

১৯৭১ সালের রক্তঝরা দিনগুলোতে যখন হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের বুকে গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন সুদূর ইউরোপের মাটিতে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস রচিত হচ্ছিল। ফরাসি নৌঘাঁটি থেকে পালিয়ে ইউরোপের চার দেশ ঘুরে বুক ভরা দেশপ্রেম নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন আটজন অকুতোভয় বাঙালি নৌসেনা। নিশ্চিত সামরিক ক্যারিয়ার, পদমর্যাদা আর জীবনের মায়া ত্যাগ করে তাঁদের এই দুঃসাহসিক আত্মত্যাগই পরবর্তীকালে জন্ম দিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সামরিক সাফল্য—‘অপারেশন জ্যাকপট’।
সামরিক ঘাটিতে যুদ্ধের খবর ও বাঙালি সেনার সংকট
১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তান নৌবাহিনী ফ্রান্সের কাছ থেকে ‘পিএনএস মানগ্রো (S-133)’ নামের একটি আধুনিক সাবমেরিন কেনে। ১৯৭১ সালের মার্চে ফরাসি বন্দর ‘তুঁল’-এ মানগ্রো সাবমেরিনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন ৫৭ জন নৌসেনা, যাঁদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি। পরিকল্পনা ছিল ১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল প্রশিক্ষণ শেষে নিজেরা সাবমেরিন চালিয়ে পাকিস্তানে ফিরবেন।
তবে ২৫ মার্চের নারকীয় গণহত্যা ও স্বাধীনতার ঘোষণার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মারফত পৌঁছে যায় তুঁল নৌঘাঁটিতে। চার সহকর্মীর পরিবার পশ্চিম পাকিস্তানে থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা দলত্যাগে অংশ নিতে পারেননি, কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষার শপথ নেন। বাকি ৯ জন সিদ্ধান্ত নেন দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করার।
সাবমেরিন বিস্ফোরণের পরিকল্পনা বাতিল
প্রথমে ৯ বাঙালি সদস্য সাবমেরিনটি উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ফরাসি মাটিতে কোনো সামরিক সাবমেরিন বিস্ফোরণে আন্তর্জাতিক জনমত বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের বিপক্ষে চলে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। তাছাড়া বিশাল পরিমাণ বিস্ফোরক জোগাড় করা অসম্ভব ছিল এবং বিস্ফোরণে তাঁদের বাঁচার কোনো সুযোগ থাকত না। তাই অহেতুক প্রাণ বিসর্জন না দিয়ে ভারতের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফ্রান্স থেকে ঐতিহাসিক পলায়ন ও পদমর্যাদার বিসর্জন
২৯ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে অত্যন্ত গোপনে নিজেদের পাসপোর্ট লকার থেকে বের করে নেন তাঁরা। ৩১ মার্চ ছুটির সুযোগে কেনাকাটার অজুহাতে নৌঘাঁটি ছাড়েন তাঁরা। যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণে থাকা বন্ধুভাবাপন্ন দক্ষিণ আফ্রিকান নৌসেনাদের সহায়তায় তাঁদের ব্যাগ পৌঁছে দেওয়া হয় ১০০ কিলোমিটার দূরের মার্সেই শহরের ট্রেন স্টেশনে।
মার্সেই স্টেশন থেকে সুইজারল্যান্ডগামী ট্রেনে চড়ার পর এই বীর সন্তানেরা নিজেদের সামরিক পোশাকের পদমর্যাদাসূচক প্রতীক বা ব্যাজ ট্রেনের জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেন। চিফ পেটি অফিসার গাজী মো. রহমত উল্লাহর নেতৃত্বে থাকা দলের অন্য সদস্যরা হলেন— সৈয়দ মো. মোশাররফ হোসেন, আমানউল্লাহ শেখ, বদিউল আলম, আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ আহসানউল্লাহ, আবদুর রকিব মিয়া ও আবেদুর রহমান। অন্য সদস্য আবদুল মান্নান নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হতে না পারায় তাঁকে ছাড়াই ছাড়তে হয় ট্রেন।
ইউরোপজুড়ে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা রোমাঞ্চ
