ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

হত্যা মামলায় রক্তাক্ত সাংবাদিকতা

চতুর্থ স্তম্ভে পরিকল্পিত আঘাত ◼ অর্ধশত মামলায় ২৮২ সাংবাদিক আসামি
কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম
হত্যা মামলায় রক্তাক্ত সাংবাদিকতা

ছোট ছোট মিছিল। কিছু উত্তাল তরুণ মুখ। গলা ছেড়ে স্লোগান—‘তুমি কে, আমি কে/রাজাকার, রাজাকার’; ‘এক দফা, এক দাবি, স্বৈরাচার কবে যাবি’। মিছিলের সামনে-পেছনে ছুটছেন সাংবাদিকরা। কেউ ক্যামেরায় বন্দি করছেন উত্তাল মুহূর্ত, কেউ মোবাইল ফোনে পাঠাচ্ছেন লাইভ আপডেট। রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর নজরদারি, হুমকি, হামলা আর বাধা পেরিয়ে তাঁরাই পৌঁছে দিয়েছেন খবর। কিছু খবর প্রকাশিত হয়েছে, কিছু হারিয়ে গেছে অদৃশ্য সেন্সরের অন্ধকারে। তবু দমে যাননি সাংবাদিকরা।

এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে কর্তৃত্ববাদী সরকারের। পাল্টে যায় রাজনৈতিক পটভূমি। আন্দোলনে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে একের পর এক মামলা হয়। আর সেসব মামলার আসামির তালিকায় উঠে আসে এমন কিছু নাম, যাঁদের হাতে বন্দুক নয়, ছিল কলম, ক্যামেরা, বুম, মাইক্রোফোন। তাঁরা আর কেউ নন—নিবেদিতপ্রাণ তথ্যসেবক সাংবাদিক।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী দেড় বছরের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, যে সাংবাদিক জীবন বাজি রেখে আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করেছেন, তিনিই হয়ে গেছেন আসামি। যে মানুষ রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের সাক্ষ্য বহন করে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁকেই দাঁড় করানো হয়েছে কাঠগড়ায়। ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাসের শিকার হয়ে গেছেন সাংবাদিকরা।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি স্তম্ভ হলো—আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। আর সংবাদমাধ্যম হলো এদের নজরদার, প্রহরী। তাই সংবাদমাধ্যম বা গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে-পরের কিছু বিষয়কে হাতিয়ার বানিয়ে রাষ্ট্রের সেই চতুর্থ স্তম্ভকে পরিকল্পিতভাবে আঘাত করা হয়েছে—এমনটাই মনে করেন আইনবিদসহ বিশিষ্টজনরা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে নজিরবিহীন নিগ্রহের শিকার হন সাংবাদিকরা। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় জর্জরিত করা হয় গোটা সংবাদমাধ্যমকে। হত্যা, হত্যাচেষ্টাসহ ৪৯টি মামলায় আসামি করা হয় দেশের অন্তত ২৮২ জন সাংবাদিককে। এর মধ্যে ১৭৪ জন সাংবাদিক হত্যা মামলা, ১২ জন হত্যাচেষ্টা মামলা, ৩৭ জনকে নাশকতা মামলা মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে; অনেককে আত্মগোপনে, অনেককে আবার কাটাতে হচ্ছে যাযাবরের জীবন।

১৮ মাসের খতিয়ান: নজিরবিহীন নিগ্রহ ও নির্যাতন

ইউনূস জামানার দেড় বছরে সাংবাদিক নিপীড়নের বিষয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তৈরি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৮ মাসে অন্তত ৮১৪ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংগঠনটির প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটেছে।

নির্যাতিত সাংবাদিকদের মধ্যে বেশি ছিলেন সরাসরি হামলার শিকার। এ সময় ৫৮৫ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হন। হত্যা মামলার শিকার হয়েছেন ১৭৪ জন, হত্যাচেষ্টা মামলার শিকার ১২ জন, নাশকতা মামলার শিকার ৩৭ জন এবং সরাসরি হত্যার শিকার হয়েছেন ছয়জন সাংবাদিক।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ওই বছর ৬২২ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হন। এর মধ্যে হামলা করা হয় ৪৫৮ জনকে, হত্যা মামলায় জড়ানো হয় ১৪০ জনকে, নাশকতা মামলার শিকার হন ২১ জন এবং একজন সাংবাদিক নিহত হন।

