

গ্যাস ও কয়লা সংকটে দেশজুড়ে চরম বিদ্যুৎবিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সরবরাহ ঘাটতির কারণে দেশজুড়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। অন্যদিকে চালু থাকা কেন্দ্রগুলো জ্বালানি অভাবে সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে দেশজুড়ে লোডশেডিং মারাত্মক রূপ নিয়েছে। গ্রামে দিন-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, আবার শহরাঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলেও উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গড় লোডশেডিং প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াটে পৌছেছে। গত রোববার রাত ১টায় সর্বোচ্চ ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়, যা এর আগের রেকর্ড ৩,৬৭১ মেগাওয়াটকে ছাপিয়ে যায়। তীব্র গরমের সঙ্গে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষের জনজীবন, বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ও রোগীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে।
মূল কারণ গ্যাসের তীব্র ঘাটতি
বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস গ্যাসের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেও নিচে নেমে এসেছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন ২৫২ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট। এর পেছনে মূল কারণ ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এতে করে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। টার্মিনালটির মেরামতের কাজ চলায় চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ পুরো সক্ষমতায় ফিরলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
কয়লা ও আমদানি বিদ্যুতেও টান
সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন হ্রাস। সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কুতুবদিয়ায় কয়লা খালাসে বিলম্ব হওয়ায় ১,২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। পাশাপাশি ঝাড়খণ্ডে বন্যার কারণে কয়লা ভিজে যাওয়ায় ভারতের আদানি পাওয়ার থেকেও সরবরাহ ১,৪০০ মেগাওয়াট থেকে কমে ৮০০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে। বড়পুকুরিয়ার তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ রয়েছে।
জনভোগান্তি ও শিল্পখাতে দ্বিমুখী চাপ
লোডশেডিংয়ের তীব্রতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে। সিলেটে চাহিদা ও সরবরাহের বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয়রা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। অন্যদিকে শিল্প কারখানায় গ্যাস সংকটের সাথে বিদ্যুৎ ঘাটতি যোগ হয়ে দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের জ্বালানি ও উৎপাদন খরচ হু হু করে বাড়ছে।
উত্তরণের চেষ্টা ও বিশেষজ্ঞ মত
পরিস্থিতি সামলাতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা হলেও তা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় টেকসই সমাধান হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম আশা প্রকাশ করেছেন, এক-দুই দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকটটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, আমদানিনির্ভর এলএনজি ও কয়লার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ফল। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম জানান, এই সংকট থেকে রাতারাতি উত্তরণ সম্ভব নয়। দ্রুত সাময়িক স্বস্তির জন্য এলএনজি আমদানির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মন্তব্য করুন