

দেশের একমাত্র দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত চার মাস ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ না হওয়ায় মামলা দায়ের, আদালতে চার্জশিট দাখিল, সম্পত্তি জব্দ, আসামিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা এবং গ্রেপ্তারের মতো সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আইনি কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
কমিশনের বিকল্প হিসেবে দুদক সচিবের ক্ষমতা সাময়িকভাবে বাড়ানোর একটি প্রস্তাব সরকারকে দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি নতুন দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়লেও কমিশনের অনুমোদন না থাকায় চার মাসে ৮ হাজারেরও বেশি অভিযোগের নথি ফাইলবন্দি হয়ে ঝুলে আছে।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, কমিশন না থাকায় নতুন কোনো অনুসন্ধানের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। তবে আগের শুরু হওয়া অনুসন্ধান ও তদন্তের ফাইলগুলো বিভাগীয় পরিচালক ও মহাপরিচালক পর্যায়ে প্রস্তুত থাকলেও কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া তা আর এগোচ্ছে না। সংস্থার রুটিন কার্যক্রমগুলো অবশ্য চালু রয়েছে।
এর আগে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনকে দুদকের চেয়ারম্যান এবং সাবেক জেলা জজ মির্জা মুহাম্মদ আলী আকবর আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদকে সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর দুই মাসের মাথায় গত ৩ মার্চ এই কমিশন পদত্যাগ করে।
দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী কমিশন পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে নতুন কমিশন গঠনের কথা থাকলেও দীর্ঘ চার মাসেও তা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান সরকার নতুন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছে। গত ২ জুলাই এই সার্চ কমিটি যোগ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) আহ্বান করে। গত সোমবার আবেদনের শেষ সময় পর্যন্ত চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদের জন্য ৩২৭ জন আগ্রহী ব্যক্তি আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন।
দুদকের এই দীর্ঘস্থায়ী অচল অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “চার মাস দুদকের কমিশনারহীন অবস্থা দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের উদাসীনতার পরিচায়ক; যা ক্ষমতাসীন দলের সংস্কার এজেন্ডা ও জুলাই অভীষ্টের বিপরীতমুখী এবং বাস্তবে দুর্নীতির সহায়কের ভূমিকা পালন করছে।” বিলম্ব হলেও সার্চ কমিটির মাধ্যমে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত, সৎসাহসী ও যোগ্য ব্যক্তিদের কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে, দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, “কমিশন না থাকলে দুর্নীতিবাজদের সুবিধা বেশি হয়। দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যা তদন্তকে দুর্বল করে এবং আসামিরা এর অনৈতিক সুবিধা পায়।”
মন্তব্য করুন