

আজ ১৮ মে, আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘বিভক্ত বিশ্বের সেতুবন্ধে জাদুঘর’। বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর যখন এই দিবসটি উদযাপন করছে, ঠিক তখনই প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে সামনে এসেছে এক বড় বিতর্ক। স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলভাবে উপস্থাপন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত গ্যালারি সরিয়ে ফেলা এবং তাঁর ঐতিহাসিক উপস্থিতি সংকুচিত করার অভিযোগ উঠেছে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে আসার পর সাধারণ দর্শনার্থী এবং ইতিহাস অনুরাগী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও মিশ্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে।
দর্শনার্থীদের ক্ষোভ: ‘মুছে ফেলা হচ্ছে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস?’
গতকাল ১৭ মে (রবিবার) শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করতে আসা বেশ কয়েকজন দর্শনার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় এক চরম মিশ্র অভিজ্ঞতা। একদিকে যেখানে জাদুঘরের বিশাল সংগ্রহ দেখে দর্শনার্থীরা মুগ্ধ, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের গ্যালারিতে ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃশ্যমান উপস্থিতি কমে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
যাত্রাবাড়ী থেকে সপরিবারে আসা দর্শনার্থী রায়হান কবীর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু এত বড় একজন মহানায়ক, কিন্তু গ্যালারিতে তাঁর সেই অবদানের যথাযথ উপস্থাপন খুঁজে পাইনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে একটি ছোট ছবি দেখলাম মাত্র। কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, ১৯৬৬-এর ছয় দফা কিংবা ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বের কোনো ছবি বা স্মারক চোখে পড়ল না। এমনকি লাইব্রেরিতেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই কম। মনে হচ্ছে, স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস ধীরে ধীরে মুছে ফেলার একটা প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।”
একই সুর শোনা গেল মিরপুর থেকে আসা শাহনাজ পারভিন মিলা এবং নওগাঁর দর্শনার্থী খাজামাত উদ্দিনের কণ্ঠে। তাঁদের মতে, জাতীয় জাদুঘরের ঐতিহ্যগত দিকগুলো চমৎকার হলেও বঙ্গবন্ধু কর্নার বা গ্যালারি যেভাবে উধাও করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ।
কর্তৃপক্ষের সাফাই: ‘নিদর্শন ধ্বংস করা হয়নি, সাময়িক স্থানান্তর’
দর্শনার্থীদের এমন গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের কিপার ও পাবলিক এডুকেশন বিভাগের প্রধান আসমা ফেরদৌসী স্বীকার করেন যে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ সরানো হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, কোনো নিদর্শন নষ্ট বা ধ্বংস করা হয়নি।
তিনি বলেন “গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় জাদুঘরে হামলা বা ভাঙচুরের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তাই কিছু প্রতিকৃতি ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সাময়িকভাবে সরিয়ে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আমাদের দায়িত্ব এগুলোকে টিকিয়ে রাখা। আজ যা গুরুত্বহীন মনে হতে পারে, ভবিষ্যতে সেটাই আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।”
অন্যদিকে, জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব জানান, ইতিহাসকে একপাক্ষিক নয়, বরং ধারাবাহিক, নিরপেক্ষ ও গবেষণাভিত্তিক উপায়ে উপস্থাপন করতেই এই পরিবর্তন। তিনি বলেন, “শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে যে ভূমিকা রেখেছেন, ইতিহাসে সেই ভূমিকাকে যথাযথ স্থান দেওয়া হবে। তবে ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশে যা ঘটেছে, সেটাও তুলে ধরা জরুরি। ইতিহাস পর্যালোচনায় ৫২, ৭১ এবং ২৪ —সব ইতিহাসই সমভাবে প্রাধান্য পাবে। আমরা চাই কোনো অংশ যেন বাদ না পড়ে।”
মহাপরিচালক আরও জানান, “জাতীয় জাদুঘরের ১৭ সদস্যের পরিচালনা বোর্ডের অধীনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষক, তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদরা কাজ করছেন, যারা ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান পর্যন্ত সমগ্র ইতিহাসকে নতুন রূপরেখায় সাজাচ্ছেন।”
ডিজিটাল রূপান্তর, জায়গার সংকট ও নতুন পরিকল্পনা
মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব জানান, “বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করতে জাদুঘরকে প্রযুক্তিবান্ধব করা হচ্ছে। শুধু দেয়ালে ছবি বা ক্যাপশন নয়, বরং অডিও গাইড, ভিডিও এবং ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে ইতিহাসকে জীবন্ত করার কাজ চলছে। পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ গাইডেড ট্যুর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তবে জাদুঘরের একটি বড় সংকট হলো জায়গার অভাব। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই জাদুঘরে নিবন্ধিত নিদর্শনের সংখ্যা ৯৩ হাজার ২৪৬টি। অথচ চারতলা ভবনের ৪৬টি গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে মাত্র ৪ হাজার ১৭৮টি স্মারক, যা মোট সংগ্রহের মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশ নিদর্শনই স্টোররুমে বন্দি। এই সংকট কাটাতে বর্তমান ভবন সংস্কারের পাশাপাশি একটি ১০ তলাবিশিষ্ট নতুন অ্যানেক্স ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, ২০২৪ সালে মেটিকুলাস ডিজাইনে ঘটানো ‘জুলাই আন্দোলনের’ স্মৃতি ধরে রাখতে আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধনের জোর প্রস্তুতি চলছে। মূল জাতীয় জাদুঘরেও একটি বিশেষ ‘জুলাই কর্নার’ স্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়।
কমছে দর্শনার্থী, আজ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি
জাদুঘরের কর্মচারীদের সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ বছরে প্রায় ৫ লাখ শিক্ষার্থী বিনামূল্যে এটি পরিদর্শন করলেও এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টিকিট কেটে ৩১ হাজার ৪১১ জন দর্শক আসলেও, সাম্প্রতিক ‘জুলাই আন্দোলন’র পর থেকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি কিছুটা কমতির দিকে। মাঠপর্যায়ে গিয়ে নিদর্শন সংগ্রহের কার্যক্রমও আগের মতো সক্রিয় নেই বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান।
মন্তব্য করুন