

১৯৭১ সালের ২২ জুন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের এক অত্যন্ত ঘটনাবহুল এবং কূটনৈতিক দিক থেকে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টিকারী দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এদিন একদিকে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতা ও পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র পাঠানোর গোপন আঁতাত বিশ্ব গণমাধ্যমে উন্মোচিত হয়, অন্যদিকে তেমনি কূটনৈতিক তৎপরতা এবং দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ আরও জোরদার হয়ে ওঠে।
১. নিউইয়র্ক টাইমসের বোমা: মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পাকিস্তানে অস্ত্র পাচার
১৯৭১ সালের ২২ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস-এ বিশেষ প্রতিনিধি ট্যাড সুলচের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ‘পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্র প্রেরণ’ শিরোনামের সেই প্রতিবেদনে ফাঁস করা হয় যে, মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের পতাকাবাহী সমরাস্ত্র বোঝাই জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর থেকে করাচীর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
‘পদ্মা’ ও ‘সুন্দরবন’ জাহাজের গোপন মিশন
পদ্মা জাহাজ: নিউইয়র্ক থেকে করাচীর উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া ‘পদ্মা’ নামের এই জাহাজটিতে ছিল আটটি যুদ্ধবিমান বা জঙ্গিবিমান, প্যারাশুট, ট্যাংক, কামান, অস্থায়ী বাঙ্কার, সামরিক বাহিনীর যানবাহনের খুচরা যন্ত্রাংশসহ বিপুল সামরিক সরঞ্জাম। এগুলো মার্কিন বিমানবাহিনীর মাপনাই স্টোরস এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্বৃত্ত সরবরাহ থেকে অত্যন্ত সস্তায় পাকিস্তান সরকারের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। জাহাজটি আগস্টের মাঝামাঝি নাগাদ পাকিস্তানে পৌঁছার কথা ছিল। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই জাহাজটি এর আগেও গত ২২ মার্চ সমরাস্ত্র নিয়ে করাচীতে পৌঁছেছিল, যা মূলত ২৫ মার্চের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বা বাঙালি গণহত্যায় ব্যবহৃত হয়。
সুন্দরবন জাহাজ: নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, ‘সুন্দরবন’ নামের আরেকটি পাকিস্তানি জাহাজ গত ৮ মে নিউইয়র্ক থেকে করাচী বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল, যাতে ছিল ট্যাংক এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ。 জাহাজটির ২৩ জুন (কারো মতে ২১ জুন) করাচী বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল।
মার্কিন প্রশাসনের বিভ্রান্তি ও দ্বিমুখী নীতি
নিউইয়র্ক টাইমসের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে প্রমাণ দাখিল করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে, ২৫ মার্চের পর এই অস্ত্র পাঠানো ঘোষিত নীতির পরিপন্থী। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এটিকে "অসাবধানতাবশত ভুল" এবং মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার "বিভ্রান্তি" বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ মার্কিন সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীও পাকিস্তানের কাছে বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রেখেছিল, যা কার্যত বাংলাদেশে চলমান গণহত্যায় সরাসরি সহায়তার শামিল ছিল।
২. প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ
২২ জুন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মুজিবনগরে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
"আমাদের আজ বড় লক্ষ্য হবে মাতৃভূমিকে সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত করে আমাদের ৬০ লাখ (শরণার্থী) মানুষকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনা। দলমত নির্বিশেষে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের প্রতিটি মানুষ বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ এই বন্ধুত্বের কথা চিরদিন মনে রাখবেন।"
ইউরোপে বিশেষ দূত আবু সাঈদ চৌধুরী
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও বহির্বিশ্বে বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এদিন নেদারল্যান্ডস সফরকালে সেদেশের সংসদের স্পিকার এবং সংসদীয় কমিটির বিদেশবিষয়ক সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বাংলাদেশের ওপর চালানো পাকিস্তানি হত্যাযজ্ঞের বিবরণ শুনে ডাচ সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান মন্তব্য করেন, এমন বর্বরতার পর বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে পারে না এবং তারা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে আদর্শগতভাবে সমর্থন দেবেন।
৩. ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন ও তীব্র প্রতিক্রিয়া
দিল্লির বিমানবন্দরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্মরণ সিং
