ঢাকা সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১৭ জুন ১৯৭১: জগদীশপুর গণহত্যা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক যুদ্ধ এবং প্রতিরোধ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
১৭ জুন ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
১৭ জুন ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম
১৭ জুন ১৯৭১: জগদীশপুর গণহত্যা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক যুদ্ধ এবং প্রতিরোধ

১৯৭১ সালের ১৭ জুন ছিল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল দিন। এই দিনে একদিকে যেমন ঝালকাঠির জগদীশপুরে বর্বরোচিত গণহত্যা সংঘটিত হয়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা এক নতুন উচ্চতা লাভ করে。

১. জগদীশপুর গণহত্যা: পেয়ারা বাগানের রক্তগঙ্গা

১৭ জুন সকালে ঝালকাঠির জগদীশপুর, খাজুরা, রামপুর, মিরাখালি ও বেতরা গ্রামে এক নৃশংসতম গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। স্থানীয় শান্তিবাহিনী ও রাজাকারদের সহায়তায় ঘাতক দল পেয়ারা বাগানে প্রাণের ভয়ে আশ্রয় নেওয়া নিরপরাধ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘেরাও করে ফেলে। অবর্ণনীয় পৈশাচিক নির্যাতনের পর প্রায় ৬০ জন মানুষকে জগদীশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের পাশে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়।

২. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনীতিতে বড় সাফল্য

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত: প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে ব্রিটেনে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে আনুষ্ঠানিক নিয়োগ দেওয়া হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পরিচয়পত্রটি লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছে এবং ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের কাছে পাঠানো হয়। বাকিংহাম প্যালেস এই কূটনৈতিক পত্রের প্রাপ্তিস্বীকার করায় প্রকারান্তরে বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রচ্ছন্ন সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

হাউজ অব কমন্সে প্রবল দাবি: যুক্তরাজ্যের ১২০ জন লেবার দলীয় পার্লামেন্ট সদস্য (MP) হাউস অব কমন্সে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানান।

৩. ওয়াশিংটনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঐতিহাসিক ভাষণ

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং ওয়াশিংটন প্রেস ক্লাবের এক ভোজসভায় বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বলেন, পূর্ব বাংলার ট্র্যাজেডি আজ ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে জানান, প্রতিদিন প্রায় ১ লক্ষ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকছে, যা প্রতি সেকেন্ডে একজন শরণার্থীর সমান। তিনি অবিলম্বে পাকিস্তানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান। শরণ সিং স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে চায় না, বরং তাঁরা যে সার্বভৌমত্বের জন্য রক্ত দিচ্ছেন—সেই রাজনৈতিক সুরাহা কেবল ইসলামাবাদ ও ঢাকাই করতে পারে।

৪. মার্কিন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর চাপ

মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব: মার্কিন প্রতিনিধি সভার এশিয়া বিষয়ক সাব-কমিটির চেয়ারম্যান কর্নেলিয়াস গ্যালাঘার এবং মার্কিন সিনেট যৌথভাবে পাকিস্তানকে সব ধরনের সাহায্য বন্ধের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর ঐকমত্য: সুইডেন, হল্যান্ড, ইতালি, অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরি একযোগে ঘোষণা করে যে, পাকিস্তান পূর্ব বাংলার ওপর একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।

যুগোস্লাভিয়ার কড়া বার্তা: যুগোস্লাভিয়ার পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র জানান, প্রায় ৬০ লাখ বাঙালিকে উদ্বাস্তু করার পেছনে দায়ী পাকিস্তান সরকার এবং শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার নিরাপদ পরিবেশ তৈরির দায়িত্বও তাদেরই।

নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়: প্রভাবশালী এই পত্রিকা মার্কিন প্রশাসনকে অবিলম্বে সাহায্য বন্ধের আহ্বান জানিয়ে লেখে—যে সরকার নিজের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত, তাদের দেওয়া সাহায্য সঠিক খাতে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে।

৫. ভারতের অভ্যন্তরীণ তৎপরতা ও কূটনীতিকদের নিয়ে অচলাবস্থা নিরসন

ইন্দিরা গান্ধীর কঠোর অবস্থান: ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দিল্লির অর্থনীতিবিষয়ক সম্পাদকদের জানান, পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক সমাধান বলতে ভারত মূলত নির্বাচনে বিজয়ী শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতাকেই বোঝে। একই দিনে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খাঁ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলে ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের দাবি জানান।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতা: ঢাকা ও কলকাতায় আটকে পড়া ভারতীয় ও পাকিস্তানি কূটনীতিকদের নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্টের দেওয়া প্রস্তাব পাকিস্তান ও ভারত উভয় পক্ষই মেনে নেয়।

৬. পাকিস্তানপন্থী প্রচার ও ব্রিটিশ এমপিদের বিতর্কিত ভূমিকা

অবরুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তান সফররত ৩ সদস্যের ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি দলের সদস্য জেমস টিন এবং মিসেস জিল নাইট ঢাকা ও করাচিতে বিতর্কিত বক্তব্য দেন। তাঁরা দাবি করেন, ভারতের একতরফা প্রচারের কারণে বিদেশি পত্রিকায় সঠিক খবর আসছে না এবং দুষ্কৃতকারী দমনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মমতার প্রয়োজন ছিল।

এদিকে ভারত সীমান্তে ক্রমাগত মার খাওয়ার পর পাকিস্তান সরকার এক বিবৃতিতে উস্কানিমূলক আক্রমণের মিথ্যা অভিযোগ এনে ভারতকে চরম পদক্ষেপের হুমকি দেয়।

