্গিতে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি পুলিশকে গুলিবর্ষণে প্ররোচিত করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।

একজন শিক্ষার্থীর নিহত হওয়ার দৃশ্যটি দ্রুত গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক জনআবেগ তৈরি করে। এমন এক সময়ে যখন জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কিছু রূপকার শপথ নিয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা করছেন যে, "জুলাই অভ্যুত্থান পুরোপুরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে, মার্কিন সমর্থিত এবং সামরিক 'সফট ক্যু'-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল," তখন তথাকথিত জুলাই গণহত্যা এবং জুলাই শহীদদের বিবরণীগুলো রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় রংপুরের একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদ গুলিতে নিহত হন। তিনিই ছিলেন এই আন্দোলনে নিহত প্রথম ব্যক্তি। তার মৃত্যুর পরমুহূর্ত থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, তিনি ঠিক কীভাবে মারা গিয়েছিলেন তার প্রকৃত পরিস্থিতি হয়তো কখনোই উদঘাটিত হবে না।

গণমাধ্যম তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদ প্রকাশ করে যে, “পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নিহত হয়েছেন।”

‘গুলিবর্ষণ’ বা ‘গুলি’ শব্দটিই জনমত গঠনে মূল উপাদান হয়ে ওঠে। কোটি কোটি মানুষ এই বিবরণীটি মেনে নেয় যে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী একজন শিক্ষার্থীকে হত্যা করেছে। অথচ দুই বছর পরও আবু সাঈদ কীভাবে মারা গিয়েছিলেন তা সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

২০২৫ সালের ৭ আগস্ট, আবু সাঈদ হত্যা মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যসহ ৩০ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট, আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন খান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সাক্ষ্য দেন। তিনি জানান যে, দাফনের আগে ছেলের গোসল করানোর সময় তিনি আবু সাঈদের মাথার পেছনের অংশে রক্ত ক্ষরণ, বুকে গুলির ক্ষত এবং সমস্ত বুক রক্তে ভেসে যেতে দেখেছেন।

একই দিনে একটি বাংলা দৈনিক পত্রিকা খবর প্রকাশ করে যে, আবু সাঈদের মাথার পেছনে গুলির ক্ষত ছিল এবং বুকের ওপর রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে দেখা যায় যে আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছেন এবং স্পষ্টতই তিনি একদল পুলিশ সদস্যের মুখোমুখি।

মামলাটিতে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা—সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়—ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

পত্রিকাটিতে প্রশ্ন তোলা হয়: তারা যদি তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রাণঘাতী গুলি চালিয়ে থাকেন, তবে তার মাথার পেছনে গুলির ক্ষত কীভাবে সৃষ্টি হলো?

আবু সাঈদ হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে আবু সাঈদ ছররা গুলিতে (pellet shots) মারা গেছেন।

রংপুর মেডিকেল কলেজের যে ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট ময়নাতদন্ত করেছিলেন, তিনিও একই সাক্ষ্য দেন। তখন এই প্রশ্ন ওঠে যে, কেন “পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নিহত হয়েছেন”—এই বিবরণীটি ধারাবাহিকভাবে প্রচার করা হতে থাকল?

বিষয়টি বোঝানোর জন্য তিনটি পৃথক ব্যাখ্যা রয়েছে:

  • তাকে পুলিশের রাবার বুলেটে হত্যা করা হয়েছে।
  • সাঈদকে পুলিশের ছররা গুলিতে হত্যা করা হয়েছে।
  • তাকে পুলিশের লাইভ গুলিতে (gunfire) হত্যা করা হয়েছে।

যুক্তির খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে “আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন” বক্তব্যটি সঠিক, তবুও প্রশ্ন থেকে যায় সেখানে কী ধরনের গুলি বোঝানো হয়েছে: ৭.৬২ মিমি তাজা গুলি, নাকি ছররা গুলি, নাকি রাবার বুলেট?

পুলিশ সংস্কারের পর অহিংস বা অপ্রাণঘাতী হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ ছররা গুলি ও রাবার বুলেট কি এখনও পুলিশ বাহিনীতে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি এই গোলাবারুদগুলোকে এখন বাস্তবে প্রাণঘাতী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে?

২০২৫ সালের ২৮ আগস্টের পর, আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে একটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিককে ফোন করেন।

তিনি বলেন, আবু সাঈদের বাবা তার সাক্ষ্যে ছেলের মাথার পেছনে গুলির ক্ষত ছিল বলে উল্লেখ করেননি। শুনানির সময় লেখা সাংবাদিকের নোটে ‘বুলেট’ শব্দটি ছিল। নোটের যথার্থতা যাচাই করতে বাংলা দৈনিকটি মকবুল হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে।

কিন্তু সংবাদপত্রের প্রতিনিধি তার পরিবর্তে আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেনের সাথে যোগাযোগ করতে সমর্থ হন, যিনি জানান যে তাদের বাবা ইতিমধ্যেই গ্রামে ফিরে গেছেন এবং তার সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

তিনি আরও যোগ করেন যে, যদিও অন্যান্য গণমাধ্যম মাথার পেছনে গুলির ক্ষতের কথা রিপোর্ট করেছে, তবে তার বাবা আদালতে এমন কোনো বক্তব্য দেননি। পরবর্তীতে মাথার পেছনে গুলির ক্ষতের তথ্যটি প্রতিবেদন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

যে প্রশ্নগুলো উঠে আসে তা হলো: তাজুল ইসলাম কেন সেই বাংলা দৈনিকের সাংবাদিককে ফোন করেছিলেন? সাক্ষ্যের বিষয়ে তিনি কেন হস্তক্ষেপ করেছিলেন?

