

“আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান, তার বদলে আমি চাইনে কোনো দান...”—পঙ্কজ মল্লিকের এই গান আকাশবাণীতে বেজে উঠেছিল ১৯৭১ সালের ১৩ আগস্ট, নিছক একটি প্রস্তুতি সংকেত হিসেবে। এরপর ১৪ আগস্ট বাজল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের “আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি”—আর সেই মুহূর্তেই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম সাহসী অভিযান, “অপারেশন জ্যাকপট”।
প্রেক্ষাপট ও পূর্বপ্রস্তুতি — ফরাসি উপকূল থেকে পলাশীর প্রান্তর
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালনা করে ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর এই বর্বর আক্রমণের মুখে বাঙালি জাতি গর্জে ওঠে এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ ও গোলাবারুদ সরবরাহের প্রধানতম মাধ্যম ছিল সমুদ্র ও নৌপথ। করাচি থেকে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং অভ্যন্তরীণ নদীপথগুলো ব্যবহার করে প্রতিদিন টন কে টন অস্ত্র, গোলাবারুদ ও খাদ্যসামগ্রী এসে পৌঁছাত দখলদার সেনাদের হাতে। এই সামরিক সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করা না গেলে মুক্তিযুদ্ধকে দ্রুত বিজয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল। এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় মুক্তিযুদ্ধে নৌ-গেরিলা আক্রমণের ঐতিহাসিক পরিকল্পনা, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’।
অপারেশন জ্যাকপটের বীজরোপণ হয়েছিল হাজার হাজার মাইল দূরে ফরাসি উপকূলে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ফ্রান্সের ত্যুলো (Toulon) সাবমেরিন ডকইয়ার্ডে পাকিস্তানি সাবমেরিন ‘পিএনএস ম্যানগ্রো’ (PNS Mangro)-এ প্রশিক্ষণরত ছিলেন ১৩ জন বাঙালি সাবমেরিনার। যখন তারা জন্মভূমিতে গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার খবর পান, তখন দেশের টানে তারা নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ বাজি রাখার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭১ সালের ২৯শে মার্চ রাতে সাবমেরিনার আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী (বীর উত্তম)-এর নেতৃত্বে ৮ জন বাঙালি সাবমেরিনার ফরাসি ঘাঁটি থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে যান। ফ্রান্স থেকে সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় গিয়ে তারা ভারতীয় ট্রাস্টিশিপের সহায়তায় ভারতে পৌঁছান। এই ৮ জন দুঃসাহসী সাবমেরিনার হলেন: আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী, আহসানউল্লাহ, আবেদুর রহমান, মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ, বদিউল আলম, শেখ মো. আমিন উল্লাহ, আব্দুর রউফ ও মোশাররফ হোসেন।
“ফরাসি ডকইয়ার্ড থেকে যখন আমরা পালিয়েছিলাম, তখন আমাদের মাথায় কেবল একটাই চিন্তা ছিল—আমাদের প্রশিক্ষণকে দেশের কাজে লাগাতে হবে। পাকিস্তানি বাহিনীর নৌ-সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করতে না পারলে স্বাধীনতা বহুদূরে থেকে যাবে।” — সাবমেরিনার আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী (বীর উত্তম)