২০২৪ সালের আগস্ট-ডিসেম্বর সময়ে মোট ১৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হন। এ সময় ৮৫ জন হামলার শিকার হন, ৩১ জন হত্যা মামলা, ১০ জন হত্যাচেষ্টার মামলা এবং ১৬ জন নাশকতা মামলার শিকার হন। একই সময় পাঁচজন সাংবাদিক নিহত হন। চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে এমএসএফ। এর মধ্যে ৪২ জন হামলার শিকার এবং তিনজন হত্যা মামলার শিকার হয়েছেন।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১৭ মাসে অন্তত ৪২৭টি হামলায় ৮৩৪ জন সাংবাদিক নিগ্রহের শিকার হন। এতে ছয়জন নিহত, ৩৭৯ জন আহত, ১০৩ জনকে হুমকি ও ৩৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২১৮ জন সাংবাদিক হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। ১৮জন সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন বলেও তথ্য টিআইবির।

সরকারের আশ্বাস ও প্রতিক্রিয়া

সম্প্রতি সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম জানিয়েছেন, তাঁরা বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ২৮২ জন (যার মধ্যে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ৯৪ জন) সাংবাদিকের তালিকা প্রতিকারের জন্য প্রধান উপদেষ্টার কাছে দিয়ে এসেছেন এবং তিনি সেটা ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন।

সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তথ্য উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বিষয়টি প্রতিকারের জন্য সরকার প্রধান তাঁকে আগেই নির্দেশ দিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন,

“জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো প্রমাণ করা কঠিন হবে। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। কারণ ভুল বা কাল্পনিক আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা চলায় বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে।”

‘স্বৈরাচারের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে হয়রানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আইনে এই নামে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের ধারা নেই এবং এটি মূলত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া হলেও ভবিষ্যতে এমন একটি সময় আসবে যখন তাঁরা তাঁদের ওপর হওয়া এই অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন।

অদ্ভুত যত মামলা ও বাণিজ্যের ফাঁদ

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক মামলাই মূলত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের দাঁড় করানোর এক ধরনের কূটকৌশল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, হত্যার শিকার ব্যক্তির পরিবার মামলা সম্পর্কে জানেই না। তারা চেনে না বাদী কে, আসামি কে।

কুড়িগ্রামের ঘটনা: উলিপুর থানার বুড়াবুড়ী সাতভিটা এলাকার চাঁদ মিয়ার ছেলে আশিকুর রহমান দীর্ঘদিন ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত ছিলেন। আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে জানতে পারেন, ছাত্র পরিচয় দিলেই ফ্রিতে চিকিৎসা মেলে। চাচার কূটকৌশলে বিবাহিত-অছাত্র আশিক হয়ে যান ছাত্র। আন্দোলনের সঙ্গে লেশমাত্র সম্পর্ক নেই, অথচ বনে যান আন্দোলনকারী। বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে মৃত্যুর পর এই আশিক হয়ে যান জুলাই শহীদ। গেজেটেও ওঠে তাঁর নাম, মেলে সরকারি অর্থ সহায়তাও। আর চূড়ান্ত পর্যায়ে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা হয়, যেখানে আসামি করা হয় কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক ফারুক, নিউজ২৪ টেলিভিশনের প্রতিনিধি হুমায়ুন কবির সূর্য এবং এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের প্রতিনিধি ইউসুফ আলমগীরকে। এ মামলার বাদী কুড়িগ্রাম পৌর ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি রুহুল আমিন।

লালমনিরহাটের ঘটনা: সরকার পতনের পর ‘স্বৈরাচারের দোসর নিধন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড নামানো শুরু হয়। পাটগ্রাম উপজেলার কাউয়ামারি বাজারে আনন্দ মিছিল বের হয়। সেই মিছিল থেকে স্থানীয় একটি কলেজের সাইনবোর্ড খুলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায় মাদরাসাছাত্র আজিজুল ইসলাম। ঘটনার প্রায় ১১ মাস পর গত বছরের ৩০ জুন উৎসাহী একজন বাদী হয়ে পাটগ্রাম থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে অন্যদের সঙ্গে আসামি করা হয় দুজন সাংবাদিককেও—দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক আজিজুল হক দুলাল এবং দৈনিক সমকালের উপজেলা সংবাদদাতা মামুন হোসেন সরকার।

রংপুরের ঘটনা: ছাত্রদের আন্দোলন প্রতিহত করতে গিয়ে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট প্রাণ হারান রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা মাহামুদুল হাসান মুন্না। সেই ঘটনাও চোখ এড়ায়নি সুযোগসন্ধানী চক্রের। ওই বছরের ২৯ আগস্ট আদালতে হত্যা মামলা করলে ৫৪ নম্বর আসামি করা হয় লালমনিরহাটের সাংবাদিক হায়দার আলী বাবুকে।

সাহায্যের টোপ দিয়ে সই!