আবু সাঈদের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, যিনি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সাক্ষ্য দেন। তার সাক্ষ্য অনুযায়ী, আবু সাঈদের মাথার পেছনে গুলির ক্ষত ছিল, তবে তিনি দাবি করেন যে তাকে সুরতহাল প্রতিবেদনে গুলিতে মৃত্যুর কথা না লেখার জন্য বাধ্য করা হয়েছিল।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।

প্রশ্ন হলো, তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্যের সাথে আবু সাঈদের বাবার সাক্ষ্যের গরমিল কেন? যদিও বাবা প্রাথমিকভাবে মাথার পেছনে গুলির ক্ষতের কথা বলেছিলেন, পরবর্তীতে তাজুল ইসলাম অন্য কথা বলেন।

রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট ড. মোহাম্মদ রাজিবুল ইসলামও ট্রাইব্যুনাল-২-এ সাক্ষ্য দেন। তার সাক্ষ্য অনুযায়ী, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পরিবর্তন করার জন্য তাকে বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং ডিজিএফআই, এনএসআই ও পুলিশের কর্মকর্তারা তাকে চাপ দিয়েছিলেন।তিনি আরও দাবি করেন যে, রাজি না হলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ভয়ের কারণে তিনি প্রতিবেদনে লেখেন যে আবু সাঈদ গুলির ক্ষতের চেয়ে মাথার আঘাতের কারণেই মারা গেছেন।

এই সাক্ষ্য সুরতহাল পরিচালনাকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্যের সাথে মেলে না। বরং এটি ময়নাতদন্তের ফলাফল সম্পর্কিত আবু সাঈদ ও তাজুল ইসলামের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়।

আবু সাঈদের বাবা এবং তাজুল ইসলাম কি অন্য কারও স্বার্থ হাসিল করছিলেন, এবং তাদের বিবরণ অন্যান্য সাক্ষীদের থেকে ভিন্ন কেন?

দুই বছর পার হয়ে গেছে কিন্তু আন্দোলনের অন্যতম পোস্টার বয়ের ওপর আসলে কে গুলি চালিয়েছিল—তা এখনও প্রতিষ্ঠিত বা প্রকাশ করা হয়নি। তার প্রাণঘাতী ক্ষতটি কি মাথার পেছনে ছিল নাকি বুকে? কী ধরনের গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছিল? এবং সাক্ষীরা কীভাবে বা কতটুকু তাজুল ইসলাম ও অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন? শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় আবু সাঈদের মরদেহ নিশ্চিতভাবেই মূল মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘বারবার মামলা না দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেন’

আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

সিঙ্গাপুরেও মিলল বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব / সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

​​​​​​​শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ চারজনের মধ্যে ৩ জনের লাশ উদ্ধার

মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সংলাপ ও নিরাপদ সমুদ্রপথের তাগিদ

গুলশানে আ’লীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৩২

সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের লাশ উদ্ধার

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

যেভাবে সমন্বিত ডিজিটাল-রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল ‘গুমচর’

শাহজালাল বিমানবন্দরের সামনে প্রবাসীর ২০০ গ্রাম স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগ

১০

এনবিআরে বড় রদবদল: একযোগে ৩৬ অতিরিক্ত কর কমিশনার বদলি

১১

প্রণোদনার দ্বিতীয় ধাপ: ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণে আরও ১০ ব্যাংকের চুক্তি

১২

প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেল: কোন গ্রেডে কত বেতনের প্রস্তাব?

১৩

বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা / বাংলাদেশে চাকরি হারাবে ছয় লাখ মানুষ, বাড়বে দারিদ্র্য

১৪

গাজীপুরে নিখোঁজের পরদিন ব্রহ্মপুত্র নদে ভেসে উঠল শিশুর মরদেহ

১৫

ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে প্রধান শিক্ষিকার করুণ মৃত্যু

১৬

নেপালে ভয়াবহ বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে ৬২৬, নিখোঁজ আড়াই হাজার

১৭

রঙ-তুলিতে সম্প্রীতি ও স্বাধীনতার গল্প, পুরস্কার পেল ১২ শিশু-কিশোর

১৮

রংপুরে ৪ খুনের বিচার দাবিতে ধানমন্ডিতে মানববন্ধন, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে বিতণ্ডা

১৯

৪৭৬ বিদেশি সহ নিখোঁজ দেড় হাজার / নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধস ও ভয়াবহ বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৭০

২০