শরণার্থী সমস্যা নিরসনে এবং গণহত্যা বন্ধে ভারতের অবস্থান জানাতে ছয়টি দেশ সফর শেষে ২২ জুন দিল্লি ফিরে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার স্মরণ সিং। বিমানবন্দরে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটি সম্পর্কে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে, তবে তা ভারতের কাছে দেওয়া তাদের নিজেদের প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিভঙ্গের শামিল হবে।
ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি বৈঠক
দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সভাপতিত্বে নব কংগ্রেসের সংসদীয় দলের সাধারণ পরিষদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সাংসদরা পূর্ববঙ্গের সংকট নিরসনে ভারতকে প্রয়োজনে "চরম ব্যবস্থা" বা সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানান। কাশ্মীরের লোকসভা সদস্য সৈয়দ আহমেদ আগা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, পাকিস্তানের ভাগাভাগি কোনো মুসলিম বা ইসলামবিরোধী বিষয় নয়, বরং পাকিস্তান বর্তমানে যে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাট চালাচ্ছে তা সরাসরি ইসলামবিরোধী。
পশ্চিমবঙ্গ ও সীমান্ত পরিস্থিতি
এদিন আদি কংগ্রেসের একটি সংসদীয় প্রতিনিধিদল পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয়তার তীব্র সমালোচনা করে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় রেডিও আকাশবাণীতে এক আবেগঘন ভাষণে পশ্চিমবঙ্গবাসীকে স্থানীয় বাসিন্দা ও শরণার্থীদের মধ্যে যেকোনো ধরনের ভেদ-বিদ্বেষ ভুলে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
৪. পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ঢাকা পরিস্থিতি
ব্রিটিশ প্রতিনিধি দলের আগমন
পূর্ব পাকিস্তানের সংকট নিরসনে ও সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে চার সদস্যের একটি ব্রিটিশ সংসদীয় প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে করাচী এসে পৌঁছায়। এই দলে ছিলেন লেবার পার্টির এমপি আর্থার বটমলি, রেজিনল্ড প্রেন্টিস এবং কনজারভেটিভ পার্টির জেমস র্যামডেন ও টবি জেসেল। তারা জানান, পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাণ সহায়তা এবং রাজনৈতিক সংকট নিয়ে তারা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা শেষে ঢাকা যাবেন।
পাকিস্তানি দোসর ও নেতাদের বক্তব্য
জুলফিকার আলী ভুট্টো: কোয়েটাতে এক বক্তব্যে বলেন, কনসোর্টিয়ামের (বৈদেশিক সাহায্য) সাহায্য বন্ধের হুমকি পাকিস্তানের ওপর একটি অপমানজনক বৈদেশিক চাপ।
খান আবদুল কাইয়ুম খান: পাকিস্তান মুসলিম লীগের এই সভাপতি দাবি করেন, ৬ দফা সমর্থনকারী আওয়ামী লীগসহ দেশবিরোধী সব দলকে রাজনীতি থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করতে হবে এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্রের অধীনে নতুন শাসনতন্ত্র তৈরি করতে হবে।
গোলাম আযম ও অন্যান্য: জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযম করাচিতে বলেন, কেবল ইসলামই দেশের দুই অংশকে একসূত্রে রাখতে পারে। অন্যদিকে নেজামে ইসলাম পার্টির প্রধান মাওলানা এ. কে. শামসুল হক এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্দলীয় সদস্য এস.বি জামান সামরিক শাসন আরও দীর্ঘায়িত করার এবং শান্তি কমিটির শাখা বাড়ানোর জোর দাবি জানান।
ঢাকায় সামরিক জান্তার ফরমান
ঢাকায় পাকিস্তানি সামরিক প্রশাসন এক কড়া নির্দেশিকা জারি করে। এতে বলা হয়, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেয়াল থেকে সমস্ত স্বাধীনতাকামী স্লোগান, দেয়াল লিখন এবং পূর্বের নির্বাচনী প্রতীক মুছে ফেলতে হবে, অন্যথায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৫. দেশব্যাপী প্রতিরোধ যুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব
২২ জুন দেশের বিভিন্ন সেক্টরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর বীর মুক্তিযোদ্ধারা সফল ও অতর্কিত গেরিলা আক্রমণ চালায়:
কুমিল্লা: মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রাজাপুর ঘাঁটির ভেতর গোপন পথে প্রবেশ করে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এই সফল অভিযানে ১৫ জন হানাদার সেনা হতাহত হয় এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।
খুলনা ও যশোর: মুক্তিবাহিনী যথাক্রমে খুলনার বৈকরি এবং যশোরের বেনাপোলে পাকিস্তানি বাহিনীর সীমান্ত ঘাঁটির ওপর জোরালো আক্রমণ চালায়।
বগুড়া: বগুড়ার মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পাঁচবিবি ঘাঁটির (ক্যাম্প) ওপর তুমুল আক্রমণ চালায়, যার ফলে হানাদার বাহিনীর প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: পঞ্চম, দশম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।
২. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস (সেক্টর দুই, সাত, আট ও নয়)।
৩. নিউইয়র্ক টাইমস (The New York Times), ২২ জুন ১৯৭১ সংস্করণের বিশেষ প্রতিবেদন。
৪. দৈনিক পাকিস্তান ও দৈনিক ইত্তেফাক, ২৩ ও ২৪ জুন ১৯৭১।
৫. দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা ও আনন্দবাজার পত্রিকা (ভারত), ২৩ ও ২৪ জুন ১৯৭১।
৬. মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালি: যুক্তরাজ্য – আবদুল মতিন, সাহিত্য প্রকাশ।
মন্তব্য করুন