

ওষুধের ওপর কর থাকা উচিত কি না— এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর। একদিকে সরকার ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় দিচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল, কারণ চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ খাতে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমান কর কাঠামো
বাংলাদেশে সাধারণ পণ্যের ওপর ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ হলেও স্থানীয় পর্যায়ে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে এই হার নামিয়ে ২.৪ শতাংশ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ওষুধ পুরোপুরি কর-মুক্ত নয়, বরং হ্রাসকৃত হারে করের আওতায় রয়েছে। নতুন অর্থ আইন ২০২৬-এর আওতায় ওষুধশিল্পসহ বেশ কয়েকটি খাতে শুল্ক ছাড়ের ব্যাপক পরিসর যুক্ত হয়েছে, আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ওষুধের কাঁচামালসহ বেশ কিছু স্বাস্থ্যখাত-সংশ্লিষ্ট উপকরণে ভ্যাট ও আমদানি-পর্যায়ের কর আরও কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত সরঞ্জামের ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে, যা কার্যকর হলে প্রতিটি ডায়ালাইসিস সেশনের খরচ প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাত্রায় কিডনি রোগে আক্রান্ত বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ বা বিএপিআই সক্রিয় ওষুধ উপাদান বা এপিআই-এর কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-ভ্যাট অব্যাহতিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে, কারণ দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ এপিআই এখনও আমদানিনির্ভর। সংগঠনটির মতে, এই ছাড় ক্যানসারের মতো উচ্চ ব্যয়ের ওষুধের বাজারজাতকরণেও সহায়ক হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অবস্থান কী
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২০ সালের ওষুধমূল্য নীতি নির্দেশিকায় মোট দশটি নীতি-বিকল্পের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে কর অব্যাহতি একটি। তবে এটি কোনো জোরালো সুপারিশ নয়, বরং সংস্থাটি কেবল দেশগুলোকে অত্যাবশ্যক ওষুধ ও সক্রিয় ওষুধ উপাদানকে কর থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পরামর্শ দিয়েছে, কারণ এই বিষয়ে সরাসরি প্রমাণভিত্তিক গবেষণা এখনও সীমিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও হেলথ অ্যাকশন ইন্টারন্যাশনালের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রেসক্রিপশন ওষুধের ওপর ২৫ শতাংশ কর বাড়ানো বা কমানো হলে চাহিদায় ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পরিবর্তন হতে পারে, আর এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে দরিদ্র পরিবার, শিশু ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের ওপর। একই নির্দেশিকায় সরবরাহ শৃঙ্খলে মুনাফার হার বা মার্কআপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও সতর্কতার সঙ্গে সুপারিশ করা হয়েছে যে, মার্কআপ হার মূল্যের সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকা উচিত, যাতে সস্তা ওষুধের ওপর আনুপাতিক হারে বেশি বোঝা না পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক পর্যালোচনায় বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়াকে সেসব দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে, যারা কর অব্যাহতিকে মূল্য নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে না বলে জানানো হয়েছে।
কর নয়, আসল সমস্যা মুনাফার হার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধের দাম বাড়ার পেছনে করের চেয়ে বড় ভূমিকা রাখে সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হওয়া মুনাফার হার বা মার্কআপ। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইএসপিওআরের ৩৫টি দেশের ওপর চালানো এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২০ সালে মোট ৩৮.৫ বিলিয়ন ডলার ওষুধ ব্যয়ের মধ্যে মার্কআপের অবদান ছিল ২২.৩ শতাংশ বা ৮.৬ বিলিয়ন ডলার, আর করের অবদান ছিল মাত্র ৬.২ শতাংশ বা ২.৪ বিলিয়ন ডলার। গবেষণায় বলা হয়েছে, গড় মার্কআপ হার সব দেশে প্রয়োগ করা গেলে রোগী ও স্বাস্থ্যবিমা প্রদানকারীদের প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হতো, অর্থাৎ করের চেয়ে বেশি। বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও হেলথ অ্যাকশন ইন্টারন্যাশনালের পর্যালোচনা আরও বলছে, মোট রাজস্বে ওষুধ থেকে আসা করের অংশ সাধারণত ০.২৭ থেকে ১.৬৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, ফলে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করলেও সরকারি আয়ের ওপর সামগ্রিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিতই থেকে যাওয়ার কথা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নেও সতর্ক করে বলা হয়েছে, শুধু মার্কআপ নিয়ন্ত্রণ করলেই দাম কমবে না, যদি না উৎপাদক বা খুচরা বিক্রয়মূল্যও একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অর্থাৎ কর মওকুফ একা কোনো জাদুকরি সমাধান নয়, বরং সামগ্রিক মূল্যনীতির একটি অংশমাত্র।
এলডিসি উত্তরণ: বড় ধাক্কা আসছে আরও
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বিতর্ক আরও জটিল হয়ে উঠছে চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের কারণে। এই উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তির অধীনে পাওয়া ওষুধ পেটেন্ট ছাড় হারাবে, যে সুবিধার কারণে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন লাইসেন্স ছাড়াই পেটেন্টকৃত ওষুধ তৈরি করতে পেরেছে। বিশ্লেষকদের হিসাবে, দেশের মোট ওষুধ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ পেটেন্টকৃত, যা উত্তরণের পর লাইসেন্স ফি বা বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিংয়ের আওতায় আসবে, ফলে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং তা স্থানীয় বাজারেও ওষুধের দামে প্রতিফলিত হতে পারে। রপ্তানির দিক থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৬৬টি দেশে ২১৩.১৬ মিলিয়ন ডলারের ওষুধ রপ্তানি করেছে, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি, এবং এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে ট্রিপস ছাড়ের সুবাদে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা থেকে। এই খাতকে রক্ষা করতেই সরকার জাতিসংঘের কাছে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সালে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে শিল্প বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হওয়ার বাড়তি সময় পায়।
ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধের ওপর থেকে কর পুরোপুরি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত একক কোনো সমাধান নয়। রাজস্ব ঘাটতি সাধারণত সামান্য হলেও, মার্কআপ নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য স্বচ্ছতার মতো নীতি একসঙ্গে না নিলে করছাড়ের সুফল রোগীর পকেট পর্যন্ত নাও পৌঁছাতে পারে, বরং মাঝপথে পরিবেশক বা খুচরা বিক্রেতার বাড়তি মুনাফা হিসেবে থেকে যেতে পারে। আবার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাঁচামালে করছাড় দিয়ে শিল্পকে যতটা স্বস্তি দেওয়া হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে এলডিসি উত্তরণজনিত পেটেন্ট ব্যয়ের আকারে। ফলে কেবল করের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা না করে, সামগ্রিক মূল্যনীতি, মুনাফা-নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যনীতির সমন্বয়ই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র
মন্তব্য করুন