ঢাকা সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া

দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে বিপুল দেনা, গরমে লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা
প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম
বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া

দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এক ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। নবগঠিত সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এই পরিস্থিতিকে 'দেউলিয়া' আখ্যা দিয়ে বলেছেন, অর্থ সংস্থান করে এই সংকট সামাল দিতে 'ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট' বা সংকট ব্যবস্থাপনার পথে হাঁটতে হবে সরকারকে।

রমজানের পরপরই শুরু হবে সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুম। এ সময় চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে ইতিমধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ধারণা, এ বছর বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্তমানে চাহিদা ১৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।

পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম জানান, শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে এই বকেয়া জমেছে। সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ভর্তুকি দিয়ে খরচ মেটানোর পরও বাড়তে থাকে এই দায়।

বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপপা) তথ্য অনুযায়ী, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে। গত সাত-আট মাস ধরে তারা বিদ্যুতের বিল পায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পিডিবির বকেয়া এক পর্যায়ে তিন মাসে নেমে এলেও ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে আর কোনো বিল পরিশোধ করেনি পিডিবি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান অবশ্য দাবি করেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে বকেয়া রাখার কোনো ইস্যু নেই। টাকার অ্যাভেলেবিলিটির ওপরই বিল পরিশোধ নির্ভর করে।

বেসরকারি কোম্পানিগুলো নিজেরাই অধিকাংশ তেল আমদানি করে। এলসি খুলতে সমস্যার কারণে ইতিমধ্যে তেলের নিট মজুত কমেছে। জানুয়ারিতে এক লাখ টনের বেশি মজুত থাকলেও ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তা আশি হাজার টনে নেমে এসেছে।

বিপপা সতর্ক করে বলেছে, সরকার শিগগিরই বকেয়া পরিশোধ শুরু না করলে গরমে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা কঠিন হবে। বিলের বকেয়া চার-পাঁচ মাসে না কমালে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তেল আমদানি দুরূহ হয়ে পড়বে। এলসি খোলার পর আমদানি করা তেল দেশে আসতে ৪০-৪৫ দিন সময় লাগে, তাই দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে গরমে লোডশেডিং বাড়তে পারে।

বাংলাদেশে মোট সক্ষমতার ৮৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে গ্যাস, কয়লা এবং তেল ব্যবহার হয়। এই জ্বালানির বড় অংশই আমদানি করতে হয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন সতর্ক করে বলেন, 'আমাদের যা লাগবে সব ইমপোর্ট করব নাকি ডলার সেভ করার চেষ্টা করব, এটা সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এখন সরকার কীভাবে খেলবে তার ওপর নির্ভর করবে।'

তার হিসেব অনুযায়ী, ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বছরে ২৫ বিলিয়ন ডলারের মতো প্রয়োজন। 'কিন্তু আমাদের এত টাকা নেই,' বলেন তিনি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, বিদ্যুতের ভর্তুকি এখন প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ৫৫ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে চললেও সেগুলো ৮৫ শতাংশ হারে চালানো সম্ভব। সেক্ষেত্রে কয়লা আমদানি বাড়াতে হবে, কিন্তু ডলার সংকটই প্রধান বাধা।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম পুরো পরিস্থিতির জন্য বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন। তিনি মনে করেন, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েই মূল সমস্যা। তার মতে, তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিলে বছরে ২৮-৩০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।

তবে ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, পুরোপুরি তেলভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধ করে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। পিক টাইমে চাহিদা মেটাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

১০

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

১১

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

১২

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

১৩

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

১৪

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

১৫

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

১৬

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

১৭

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১৮

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১৯

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

২০