ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

বাড়ল বিদ্যুতের দাম, মূল্যস্ফীতির আগুনে নতুন চাপ

লাইফলাইন গ্রাহকদের বিল বাড়ছে প্রায় ১৫ শতাংশ, চরম সংকটে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত
প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
বাড়ল বিদ্যুতের দাম, মূল্যস্ফীতির আগুনে নতুন চাপ
  • বিদ্যুতের দাম বাড়ল পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে, সঞ্চালন চার্জও ঊর্ধ্বমুখী
  • সেচ ও শিল্পে ধাক্কা, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
  • দাম না বাড়িয়ে খাতের অব্যবস্থাপনা ও ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর তাগিদ

উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এল বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ কমাতে পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গ্রাহক বা খুচরা পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম গড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা (১৬.৬৮ শতাংশ) এবং পাইকারি পর্যায়ে ১ টাকা ৩৯ পয়সা (১৯.৮৫ শতাংশ) বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের সঞ্চালন (ট্রান্সমিশন) চার্জও বাড়ানো হয়েছে ২৩.৯৬ শতাংশ।

চলতি জুন মাসের বিল থেকেই নতুন এই মূল্যহার কার্যকর হবে। গতকাল বুধবার রাজধানীর রমনায় বিইআরসি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এই ঘোষণা দেন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে শুধু বিদ্যুৎ বিলই বাড়বে না, বরং শিল্প উৎপাদন, কৃষি সেচ ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ চেইন-রিঅ্যাকশন বা নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে।

এক নজরে বিদ্যুতের নতুন ও পুরানো মূল্যহার

বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায়।

গ্রাহক পর্যায়ে বিভিন্ন ধাপের মূল্যবৃদ্ধি

লাইফলাইন (০–৫০ ইউনিট): বিদ্যমান হার থেকে ১৪.৯০% বেড়ে প্রতি ইউনিট হচ্ছে ৫.৩২ টাকা (২০১০ সালে যা ছিল মাত্র ২.৫০ টাকা)।

প্রথম ধাপ (০–৭৫ ইউনিট): ৫.২৬ টাকা থেকে ১৭.৪৯% বেড়ে হচ্ছে ৬.১৮ টাকা।

দ্বিতীয় ধাপ (৭৬–২০০ ইউনিট): ৭.২০ টাকা থেকে ১৮% বেড়ে হচ্ছে ৮.৫০ টাকা।

তৃতীয় ধাপ (২০১–৩০০ ইউনিট): ৭.৫৯ টাকা থেকে ১৯.৮৯% বেড়ে হচ্ছে ৯.১০ টাকা।

চতুর্থ ধাপ (৩০১–৪০০ ইউনিট): ৮.০২ টাকা থেকে ১৯.৯৫% বেড়ে হচ্ছে ৯.৬২ টাকা।

পঞ্চম ধাপ (৪০১–৬০০ ইউনিট): ১২.৬৭ টাকা থেকে ১৮.۴৬% বেড়ে হচ্ছে ১৫.০১ টাকা।

সর্বশেষ ধাপ (৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে): ১৪.৬১ টাকা থেকে ১৮.৭৫% বেড়ে হচ্ছে ১৭.৩৫ টাকা।

সেচ ও শিল্প খাতে বড় ধাক্কা, কমবে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা

উৎপাদনশীল খাতের মধ্যে সেচ পাম্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৫.২৫ টাকা থেকে ৬.০৪ টাকা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পে (ফ্ল্যাট) প্রতি ইউনিটে ১৮.৩০ শতাংশ বাড়িয়ে ১০.৭৬ টাকা থেকে ১২.৭৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বাণিজ্যিক ও অফিস, ইলেকট্রিক ভেহিকল, শিক্ষা, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানেও সমহারে দাম বাড়ানো হয়েছে।

কমিশনের হিসাবে, পাইকারি মূল্য বাড়ানোর পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। এর আগে এপ্রিল মাসে বিতরণ কোম্পানিগুলোর গণশুনানির প্রেক্ষিতেই এই দাম বাড়ানো হলো।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন: সুরক্ষার বদলে প্রান্তিক মানুষের ওপর কোপ

বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধিকে অত্যন্ত নেতিবাচক ও জনবিরোধী আখ্যা দিয়েছেন দেশের জ্বালানি ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা।

অধ্যাপক ম. তামিম (জ্বালানি বিশেষজ্ঞ): “বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে নিম্ন আয়ের ও ‘লাইফলাইন’ গ্রাহকদের ওপর। কম ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার যে লাইফলাইন ব্যবস্থা, সেখানে ভর্তুকি কমিয়ে আনা হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ভোজ্যতেল, প্লাস্টিকসহ প্রায় সব ধরনের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে। ফলে বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে এবং কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কৃষিতে সেচ ব্যয় বাড়ায় খাদ্য উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “শুধু দাম বাড়িয়ে নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার অদক্ষতা দূর করে এবং তেলভিত্তিক কেন্দ্র কমিয়ে রুফটপ সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়েও ভর্তুকি হ্রাস করা সম্ভব।”

এস এম নাজের হোসাইন (সহ-সভাপতি, ক্যাব): “জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের এই দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন করে তুলবে। বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, সিস্টেম লস ও রেন্টাল-কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের পেছনে বিপুল পরিমাণ 'ক্যাপাসিটি চার্জ' (উৎপাদন না করে বসে থেকেও টাকা নেওয়া) কমানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। অথচ সেই ব্যর্থতার দায় ও অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপানো হচ্ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ভোক্তাদের ওপর, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

সাধারণ মানুষের উদ্বেগ: রাজধানীর এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, “এমনিতেই বাজারে চাল, ডাল, আলু থেকে শুরু করে সব জিনিসের দাম বাড়তি। বাড়িভাড়া বাড়ছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিল এক লাফে এত টাকা বেড়ে গেলে আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের ঢাকা শহরে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অজুহাতে পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজি শুরু করতে পারে। ফলে আগামী দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতি লাগামহীন হয়ে পড়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতি সচল রাখতে এবং সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে বিদ্যুৎ খাতের অপচয় রোধ ও ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর অতিরিক্ত মার্কিন শুল্ক, কোন দেশে কত?

বাড়ল বিদ্যুতের দাম, মূল্যস্ফীতির আগুনে নতুন চাপ

নাটোরের ছাতনী গণহত্যা

৪ জুন ১৯৭১: ছাতনীতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, আন্তর্জাতিক চাপ ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধ

৩ জুন ১৯৭১: জাতিসংঘে তোলপাড়, বিশ্ব জনমত গঠন ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত

তোফায়েল আহমেদ / বর্ণাঢ্য রাজনীতির এক ফিনিক্স পাখি

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদ আর নেই

১ জুন ১৯৭১: নগরকান্দা গণহত্যা, রণাঙ্গনে বিজয় ও বিশ্ব কূটনীতির নতুন মোড়

৩১ মে ১৯৭১: ‘সমঝোতার সুযোগ নেই’, বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ ও রণাঙ্গনের খণ্ডচিত্র

৩০ মে ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা, রণাঙ্গনের প্রতিরোধ ও বিশ্ব কূটনৈতিক অঙ্গন

১০

রক্তস্নাত বুরুঙ্গা গণহত্যা (সিলেট)

১১

২৬ মে ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা, প্রতিরোধ ও বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গন

১২

ভীমনালী গণহত্যা: যে নির্মম ট্র্যাজেডি আজও এক উপেক্ষিত

১৩

২২ মে ১৯৭১: গণহত্যা, প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি

১৪

১৬২ পয়েন্টে ১৬০০ গডফাদার: কার ইশারায় ঢুকছে মাদক?

১৫

হত্যা মামলায় রক্তাক্ত সাংবাদিকতা

১৬

১৮ মে ১৯৭১: পাকিস্তানের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তীব্র প্রতিবাদ ও কূটনৈতিক যুদ্ধ

১৭

জাতীয় জাদুঘর থেকে বঙ্গবন্ধু কর্নার উধাও: ইতিহাস বিকৃতির আশঙ্কা

১৮

হামে শিশু মৃত্যু ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে মানববন্ধন, ১০ দফা দাবি

১৯

কক্সবাজারে হামের ভয়াবহ রূপ / ২০ বেডে ৮৭ শিশু

২০