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী নৌ-যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে মুক্তিযুদ্ধের দশম সেক্টর বা ‘সেক্টর ১০’ গঠন করেন। সেক্টর ১০ ছিল সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সেক্টর—এর কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা ছিল না এবং এর কোনো স্থায়ী সেক্টর কমান্ডার ছিল না। বাংলাদেশের সমগ্র জলসীমা, সমুদ্র ও নদীবন্দরগুলো ছিল এই সেক্টরের আওতাধীন। যখন নৌ-কমান্ডোরা নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় অপারেশনে যেতেন, তখন সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক সেক্টর কমান্ডারের অধীনে তারা কাজ করতেন (যেমন চট্টগ্রাম অপারেশনের সময় সেক্টর ১-এর কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলামের পরিচালনায় তারা সমন্বয় করেছিলেন)।
নৌ-কমান্ডোদের প্রশিক্ষণের জন্য ১৯৭১ সালের ২৩শে মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদীয়ার ভাগীরথী নদীর তীরে ঐতিহাসিক পলাশীর স্মৃতিসৌধের নিকটে গড়ে তোলা হয় এক গোপন সামরিক প্রশিক্ষণ শিবির, যার সাংকেতিক নাম ছিল ‘সি-টু-পি’ (C2P - Camp 2 Plassey)। প্রশিক্ষণ শিবিরের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় নৌবাহিনীর কমান্ডার এম. এন. আর. সামন্ত এবং পলাতক বাঙালি সাবমেরিনারবৃন্দ। বিভিন্ন মুক্তিবাহিনী ক্যাম্প থেকে কঠিন শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রায় ৫১৫ জন উদীয়মান বাঙালি তরুণকে এই শিবিরের জন্য বাছাই করা হয়।
সিটুপি ক্যাম্পে এই তরুণদের টানা তিন মাস ধরে এক অমানুষিক ও কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলত অবিরাম সাঁতার, প্রায় ৫ থেকে ৭ মাইল অল-আউট সুইমিং, পানির তলদেশে নিঃশ্বাস চেপে রাখার কৌশল, লাইটওয়েট রাবার ফিন্স পরে নিঃশব্দে সাঁতার কাটা, খালি হাতে মারামারি এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক ‘লিমপেট মাইন’ (Limpet Mine) জাহাজের গায়ে স্থাপন করার নিখুঁত কৌশল। প্রতিটি কমান্ডোর সঙ্গে থাকত একটি করে লিম্পেট মাইন (যা চৌম্বকীয় শক্তিতে জাহাজের ধাতব শরীরে আটকে যেত), ফিন্স, একটি কমান্ডো ছুরি এবং সুইমিং ট্রাঙ্ক।
“প্রতিটি তরুণকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল যেন তারা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও শান্ত থাকতে পারে। পানির নিচে অন্ধকারের মধ্যে লিম্পেট মাইন সেট করার জন্য যে অদম্য সাহসের প্রয়োজন, তা তারা দেখিয়েছিল।” — ভারতীয় নৌবাহিনীর অফিসার ও প্রশিক্ষক
দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে নৌ-কমান্ডোদের প্রথম ব্যাচ প্রস্তুত হয়। পরিকল্পনা করা হয় একই রাতে, একই সময়ে পাকিস্তানের চার প্রধান নৌ-কেন্দ্র—চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, মোংলা সমুদ্রবন্দর, চাঁদপুর নদীবন্দর এবং নারায়ণগঞ্জ/দাউদকান্দি নদীবন্দরে একসঙ্গে আঘাত হানা হবে। এই যুগান্তকারী ও অভূতপূর্ব গেরিলা অপারেশনের নাম রাখা হয়—অপারেশন জ্যাকপট।
১৫-১৬ আগস্টের রণাঙ্গন — অপারেশন ‘জ্যাকপট’ ও চার বন্দরে হামলা
