

বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার অদম্য আকুতিতে চিকিৎসাশাস্ত্রের বই-খাতা ছেড়ে যিনি তুলে নিয়েছিলেন লিমপেট মাইন ও ড্যাগার, তিনি নৌ কমান্ডো ডা. মোহাম্মদ শাহ আলম। মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরে পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর অন্যতম রূপকার ও নির্দেশক ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে (সনদ নম্বর: ৫৬)।
ডা. মোহাম্মদ শাহ আলমের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৩ নভেম্বর নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার করমুল্লাপুর গ্রামে। ১৯৬৭ সালে কর্ণফুলী পেপারমিলস হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬৯ সালে রাঙ্গুনিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন তিনি। এরপর ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন এমবিবিএস প্রথম বর্ষের অদম্য এক তরুণ ছাত্র।
পলাশীর ভাগীরথী ও আত্মঘাতী প্রশিক্ষণ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যার পর তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গমন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ২৩ মে মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল এম এ জি ওসমানীর নির্দেশে ‘নৌ-কমান্ডো সেক্টর’ (সি-সেক্টর) গঠিত হলে বিভিন্ন সেক্টর থেকে তরুণদের মধ্য থেকে নৌ-কমান্ডো বাছাই শুরু হয়। শাহ আলমও কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ায় টিকে যান।
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর নির্জন ক্যাম্পে টানা আড়াই মাস কঠোর ও প্রাণঘাতী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শুরুর আগেই তরুণদের স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছিল—এটি একটি আত্মঘাতী যুদ্ধ, যেখান থেকে জীবিত ফেরার গ্যারান্টি নেই।
চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ ও দুঃসাহসিক রেকি অপারেশন
অপারেশন জ্যাকপটের জন্য দলনেতা এ ডব্লিউ চৌধুরীর অধীনে ৬০ জনের যে মূল স্কোয়াড গঠিত হয়, শাহ আলম ছিলেন সেই দলের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ৮ আগস্ট হরিণায় আসার পর চট্টগ্রাম বন্দর আক্রমণের সুবিধার্থে পুরো দলকে ৩টি উপ-দলে ভাগ করা হয়। শাহ আলমকে একটি উপ-দলের কমান্ডার বা দলনেতার দায়িত্ব দেওয়া হয় (অপর দুই কমান্ডার ছিলেন মোজাহার উল্লাহ ও আবদুর রশিদ)।
অপারেশন জ্যাকপট: সেই রক্তঝরা ১৫ আগস্ট
১৪ আগস্ট আকাশবাণী রেডিওতে নির্ধারিত দ্বিতীয় সংকেত নিশ্চিত হওয়ার পর অস্ত্র ও মাইন গোপন সরঞ্জাম দিয়ে আনোয়ারা থানার চরলক্ষ্যার খামারবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
১৫ আগস্ট প্রথম প্রহরে (১৪ আগস্ট মধ্যরাতের পর) ৩৭ জন আত্মঘাতী কমান্ডো ৩ জন করে মোট ১২টি গ্রুপে ভাগ হয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে লিমপেট মাইন ও ড্যাগার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন কর্ণফুলী নদীতে। নদী তীরে পাহারায় থেকে এ ডব্লিউ চৌধুরী ও মোজাহার উল্লাহর সাথে শাহ আলম পুরো অপারেশনের বিদায় ও নিরাপত্তা তদারকি করেন।
| অপারেশন জ্যাকপটে ডা. শাহ আলমের ভূমিকা | বিবরণ |
| মূল পদবি ও খেতাব | দলনেতা/কমান্ডার, বীর উত্তম (সনদ নম্বর: ৫৬) |
| অপারেশনের স্থান | চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও কর্ণফুলী নদী এলাকা |
| মূল দায়িত্ব | বন্দর রেকি, টাইডাল চার্ট সংগ্রহ ও নদী তীর রক্ষা সমন্বয় |
| অপারেশনাল সাফল্য | এমভি আল আব্বাস, এমভি হরমুজসহ ১০টি জাহাজ ও গানবোট ধ্বংস |
রাত ১টা ৩০ থেকে ২টার মধ্যে মাইনগুলো বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকে। এমভি আল আব্বাস, এমভি হরমুজ, অস্ত্র ও রসদবাহী একাধিক বার্জ ও গানবোটের সলিল সমাধি ঘটে।
অভিঘাত ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
অপারেশন জ্যাকপটের খবর সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই ঘটনার পর পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং জেনারেল ওসমানীর কঠোর সতর্কবার্তার পর বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সেপ্টেম্বরের পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে অস্বীকৃতি জানায়।
স্বাধীনোত্তর জীবন ও প্রয়াণ
স্বাধীনতার পর ডা. মোহাম্মদ শাহ আলম পুনরায় মেডিকেল পড়াশোনা সম্পন্ন করে ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন এবং সহকারী সার্জন পদে যোগ দেন। ১৯৮২ সালে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি পান।
দেশের এই বীর নৌ কমান্ডো ও চিকিৎসক ১৯৮৫ সালের ৭ মে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তথ্যসূত্র
মন্তব্য করুন