

মেটিকুলাস ডিজাইনে ঘটানো ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে মৃতদের রক্ত ও আত্মত্যাগকে পুঁজি করে এক শ্রেণীর অসাধু মহলের পরিকল্পিত আইনি জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তে নজিরবিহীন সব অসঙ্গতি ও চরম অসত্য তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে।
পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, অনেক মামলায় কাল্পনিক ও অস্তিত্বহীন ব্যক্তিকে নিহত দাবি করা হয়েছে, আবার কোথাও কাগজে-কলমে ‘মৃত’ দেখানো ব্যক্তি বহাল তবিয়তে সুদূর প্রবাসে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিছু মামলায় দাবি করা জখম বা জুরির কোনো সত্যতা মেলেনি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ঘটনা ঘটার সময়ে শত শত কিলোমিটার দূরে অবস্থান করা সম্পূর্ণ নিরপরাধ ও সাধারণ মানুষকে এসব মামলায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসামি করে হয়রানি করার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।
মৃতের তালিকায় নাম, অথচ যুবক এখন সৌদি আরবে কর্মব্যস্ত
মামলার নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার উলন সড়কে পুলিশের গুলিতে ৪৬ বছর বয়সী মো. বাবু নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন দাবি করে আদালতে একটি হত্যা মামলা করা হয়। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়। ইসমাঈল নামের এক ব্যক্তি নিজেকে নিহতের খালাতো ভাই পরিচয় দিয়ে মামলার নথিতে স্বাক্ষর করেন।
তদন্তের সত্যতা: আদালতে দাখিল করা হাতিরঝিল থানার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে পুলিশ জানায়, এজাহারে দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ধরে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বরুরকান্দি গ্রামে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, ‘নিহত’ বাবু মূলত জীবিত। তার প্রকৃত নাম মো. শাকিল এবং তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত।
এ বিষয়ে প্রবাস থেকে শাকিল সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “আমি বেঁচে থাকতে কীভাবে মারা গেলাম? আমি তো সৌদি আরবে সুস্থ অবস্থায় দিনমজুরের কাজ করছি। পুলিশও এ ব্যাপারে আমার সাথে আগেই কথা বলেছে।”
ভুতুড়ে বাদী: ‘আমি তো মামলাই করিনি’
এই মামলার জালিয়াতি এখানেই শেষ নয়। মামলার কথিত বাদী ইসমাঈলের খোঁজে তদন্তকারী কর্মকর্তা চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রামপুর এলাকায় পৌঁছালে এক নতুন নাটকীয়তা তৈরি হয়। ইসমাঈল প্রকাশ্য জবানবন্দিতে ও পরবর্তীতে আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে জানান যে, তিনি এই ধরনের কোনো মামলাই করেননি। তার নাম ও পরিচয় জালিয়াতি করে কোনো একটি অসাধু চক্র সম্পূর্ণ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এই ভুয়া মামলাটি দায়ের করেছে।
হাতিরঝিল থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাসেল ইসলাম জানান, “তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে এই মামলাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সংযুক্ত মৃত্যুসনদটি পরীক্ষা করে আমরা শতভাগ নিশ্চিত হয়েছি যে সেটি ভুয়া ও জাল। একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র নিজেদের ব্যক্তিগত ফায়দা লুটতে অন্য মানুষের নাগরিক তথ্য ব্যবহার করে এই ঘৃণ্য অপরাধটি ঘটিয়েছে।”
পুরনো কাটা দাগকে গুলির ক্ষত দাবি, নেপথ্যে পারিবারিক দ্বন্দ্ব
অনুরূপ আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে পল্টন থানার একটি মামলায়। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর ইয়াসিন আরাফাত নামের এক যুবক মামলা করেন যে, পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে পারভেজ আলী নামে ২৪ বছরের এক তরুণ নিহত হয়েছেন এবং তিনি নিজেও সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশসহ শীর্ষ নেতাদের আসামি করা হয়।
