

অনলাইন পোর্টাল ‘নর্থইস্ট নিউজ’-এ প্রকাশিত মূল প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক এনায়েত কবির। ‘জুলাই কেলেঙ্কারি’ (July Scam) নিয়ে ৮ পর্বের মূল প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রিয়ভূমি পাঠকদের জন্য হুবহু বাংলায় অনুবাদ করে নিচে তুলে ধরা হলো।
একটি অনানুষ্ঠানিক তদন্তে দাবি করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের তথাকথিত জুলাই শহীদ তালিকায় আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কহীন ব্যক্তিদের মৃত্যুকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা হতাহতের সংখ্যা এবং সরকারি নথির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
“আমাদের আরও লাশ দরকার—আরও লাশ।”
কিছু ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি অনানুষ্ঠানিক জোট (MARK & AUA)-এর নয় মাসব্যাপী তদন্তে বাংলাদেশের তথাকথিত ‘জুলাই কেলেঙ্কারি’ (July Scam) উন্মোচিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই তথাকথিত ছাত্র আন্দোলনই ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের কারণ হয়।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলা সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন, আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না—এমন বহু ব্যক্তির নাম সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে আন্দোলনটিকে প্রকৃতের তুলনায় অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী ও ব্যাপক বলে উপস্থাপন করা যায়।
শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পর, নর্থইস্ট নিউজ (NORTHEAST NEWS) তথাকথিত জুলাই আন্দোলন নিয়ে একটি নাগরিক-নেতৃত্বাধীন বিস্তৃত অনুসন্ধান পরিচালনা করে। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়, রাজনৈতিকভাবে সহিংস ঘটনাগুলোর একটি বড় অংশ ছিল পূর্বপরিকল্পিত একটি অভিযানের অংশ, যার উদ্দেশ্য ছিল হতাহতদের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো এবং বিভিন্ন কাল্পনিক উপাদান যুক্ত করে একটি নির্দিষ্ট বর্ণনা (ন্যারেটিভ) প্রতিষ্ঠা করা।
গেজেটে প্রকাশিত নিহতদের তালিকা—যার মধ্যে ভুক্তভোগীর সংখ্যা, মৃত্যুর তারিখ ও সময় এবং মৃত্যুর কারণ অন্তর্ভুক্ত ছিল—পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা অসংখ্য অসঙ্গতি শনাক্ত করেছেন বলে দাবি করেন। এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনে নর্থইস্ট নিউজ তাদের ভাষায় ‘জুলাই কেলেঙ্কারি’ উন্মোচন করবে বলে জানায়।
তদন্ত অনুযায়ী, গেজেটে এমন বহু ব্যক্তির নাম রয়েছে, যাদের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের কোটা আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই ছিল না। আরও দাবি করা হয়, তালিকাভুক্ত নিহতদের প্রায় অর্ধেকই ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মারা গেছেন।
এছাড়া অভিযোগ করা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধান মিশনকে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করেছে, যার মাধ্যমে তাদের তদন্তকে প্রভাবিত করা হয়েছে।
MARK & AUA-এর বিশদ বিশ্লেষণ অনুযায়ী:
ক্রমিক নং ১–২৪: এই ২৪ জনই ৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগে মারা যান। তবে তদন্তের দাবি অনুযায়ী, তাদের কেউই কোটা আন্দোলন বা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনায় নিহত হননি।
ক্রমিক নং ২৫–১০০: এই ৭৬ জনের সবাই ৫ আগস্ট বা তার পরে মারা গেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনের দাবি, তাদের কেউই কোটা আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় নিহত হননি।
ক্রমিক নং ১০১–৩৫৮: মোট ২৫৮ জন ৫ আগস্ট পুলিশ স্টেশনে হামলার সময় অথবা অজ্ঞাত স্নাইপারদের গুলিতে নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
ক্রমিক নং ৩৫৯–৩৭০: এই ১২ জন ৫ আগস্টের আগে পুলিশ স্টেশনে হামলা চালানোর সময় এবং পুলিশের প্রতিরোধের মধ্যে নিহত হন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন অসংশ্লিষ্ট কারণে মারা যাওয়া ব্যক্তিদেরও সরকারি শহীদ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে সরকারি শহীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সশস্ত্র বাহিনীর চাপে দেশত্যাগে বাধ্য হন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এরপর সারা দেশে সশস্ত্র মিছিল বের হয় এবং ঢাকার উত্তরা পূর্ব থানাসহ বিভিন্ন থানায় সমন্বিত হামলা চালানো হয়।
উত্তরা পূর্ব থানায় হামলার মুখে পড়লে পুলিশ সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে সন্ধ্যার আগে শটগানের গুলি ছোড়েন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কবির’ নামে এক ব্যক্তি, যিনি টঙ্গী থেকে একটি ‘বিজয় মিছিল’-এ অংশ নিতে এসেছিলেন, আজমপুর এলাকায় এক অজ্ঞাত স্নাইপারের গুলিতে আহত হন। পরে তাকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের জুলাই শহীদ গেজেটে ‘কবির’-এর নাম ক্রমিক নং ২০৪ হিসেবে রয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘কবির’ আসলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামি বাখের আলী।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাখের আলী চরমপন্থী সশস্ত্র সংগঠন ‘লাল্টু বাহিনীর’ সদস্য ছিলেন, যাকে স্বাধীনতাবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে টঙ্গীর আরিচপুরে ভুয়া পরিচয়ে বসবাস করতেন বলে দাবি করা হয়েছে।
বাখের আলী ছিলেন ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কালিদাসপুর বৈরাগীচর স্কুল মাঠে সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ চলাকালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নেতা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ‘কাজী আরেফ আহমেদ’ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত। একই ঘটনায় লোকমান হোসেন, ইয়াকুব আলী, ইসরাইল হোসেন এবং শামসের মণ্ডলও অভিযুক্ত ছিলেন।
এই হত্যা মামলায় মোট নয়জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে:
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির এক ঘটনায় বাখের আলী নিহত হন। পরে অভিযোগ করা হয়, পুলিশকে আক্রমণ করার সময় নিহত ওই ব্যক্তিকেই ‘কবির’ ছদ্মনামে জুলাই শহীদ গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বাখের আলীর প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা ছিল কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের কিশোরীনগর গ্রাম। কিন্তু জুলাই শহীদ গেজেটে তার স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার কলেজপাড়া উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও তাকে তার নিজ গ্রাম কিশোরীনগরেই দাফন করা হয়।
প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, বাখের আলীকে শুধু ভুয়া পরিচয়ে জুলাই শহীদ গেজেটে অন্তর্ভুক্তই করা হয়নি; বরং তার মৃত্যুর প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট দৌলতপুর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা—যাদের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল হাই সিদ্দিকী, দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোলায়মান শেখ, বোয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খাজা আলীসহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন—তার কবর পরিদর্শন করেন এবং সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।
মন্তব্য করুন