

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এক ভয়াবহ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একটি ভাড়া বাসায় মা ও তাঁর তিন মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে এক যুবক। ঘটনার পর পালানোর সময় উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে অভিযুক্ত ওই যুবকেরও মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বিকেল পর্যন্ত একে একে আক্রান্ত সবাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
নিহতরা হলেন— মা শাহিনুর বেগম (৩৮), তাঁর বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। অন্যদিকে গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্ত যুবকের নাম অন্তর মজুমদার। সে নোয়াখালীর সুবর্ণচর এলাকার কার্তিক মজুমদারের ছেলে এবং রায়পুরের একজন ভ্রাম্যমাণ ফল ব্যবসায়ী ছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে উত্তেজিত জনতার ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের অন্তত ৬ থেকে ৭ জন সদস্য আহত হয়েছেন।
যেভাবে ঘটে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত শাহিনুর বেগমের মূল বাড়ি কুমিল্লায় হলেও গত ১২-১৪ বছর ধরে তাঁরা রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। ২০১৯ সালে শাহিনুরের স্বামী মো. কামাল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার পর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তিনি আমির হোসেন মাস্টারের বাড়িতে থাকতেন।
বৃহস্পতিবার সকালে কোনো এক কারণে অন্তর মজুমদার ওই বাসায় প্রবেশ করে মা ও তিন মেয়েকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। চিৎকার শুনে প্রতিবেশী এক নারী এগিয়ে এসে অন্তরকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, পানির পাইপ ঠিক করতে এসেছে। কিন্তু সন্দেহ হওয়ায় ওই প্রতিবেশী চতুরতার সাথে বাইরে থেকে বাসার কলাপসিবল গেট আটকে দিয়ে স্থানীয়দের খবর দেন।
খবর পেয়ে স্থানীয়রা ছুটে এসে ঘাতক অন্তরকে ধরে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ ও স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় সবাইকে উদ্ধার করে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক শাহিনুর বেগম, তাঁর বড় মেয়ে সায়মা ও ছোট মেয়ে শিফাকে মৃত ঘোষণা করেন। মেজো মেয়ে ইকরাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় নেওয়ার পথে বিকেলের দিকে সে-ও মারা যায়। অপরদিকে গুরুতর আহত ঘাতক অন্তরকে সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
শোকে পাথর একমাত্র জীবিত সন্তান
শাহিনুরের একমাত্র ছেলে সিফাত হোসেন স্থানীয় বণিক সমিতির সভাপতির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। সকালে সে কর্মস্থলে থাকায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, সিফাত সকালে কাজে চলে আসায় ঘটনার কিছুই জানত না। পরে খবর পেয়ে সে পুরোপুরি আতঙ্কগ্রস্ত ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। কারও সাথে কথা বলার মতো অবস্থায় সে নেই।
তদন্তে পুলিশ, কারণ এখনো অস্পষ্ট
লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক এবং রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ সুপার জানান, ঘাতক অন্তর প্রায় দেড় বছর আগে এই বাড়িতেই সস্ত্রীক ভাড়া থাকত এবং মাস আটেক আগে বাসা ছেড়ে দেয়। পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরেই সে সকালে ওই বাসায় এসেছিল। তবে ঠিক কী কারণে এত বড় নৃশংস হত্যাকাণ্ড সে ঘটিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে পুলিশের তদন্ত চলছে।
সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) মো. আব্দুর রাশেদ জানান, ঘটনার পর উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে গিয়ে ইটপাটকেলের আঘাতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মন্তব্য করুন