জেনেক্স সীমান্তে প্রবেশ করতে গিয়ে ভিসা না থাকায় আটকে যান তাঁরা। ধরা পড়ার আশঙ্কায় আবার ফ্রান্সে ফিরে এসে প্যারিস হয়ে লিয়ঁ শহরে নামেন। এর মধ্যে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ খবর ছড়িয়ে দিলে পুরো ইউরোপজুড়ে ফরাসি, সুইজারল্যান্ড ও অন্যান্য দেশের গোয়েন্দা সংস্থা তাঁদের খোঁজে তল্লাশি শুরু করে। তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক আদালত অবর্তমানেই রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে এই আটজনের মৃত্যুদণ্ড প্রদান ও বড় অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করে।
লিয়ঁ শহরের একটি সস্তা হোটেলে আত্মগোপন করে থাকা অবস্থায় গাজী মো. রহমত উল্লাহ জানতে পারেন, স্পেন সরকার পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য বিনা ভিসায় প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা ৩১ মার্চ সীমান্ত পেরিয়ে স্পেনের ‘পোর্টাবো’ স্টেশনে পৌঁছান এবং সেখান থেকে বার্সেলোনা হয়ে মাদ্রিদের ভারতীয় দূতাবাসে পৌঁছান।
মাদ্রিদ, রোম ও জেনেভা অতিক্রম করে বোম্বে অবতরণ
মাদ্রিদে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। ভারত সরকার ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় সকল দূতাবাসকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল বাঙালি নৌসেনারা এলে জরুরি ভিত্তিতে যেন রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়। তাঁদের পাকিস্তানি পাসপোর্ট জমা নিয়ে ইস্যু করা হয় ভারতীয় জরুরি পাসপোর্ট।
তাঁদের রোমগামী বিমানে তুলে দিয়ে মাদ্রিদে ভারতীয় দূতাবাস সংবাদ সম্মেলন করতেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়। রোম বিমানবন্দরে বিমান নামতেই পাকিস্তানি কূটনীতিকেরা বাধা সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে ভিআইপি ব্যবস্থায় সুইস এয়ারলাইন্সে জেনেভা নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও কূটনৈতিক টানাটানির পর, ভারতীয় কর্মকর্তাদের পাহারায় ১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল সব বাধা অতিক্রম করে মুম্বাই (বোম্বে) বিমানবন্দরে অবতরণ করে সেই স্বপ্নের বিমান।
পরবর্তী ইতিহাস: অপারেশন জ্যাকপট ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
মুম্বাই পৌঁছানোর পর ভারত সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় তাঁদের কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয় প্রায় সাড়ে পাঁচশত নৌ-কমান্ডোর চৌকস দল। এই ৮ অকুতোভয় সেনাই ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্টের ঐতিহাসিক 'অপারেশন জ্যাকপট'-এ সরাসরি নেতৃত্ব দেন, যেখানে চট্টগ্রাম, মংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরে একযোগে হামলা চালিয়ে শত্রুর অগুণতি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে বিশ্বকে চমকে দেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধে এই সাহসী যাত্রার অন্যতম যোদ্ধা টাঙ্গাইলের আবদুর রকিব মিয়া বীর বিক্রম যুদ্ধেই শহীদ হন। স্বাধীনতার পর বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বদিউল আলম ও আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীকে ‘বীর উত্তম’, আমানউল্লাহ শেখ, আবেদুর রহমান ও শহীদ আবদুর রকিব মিয়াকে ‘বীর বিক্রম’ এবং গাজী মো. রহমত উল্লাহ ও মোহাম্মদ আহসানউল্লাহকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। ইউরোপের সুদূর তট থেকে পালিয়ে আসার এই দুঃসাহসী ইতিহাস আজীবন আমাদের জাতীয় ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
মন্তব্য করুন