রাজধানীর রামপুরা এলাকায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী মো. রায়হান আকন। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের পিতা মো. কালাম আকন গত বছরের ২৮ মার্চ বাড্ডা থানায় একটি মামলা করেন। মামলার নথি মতে, ওই মামলায় প্রধান আসামি শেখ হাসিনা, আর ২৭ নম্বর আসামি মুজাহিদ প্রিন্স, যিনি ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে বরিশালে সাংবাদিকতা করেন। ঢাকার পল্টনের ঘটনায় আরেকটি হত্যাচেষ্টা মামলাতেও প্রিন্সকে আসামি করা হয়েছে।

পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় বাদী কালাম আকনের সঙ্গে। তিনি বলেন:

“আমি মূর্খ মানুষ। সাহায্য দেওয়ার কথা বলে গ্রামের প্রতিবেশী আইনজীবী মশিউর রহমান কিছু কাগজে আমার সই নেন। পরে জানতে পারি সেটা নাকি মামলার বিষয়। ওই মামলায় পটুয়াখালীসহ সারা দেশের শত শত লোককে আসামি করা হয়েছে। সাংবাদিক, সরকারি চাকরিজীবীসহ নিরীহ লোকজনকে মামলায় আসামি করে সে ফায়দা লুটছে।”

অভিযোগ রয়েছে, মাদারবুনিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু হানিফ ও তাঁর ছেলে অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান এই হত্যাকাণ্ডকে ব্যবহার করে মামলা বাণিজ্য করেছেন। গত বছরের অক্টোবরে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মশিউর ও মামলার বাদী কামালের কথোপকথনের কল রেকর্ড প্রকাশ করা হয়, যেখানে নানা প্রলোভনের প্রমাণ মেলে। পটুয়াখালী জেলা প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি কাইয়ুম জুয়েল বলেন, "রেকর্ডগুলো প্রকাশের পর এদের আসল চেহারা সামনে আসে। ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবু হানিফকে তাঁর পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।"

একুশে টেলিভিশনের সাংবাদিক প্রিন্স বলেন, "আমি পেশাগত দায়িত্ব পালন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই। এভাবে একের পর এক মামলায় আসামি করায় পরিবার নিয়ে মানসিক চাপে আছি।"

মামলা বাণিজ্যের ফাঁদে আরো ৩ সাংবাদিক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় নিহত হন আফতাবনগরের বাসিন্দা আল-আমিন। ঘটনার প্রায় চার মাস পর আদালতে একটি হত্যা মামলা করেন নিহতের চাচা রহমান মাল। বিস্ময়কর তথ্য হলো, ওই একই ঘটনায় আরেকটি মামলা হয় রাজধানীর হাতিরঝিল থানায়। আর সেই মামলার ৮৪ নম্বর আসামি করা হয় বরিশালের তিন সাংবাদিককে। এই মামলাটির বাদী মো. মোজাহারুলকে চেনেই না নিহতের পরিবার।

এই মামলার আসামি তিন সাংবাদিক হলেন বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন, বণিক বার্তার বরিশাল প্রতিনিধি এম মিরাজ হোসাইন ও স্থানীয় দেশ জনপদ পত্রিকার সম্পাদক তৌহিদুল মাজিদ মীর্জা রিমন।

ছাত্রলীগ থেকে জুলাইযোদ্ধা, পরে হত্যা মামলা

সিরাজগঞ্জে ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের সহিংস ঘটনায় আসিফ ও শাহীন নামে দুই তরুণ নিহতের ঘটনায় একটি মামলা হয়। মামলায় অন্যদের সঙ্গে আসামি করা হয় বিডিনিউজ ও কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি ইজরাইল হাসান বাবু এবং বৈশাখী টিভির জেলা প্রতিনিধি সুজিত সরকার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, যে দুজনের হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে তাঁরা মূলত ছাত্রলীগকর্মী ছিলেন এবং ৪ আগস্ট বিক্ষুব্ধ জনতা স্থানীয় এমপির বাসভবনে আগুন দিলে সেখানে তাঁরা অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। অথচ প্রায় তিন মাস পর তাঁদের ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী’ দাবি করে সাংবাদিকদের ফাঁসিানোর উদ্দেশ্যে হত্যা মামলা করা হয়।

ওসির কেরামতির বাদী

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনে জয়পুরহাটে মারা যান শিক্ষার্থী নজিবুল সরকার বিশাল। ১৮ আগস্ট তাঁর বাবা মজিদুল সরকার মালেক বাদী হয়ে মামলা করলে ১২২ নম্বর আসামি করা হয় সাংবাদিক আলমগীর চৌধুরীকে।

যোগাযোগ করা হলে বাদী মজিদুল সরকার বলেন, "আমি কোনো সাংবাদিকের নামে মামলা দিইনি। অনেক আসামিকে আমি চিনিও না। আমার ছেলে হত্যার শাস্তি কোনো নির্দোষ মানুষ পাক, সেটা আমি চাই না।"