১৯৭১ সালের ১৫ই আগস্ট রাত ১২:০০ টা (১৬ই আগস্টের প্রথম প্রহরে)। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান তখন ঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন, বর্ষার মাতাল বৃষ্টি আর নদ-নদীর উন্মত্ত স্রোত। একদিকে পলিথিনে মোড়া ট্রানজিস্টারে অলক্ষে বেজে উঠেছে যুদ্ধের চড়ান্ত সঙ্কেত, অন্যদিকে চার বন্দরে অবস্থান নেওয়া দেড় শতাধিক বাঙালি নৌ-কমান্ডো বুকে লিম্পেট মাইন বেঁধে মৃত্যুর পরোয়ানা হাতে নিয়ে নেমে পড়েছেন উত্তাল পানিতে।
অপারেশনের জিরো আওয়ার নির্ধারিত হয়েছিল ১৫-১৬ই আগস্ট মধ্যরাতে। চার ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বাঙালি নৌ-কমান্ডোরা কীভাবে পরিচালনা করেছিলেন এই আত্মঘাতী অপারেশন, তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-
১. চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর (অপারেশন লিডার: সাবমেরিনার আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী)
চট্টগ্রাম বন্দর ছিল পাকিস্তানের মূল সামরিক ও রসদ সরবরাহের কেন্দ্রবিন্দু। সাবমেরিনার আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী (বীর উত্তম)-এর নেতৃত্বে ৬০ জন কমান্ডোর একটি দল ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে চট্টগ্রামে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে নির্বাচিত ৩১ জন নৌ-কমান্ডো চরম ঝুঁকি নিয়ে ১৫ই আগস্ট মধ্যরাতে পতেঙ্গা ও কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থানরত পাকিস্তানি জাহাজের অভিমুখে যাত্রা করেন।
কমান্ডোরা নদীর প্রবল স্রোত ও পাকিস্তানি পেট্রোল বোটের চোখ ফাঁকি দিয়ে সাঁতরে জাহাজের কাছে পৌঁছান। তারা পানির নিচে ডুবে থেকে লিম্পেট মাইনের টাইমার ৪৫ থেকে ৬০ মিনিটের জন্য সেট করে তা শত্রুর জাহাজের গায়ে চৌম্বকীয় বলের সাহায্যে আটকে দেন। রাত ১:৪০ মিনিটে বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো চট্টগ্রাম বন্দর। একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে কর্ণফুলীর পাড়।
ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম বোঝাই দুটি বৃহদাকার পাকিস্তানি জাহাজ—এমভি হারমুজ (MV Harmuj, প্রায় ৯,৯১০ টন সামরিক রসদ বহনকারী) এবং এমভি আল-আব্বাস (MV Al-Abbas, প্রায় ১০,৪১৮ টন গোলাবারুদ বহনকারী)। এর সঙ্গে বার্জ ও অরিয়েন্ট বার্জসহ অসংখ্য পন্টুন সমুদ্রের তলদেশে তলিয়ে যায়।
২. মোংলা সমুদ্রবন্দর (অপারেশন লিডার: সাবমেরিনার আহসানউল্লাহ)
পশুর নদীর মোহনায় অবস্থিত মোংলা বন্দরে ৪৮ জন নৌ-কমান্ডোর একটি দল নিয়ে সাবমেরিনার আহসানউল্লাহ (বীর প্রতীক) অপারেশন পরিচালনা করেন। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কমান্ডোরা সুন্দরবনের ঘেনো পথ ও নদীর প্রতিকূল পরিবেশ অতিক্রম করে পশুর নদীতে নোঙ্গর করে রাখা বিদেশি ও পাকিস্তানি সামরিক সহায়তাকারী জাহাজগুলোর দিকে এগিয়ে যান।
১৫ আগস্ট রাত আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে কমান্ডোদের নিখুঁত হামলায় মোংলা বন্দরে থাকা ৬টি বিশাল জাহাজ ও বার্জ (যার মধ্যে আমেরিকান গানবোট ও এসএস এভলোস উল্লেখযোগ্য) বিকট বিস্ফোরণে ছাতু হয়ে নদীতে ডুবে যায়।
৩. চাঁদপুর নদীবন্দর (অপারেশন লিডার: বদিউল আলম)
মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত চাঁদপুর নদীবন্দর ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ রসদ চলাচলের প্রধান রুট। বদিউল আলম (বীর উত্তম)-এর নেতৃত্বে ২০ জন নৌ-কমান্ডোর একটি দল চাঁদপুর বন্দরে এক দুঃসাহসিক অভিযান চালান।
কমান্ডোরা বুক সমান পানি ও তীব্র স্রোত ঠেলে এগিয়ে গিয়ে বন্দরে নোঙ্গর করা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি স্টিমার, গানবোট ও বার্জে মাইন লাগিয়ে দেন। রাত ২:০০ টার পর পর বিস্ফোরণে গানবোট ও রসদবাহী যানগুলো ধ্বংস হয়ে মেঘনার বুকে তলিয়ে যায়।
৪. নারায়ণগঞ্জ ও দাউদকান্দি নদীবন্দর (অপারেশন লিডার: সাবমেরিনার আবেদুর রহমান ও শাহজাহান সিদ্দিকী)
শীতলক্ষা ও মেঘনা নদী সংলগ্ন নারায়ণগঞ্জ ও দাউদকান্দি ফেরিঘাটে ২০ জন নৌ-কমান্ডোর দলটির নেতৃত্বে ছিলেন সাবমেরিনার আবেদুর রহমান (বীর উত্তম) ও শাহজাহান সিদ্দিকী (বীর বিক্রম)। দাউদকান্দি ফেরিঘাটে পন্টুন ও পরিবহনকারী ফেরিগুলো ধ্বংস করা অত্যন্ত জরুরি ছিল, যাতে পাকিস্তানি বাহিনীর সড়ক ও নদীপথের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।
পরিকল্পনামাফিক রাত ১২:৩০ মিনিট থেকে ১:০০ টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের তেলবাহী ট্যাংকার, পন্টুন এবং দাউদকান্দির গুরুত্বপূর্ণ নৌ-স্থাপনাগুলোতে লিম্পেট মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
“পানিতে নামার আগে আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়েছিলাম। কেউ জানি না বেঁচে ফিরব কিনা। কিন্তু যখন লিম্পেট মাইন জাহাজের গায়ে সেট করে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালাম, তখন মৃত্যুর ভয় উবে গিয়ে এক পরম তৃপ্তি ভর করেছিল।” — শাহজাহান কবীর (বীর প্রতীক), চট্টগ্রাম বন্দরে অংশগ্রহণকারী নৌ-কমান্ডো
একই রাতে চার বন্দরে এই অভাবনীয় ও সমন্বিত হামলায় পাকিস্তানি সামরিক চক্র সম্পূর্ণ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। দখলদার বাহিনী কোনো ধারণাই করতে পারেনি যে বাঙালি তরুণেরা পানির তলদেশ দিয়ে এসে তাদের সুরক্ষিত সমুদ্র ও নদীবন্দরগুলোকে এভাবে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।
বেতার তরঙ্গে গোপন সঙ্কেত — গান যখন যুদ্ধের নির্দেশ
বিশ্বের সামরিক ইতিহাসের যুদ্ধকৌশলগুলোর মধ্যে অপারেশন জ্যাকপটের এনক্রিপশন বা সঙ্কেত প্রেরণের পদ্ধতিটি ছিল অন্যতম অনন্য ও রোমাঞ্চকর। কোনো আধুনিক রেডিও সিগন্যাল বা ডিজিটাল কমিউনিকেশন মাধ্যম ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সাধারণ বেতার কেন্দ্রের বাংলা গানকে সংকেত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
চারটি পৃথক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কমান্ডোরা যখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হাইডআউটে অবস্থান করছিলেন, তখন তাদের সঙ্গে কোনো গোপন ওয়াকিটকি বা বার্তা প্রেরক ছিল না। দলনেতাদের কাছে ছিল কেবল একটি করে ছোট ট্রানজিস্টার রেডিও। ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং সেক্টর ১০-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়, আকাশবাণী কলকাতা (Akashvani Kolkata) কেন্দ্রের নিয়মিত গানের অনুষ্ঠান ‘অনুরোধের আসর’-এর মাধ্যমে অপারেশনের নির্দেশ পাঠানো হবে।