৭. রণাঙ্গনের বীরত্ব ও সম্মুখ যুদ্ধ

চাঁদগাজী ঘাঁটির প্রচণ্ড যুদ্ধ (চট্টগ্রাম): ট্যাংক, আর্টিলারি ও মর্টার নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি পুরো ব্যাটালিয়ন চট্টগ্রামের চাঁদগাজী ঘাঁটিতে মুক্তিবাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। ক্যাপ্টেন অলি, ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা ও ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের যৌথ নেতৃত্বে বীর মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহসিকতায় পাল্টা আক্রমণ করেন। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর কিছু ক্ষতি হলেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ৪৫ জন সৈন্য নিহত হয় এবং তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

কামুটিয়া খেয়া পারের সংঘর্ষ (টাঙ্গাইল): টাঙ্গাইলের বাসাইল থানার পশ্চিমে কামুটিয়া নর্থখোলা খেয়া পারে কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এতে হানাদার বাহিনীর ৫ জন সৈন্য নিহত হয়।

বিলোনিয়া ও দিনাজপুর ফ্রন্ট: ফেনীর পরশুরামের বিলোনিয়া ঘাঁটিতে পাকিস্তানি বাহিনী বিমানবাহিনীর সহায়তায় অতর্কিত আক্রমণ চালালে তীব্র প্রতিরোধের পর মুক্তিযোদ্ধারা কৌশলগত কারণে পিছু হটে চিতলিয়া গ্রামে অবস্থান নেন। অন্যদিকে দিনাজপুরের ঠনঠনিয়াপাড়ায় মেজর নাজমুল হক ও সুবেদার মেজর এ রবের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী দুটি কলামে বিভক্ত হয়ে শত্রুর ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র:অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।

২. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস(সেক্টর এক ও দুই)।

৩. মুক্তিবুদ্ধে প্রবাসী বাঙালি: যুক্তরাজ্য— আবদুল মতিন, সাহিত্য প্রকাশ।

৪. দৈনিক পাকিস্তান, ১৮ জুন ১৯৭১।

৫. দৈনিক ইত্তেফাকও দৈনিক আজাদ, ১৮ জুন ১৯৭১।

৬. দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকাও দৈনিক যুগান্তর(ভারত), ১৮ ও ১৯ জুন ১৯৭১।

৭. দ্য স্টেটসম্যান(যুক্তরাজ্য) ও নিউইয়র্ক টাইমস(যুক্তরাষ্ট্র), ১৭ ও ১৮ জুন ১৯৭১ সংখ্যা।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

একটি গান, একটি সংকেত, আর ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসাহসিক এক রাত / অপারেশন জ্যাকপট: রক্তে লেখা নৌ-সংগ্রামের মহাকাব্য

ভৌগোলিক বাধায় থমকে গেল ঢাকার বহু বছরের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা / “বাংলাদেশ কখনোই আসিয়ানের সদস্য হতে পারবে না”

১৭১ দিনের বেকারত্ব: প্রশিক্ষণ বিতর্কে অনড় সরকার

কীভাবে বাংলাদেশের জুলাইয়ের হতাহতের তালিকা প্রমাণ নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন তুলেছিল

জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে অভিযোগকারীকে আসামি এবং ভিকটিমকে বিবাদী করার অভিযোগ

জুলাই শহীদ গেজেটে আন্দোলন-বহির্ভূত মৃত্যুর নাম যেভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো

হাঁড়ি জ্বলছে না বাসায়, ঢাকা জুড়ে চরম গ্যাস সংকট

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি, উত্তপ্ত চট্টগ্রাম-ফেনী / হবিগঞ্জে বাধার পর সিলেটেও এনসিপির গাড়িবহরে হামলা

আবু সাঈদ হত্যা / এক মৃত্যুর হাজারো প্রশ্ন

‘ভারতীয় এজেন্ট’ আতঙ্ক ও শহীদ গেজেট বিতর্ক

১০

কওমি মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ও জঙ্গিবাদ: এক অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র

১১

গ্রিন ইয়ার্ডের আড়ালে রক্তের দাগ / জাহাজভাঙায় শতকোটির বিনিয়োগেও থামছে না মৃত্যু

১২

অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় শেষ হলো ‘বর্ষামঙ্গল উৎসব ১৪৩৩’

১৩

তীব্র গ্যাসসংকটে ধুঁকছে শিল্পখাত, উৎপাদনে স্থবিরতায় চরম ভোগান্তিতে গ্রাহক

১৪

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণকবরের দাবি একটি ‘কল্পকাহিনী’

১৫

‘টেসলা’ সমাচার: বৃষ্টি এলেই ভাড়া দ্বিগুণ, রাস্তায় নামলেই ঝুঁকি

১৬

‘জুলাই শহীদ’ গেজেটের অর্ধেক মৃত্যুই ৫ আগস্ট-এর পর

১৭

কীভাবে বাখের আলী বাংলাদেশের ‘গেজেটভুক্ত’ জুলাই শহীদ তালিকায় ‘কবির’ হয়ে গেলেন

১৮

আঁধারেই ডুবে আছে রাজধানী / বাতিহীন রাস্তায় বাড়ছে ছিনতাই, দুর্ঘটনা আর নিরাপত্তাহীনতার ভয়

১৯

নগরায়ণের চাপ, পাল্টে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস

২০