পাবনার ভুক্তভোগী ট্রাকচালক আব্দুল মতিন এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার চৌদ্দগোষ্ঠী বা বাপের জন্মেও এই বাদী কিংবা তথাকথিত নিহতের নাম শুনিনি ভাই। জমিজমা নিয়ে আমাদের সাথে পাশের বাড়ির কাসেম মুন্সির বিরোধ আছে। তার ক্যামেরাম্যান ভাতিজা রনির সাথে এই বাদীর বন্ধুত্ব। মূলত আমাদের চরম হয়রানি করার জন্যই এই দূরদূরান্তের মামলায় আমাদের নাম ঢুকানো হয়েছে।”
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর সূক্ষ্ম তদন্তে এই মামলার মূল রহস্য উন্মোচিত হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. মাসুদ রানা জানান, এজাহারে উল্লিখিত ‘নিহত’ পারভেজ আলীর কোনো বাস্তব অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া, বাদী ইয়াসিন আরাফাত যে নিজে গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবি করেছিলেন, তার কোনো মেডিকেল প্রমাণ বা সনদ তিনি দেখাতে পারেননি। পিবিআই জানতে পারে যে, অতীতে পড়ে গিয়ে বা অন্য কোনোভাবে তার পায়ে যে সামান্য কাটা দাগ পড়েছিল, সেটাকেই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে গুলির দাগ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। এমনকি তার নিজের বাবাও ছেলের গুলি খাওয়ার বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
তদন্তে আরও বেরিয়ে আসে যে, পাবনার দুই সাধারণ ট্রাকচালক আব্দুল মতিন ও নাজমুল হাসানকে এই মামলায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জড়ানো হয়েছিল। কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) যাচাই করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, ঘটনার দিন ও সময়ে তারা দুর্ঘটনাস্থল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিলেন। মূলত ব্যক্তিগত জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে গ্রামের প্রতিপক্ষের ঢাকা অবস্থানরত বন্ধুদের প্ররোচনায় তাদের এই মামলায় জড়ানো হয়েছিল।
অস্তিত্বহীন বাদী ও ঠিকানা
রাজধানীর আদাবর থানাতেও একই ধরনের জালিয়াতির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আদাবর এলাকায় হামলায় আলী মিয়া নামের এক ব্যক্তি নিহতের ঘটনা দাবি করে মো. তোহা খান নামের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। তদন্তে নেমে পুলিশ পুরো ঘটনার কোনো সত্যতা পায়নি। বাদীর এজাহারে উল্লিখিত মোবাইল নম্বরটি সচল নয় এবং আদাবরের দেওয়া ঠিকানায় ওই নামে কোনো মানুষের বসতি বা অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি পুলিশ। ফলে আদাবর থানা পুলিশ মামলাটিকে সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন হিসেবে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক মামলার সাধারণ পরিসংখ্যান (রাজধানী)
আইনি শূন্যতা: ভুয়া বাদীদের শাস্তি কী?
সাধারণত আমাদের দেশে মিথ্যা মামলার হিড়িক পড়লেও এই মিথ্যা মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নজির অত্যন্ত সীমিত। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় ইতিহাসকে কলঙ্কিত করে যারা এমন ভুয়া মামলা রুজু করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “ফৌজদারি দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী অন্যের ক্ষতিসাধন বা নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা ফৌজদারি মামলা দায়ের করা একটি কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমাদের শুরু থেকেই এই আশঙ্কা ছিল যে একটি গোষ্ঠী জুলাইয়ের এই মহৎ অভ্যুত্থানকে ব্যক্তিস্বার্থ ও শত্রুতা উদ্ধারের হাতিয়ার বানাবে। এখন তদন্তে সেটি প্রমাণিত হচ্ছে। তবে আইন অনুযায়ী প্রতিটি মামলাই স্বতন্ত্র, তাই একটি মিথ্যা মামলা অন্য কোনো সত্য মামলার বিচারে প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু একের পর এক মিথ্যা মামলা বিচারকদের মনস্তত্ত্বে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে যে, সব অভিযোগই হয়তো বানোয়াট।”
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, নিয়মানুযায়ী মিথ্যা মামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রেও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে জুলাইয়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকার কোনো বিশেষ বা ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলে তা পরবর্তীতে জানানো হবে।
মন্তব্য করুন