অপারেশনের জন্য দুটি নির্দিষ্ট গানকে সাংকেতিক সংকেত বা কোড সিগন্যাল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়:
প্রথম সংকেত: সতর্কবার্তা (৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি)
১৩ই আগস্ট ১৯৭১ সকালে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে বেজে ওঠে রবীন্দ্রসংগীত। পঙ্কজ মল্লিকের কণ্ঠে গাওয়া কালজয়ী সেই গান--
“আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান তার বদলে চাই নে কোনো দান”
এই গানটি প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাইডআউটে থাকা গ্রুপ লিডাররা বুঝে যান যে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। সাধারণ শ্রোতাদের কাছে এটি একটি সাধারণ রবীন্দ্রসংগীত মনে হলেও কমান্ডোদের কাছে এটি ছিল রণাঙ্গনে নামার প্রাথমিক হুইসেল।
দ্বিতীয় সংকেত: চূড়ান্ত নির্দেশ (২৪ ঘণ্টার মধ্যে জিরো আওয়ার)
১৪ আগস্ট ১৯৭১ সন্ধ্যায় আকাশবাণীর নিয়মিত অনুষ্ঠান চলাকালে বেজে ওঠে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সুমধুর কণ্ঠের সেই বিখ্যাত গান-
“আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুরবাড়ি ওরে তোরা সব উলুধ্বনি কর”
এই গানটির সম্প্রচারের গভীর অর্থ ছিল—আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ ১৫ই আগস্ট দিবাগত রাতে জিরো আওয়ারে চূড়ান্ত আক্রমণ চালাতে হবে এবং ঘাঁটি ত্যাগ করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে রওয়ানা হতে হবে।
সংকেত প্রেরণের সময়ক্রম ও অর্থ
| ১৩ই আগস্ট, ১৯৭১ (সকাল) | প্রথম গান সম্প্রচার(পঙ্কজ মল্লিক) | ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণের প্রস্তুতি |
| ১৪ই আগস্ট, ১৯৭১ (সন্ধ্যা) | দ্বিতীয় গান সম্প্রচার (সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়) | ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জিরো আওয়ার (আক্রমণ) |
| ১৫ই আগস্ট, ১৯৭১ (মধ্যরাত) | জিরো আওয়ার (১৫-১৬ই আগস্ট রাত) | লিম্পেট মাইন বিস্ফোরণ ও সফলতা |
“১৪ই আগস্ট সন্ধ্যায় যখন ছোট ট্রানজিস্টারে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানটি বাজল, আমি পাশে থাকা সহযোদ্ধাদের কিছু বুঝতে না দিয়েই মনে মনে হিসাব করে নিলাম। সময় এসে গেছে। রাত ১২টার পর আমাদের নামতে হবে নদীর হিমশীতল পানিতে।” — মতিউর রহমান (বীর উত্তম), সহ-দলনেতা, দাউদকান্দি ও চাঁদপুর গ্রুপ
গোপনীয়তার মাত্রা এতটাই নিখুঁত ছিল যে, কমান্ডো দলের সাধারণ সদস্যরা পর্যন্ত প্রথম গানের প্রকৃত অর্থ জানতেন না; কেবল দলনেতা এই সঙ্কেত ডিকোড করার দায়িত্বে ছিলেন। এর ফলে শত্রুপক্ষ বা স্থানীয় রাজাকাররা ঘূণাক্ষরেও টের পায়নি যে একটি আকাশবাণীর রোমান্টিক কিংবা লোকসংগীতের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিশাল এক সামরিক অভিযানের বার্তা।
অপারেশন পরবর্তী প্রভাব — পাক সামরিক চক্রের পতন ও আন্তর্জাতিক চিত্র
অপারেশন জ্যাকপট কেবল কয়েকটি শত্রু জাহাজ বা পন্টুন ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক গতিপথ পরিবর্তনের এক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মাইলফলক। ১৫ ও ১৬ই আগস্টের মধ্যরাতে পরিচালিত এই অভিযানের প্রভাব পড়েছিল বিশ্ব রাজনীতি ও কূটনৈতিক অঙ্গনে।