একই ঘটনায় হওয়া নাশকতার মামলার বাদী করা হয় আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়া নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার রাকিব হোসেনকে। রাকিব বলেন, "থানার তৎকালীন ওসি হাসপাতালে এসে একটি কাগজে আমার সই নিয়েছেন। পরে শুনি সাংবাদিকসহ ১১৯ জনের নামে আমাকে বাদী করে নাশকতার মামলা করা হয়েছে। অথচ আমি আসামি বা সাক্ষী কাউকেই চিনি না।"

সাংবাদিক খুনের বেলায় উল্টো চিত্র

অদ্ভুত সব মামলায় সাংবাদিকদের ফাঁসিয়ে দিলেও সাংবাদিক খুনের বেলায় দেখা গেছে উল্টো চিত্র। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় প্রহারে নিহত হলেও সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিকের (৫৫) নাম জুলাই-শহীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রায়গঞ্জ প্রেস ক্লাবে হামলা চালিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আওয়ামী লীগের পাঁচ নেতাকর্মীসহ সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিককে হত্যা করা হয়। নিহত সাংবাদিকের ছেলে সুজন কুমার ভৌমিক বলেন, "আমার বাবা কখনোই আওয়ামী লীগ করেননি। বাবা মারা যাওয়ার পর জুলাই শহীদের মর্যাদা পেতে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কয়েক দফা আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ছাত্র সমন্বয়কদের বিরোধিতার কারণে তা হয়নি।"

কারাবাস ও আত্মগোপনের জীবন

জুলাই-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য সাংবাদিকের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গোপালগঞ্জে সংঘর্ষের ঘটনায় কালের কণ্ঠের কোটালীপাড়া প্রতিনিধি মিজানুর রহমান বুলুসহ চারজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ কারাবাসের পর তারা জামিনে মুক্তি পান।

অন্যদিকে বগুড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি জে এম রউফ ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের একটি হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পর প্রায় দুই বছর ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন। সিরাজগঞ্জে বিএসএসের জেলা প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম ফিলিপসও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সাড়ে তিন মাস কারাগারে ছিলেন। জামিন পেলেও তিনি চাকরি হারান।

সংবাদপত্র মালিক সমিতির সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন,

“আমরা সরকারের কাছে ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা দিয়েছি। হয়রানিমূলক মামলাগুলো থেকে পরিত্রাণের বিষয়ে কথা হয়েছে। সরকার প্রধান মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং বলেছেন, এই মামলাগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গেছে। হত্যা মামলাগুলো রিভিউ করা হবে এবং হয়রানিমূলক মামলাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হবে।”

(কালের কণ্ঠ অনুসন্ধানী সেলের সৌজন্যে)

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাপানের জমাট রক্ষণ চূর্ণ করে ব্রাজিলের উল্লাস

৭ শিল্প অঞ্চলে ৪৫৭ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ, বিপাকে তৈরি পোশাক খাত

বোবা কান্নার মেঘনা ও আমাদের মরে যাওয়া মনুষ্যত্ব

একের পর এক ‘মিথ্যা’ মামলা, আদালতে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন মিষ্টি সুবাস

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি সহায়তা চাইল জাতিসংঘ

তিন মেয়েসহ মাকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে ঘাতক নিহত

ভেনেজুয়েলায় ১২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প

২৩ জুন ১৯৭১: আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তোলপাড় এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের উত্তাল দিন

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ

২২ জুন ১৯৭১: নিষেধাজ্ঞা ভেঙে পাকিস্তানে মার্কিন সমরাস্ত্রের চালান

১০

ইরানের ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্থবির

১১

চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক এমপিপুত্র সজীব মুচলেকা দিয়ে মুক্ত

১২

তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক ড্রাগস

১৩

২১ জুন ১৯৭১: রণাঙ্গনে প্রতিরোধ যুদ্ধ, যুক্তরাজ্য ও ভারতের যৌথ বিবৃতি

১৪

১৮ জুন ১৯৭১: ঢাকায় দুঃসাহসিক গেরিলা আক্রমণ, কান্দাপাড়া গণহত্যা এবং রণাঙ্গনের প্রতিরোধ

১৫

বাবা নাকি ৭১-এর শহীদ, অথচ জামায়াত এমপির জন্ম ১৯৮১ সালে

১৬

আলজেরিয়াকে উড়িয়ে আর্জেন্টিনার শুভ সূচনা

১৭

১৭ জুন ১৯৭১: জগদীশপুর গণহত্যা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক যুদ্ধ এবং প্রতিরোধ

১৮

১১ জুন ১৯৭১: বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পক্ষে সংহতি

১৯

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন

২০