১. শত্রুর অর্থনৈতিক ও সামরিক সরবরাহ লাইন চুরমার
একদিনের অপারেশনে চার বন্দরে প্রায় ২৬টি প্রধান সামরিক জাহাজ, গানবোট, বার্জ, ট্যাংকার এবং অসংখ্য পন্টুন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তানি সৈন্যদের জন্য নির্ধারিত এক লাখ টনেরও বেশি সামরিক অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি ও খাদ্যসামগ্রী সমুদ্র ও নদীর তলদেশে তলিয়ে যায়। এতে ঢাকাসহ দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
২. আন্তর্জাতিক নৌ-অবরোধ ও ইন্সুরেন্স রেড অ্যালার্ট
অপারেশন জ্যাকপটের পর আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো চরম আতঙ্কে পড়ে যায়। বিশ্বখ্যাত বীমা সংস্থা 'লয়েডস অব লন্ডন' (Lloyds of London) তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধ অঞ্চল’ (High-Risk War Zone) হিসেবে ঘোষণা করে এবং জাহাজের বীমা প্রিমিয়াম এক লাফে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে কোনো বিদেশি পণ্যবাহী ও বাণিজ্যিক জাহাজ চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দরে আসতে অস্বীকৃতি জানায়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বিশ্ববাজার থেকে কার্যত সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
৩. পাকিস্তানের মিথ্যা প্রচারণার চরম পরাজয়
১৯৭১ সালের মধ্য আগস্ট পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচার করছিল যে, “পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং সেখানে কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা মূলধারার প্রতিরোধ নেই; সামান্য কিছু দুষ্কৃতকারী সীমান্তে উপদ্রব করছে।”
কিন্তু অপারেশন জ্যাকপটের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব গণমাধ্যম বিবিসি (BBC), ভয়েস অব আমেরিকা (VOA), দ্য টাইমস অব লন্ডন, বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এএফপি শীর্ষ খবর হিসেবে পরিবেশন করে: "বাঙালি নৌ-গেরিলারা এক রাতেই ধ্বংস করে দিয়েছে পাকিস্তানের প্রধান প্রধান সমুদ্র ও নদীবন্দর।" ইয়াহিয়া খানের প্রচারণার সত্যতা বিশ্ব দরবারে এক নিমিষেই মিথ্যায় পর্যবসিত হয়।
৪. মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধি ও চূড়ান্ত বিজয়ের পথ সুগম
অপারেশন জ্যাকপটের সফলতা বিশ্বজুড়ে প্রবাসী বাঙালি ও দেশের ভেতরের অবরুদ্ধ কোটি মানুষকে এক অভাবনীয় উদ্দীপনা জোগায়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাধারণ বাঙালি তরুণরা ন্যূনতম সম্পদে পৃথিবীর অন্যতম সুপ্রশিক্ষিত সামরিক নৌ-ঘাঁটিতে ঢুকে ধ্বংসলীলা চালাতে সক্ষম। এর পরপরই দেশের সর্বত্র মুক্তিকামী গেরিলা যোদ্ধাদের আক্রমণ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়কে তরান্বিত করেছিল।
অপারেশন জ্যাকপটে অংশগ্রহণকারী বীর কমান্ডোদের অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীতে বহু কমান্ডোকে ‘বীর উত্তম’, ‘বীর বিক্রম’ এবং ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করে। জীবনের পরোয়া না করে রাতের অন্ধকারে শীতল পানিতে নেমে শত্রুর জাহাজ উড়িয়ে দেওয়া সেই বীর তরুণদের আত্মত্যাগ চিরকাল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থাবলী
মন্তব্য করুন