

আজ ১৭ আগস্ট, ২০২৬। ২০০৫ সালের এই দিনে জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) নামের নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের বাস্তবায়নে ঘটে যাওয়া দেশব্যাপী সমন্বিত সিরিজ বোমা হামলার ২১ বছর পূর্ণ হলো। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সকাল ১১টা থেকে মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের ৬৪টির মধ্যে ৬৩টি জেলার ৩০০টি স্থানে প্রায় ৫০০টি ছোট আকারের বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। নজিরবিহীন এই জঙ্গি হামলায় দুই জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন।
২০০৫ সালের হামলার চিত্র
হামলাকারীরা রাজধানী ঢাকার জাতীয় সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ঢাকা শেরাটন হোটেল ও জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ (বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতর, আদালত চত্বর ও জেলা প্রশাসন কার্যালয়গুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। বিস্ফোরণে সাভারে এক শিশু এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক রিকশাচালক নিহত হন এবং অন্তত ১০৪ থেকে ১১৫ জন আহত হন।
ঘটনাস্থলগুলো থেকে উদ্ধারকৃত মুদ্রিত লিফলেটে দেশে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তুলে দিয়ে ইসলামী আইন বা শরিয়াহ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশে জেএমবির সুসংগঠিত সাংগঠনিক উপস্থিতির জানান দেওয়া।
সংগঠনের গঠন ও ইতিহাস
১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জেএমবির মূল নেতৃত্বে ছিলেন শায়খ আব্দুর রহমান এবং সিদ্দিকুল ইসলাম (বাংলা ভাই)। এই সমন্বিত হামলায় তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি)। ২০০৫ সালের আগস্টের এই হামলার পূর্বে সংগঠনটি এবং তাদের সহযোগী সংগঠন ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ’ (জেএমজেবি) সিনেমা হল, সার্কাস, এনজিও, কমিউনিস্ট দল এবং তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর অন্তত আটটি হামলা চালিয়েছিল।
আল-কায়েদা ও তালেবানের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত এই সংগঠনটির লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চল নিয়ে একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশে প্রথম আত্মঘাতী হামলার সূচনাও করে এই সংগঠনটি।
অভিযান ও বিচারিক প্রক্রিয়া
২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জোট সরকারের সময় এই জঙ্গি নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব অস্বীকারের নীতি পরিলক্ষিত হয়। আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া চাপে ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেএমবিকে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৭ আগস্টের হামলার পর র্যাব ও পুলিশের ব্যাপক অভিযানে ২০০৬ সালের মার্চে শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাই গ্রেফতার হন। ২০০৫ সালের নভেম্বরে ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলায় তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ তা কার্যকর করা হয়।
হামলার ঘটনায় দায়ের করা প্রায় ২৭৩টি মামলার মধ্যে ২০০টিরও বেশি মামলা ২০১৩ সালের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়। বিভিন্ন আদালতে ৫৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৫০ জনকে যাবজ্জীবন এবং ৩০০ জনেরও বেশি সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও উচ্চ আদালতে আপিল ঝুলে থাকায় দুই দশক পরেও চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হয়নি। এছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে কোনো সুনির্দিষ্ট জঙ্গিমুক্তকরণ কর্মসূচি না থাকায় সংগঠনটি পুনর্গঠনের সুযোগ পায়।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও রূপান্তর
অভিযানের মুখে জেএমবির অনেক সদস্য আত্মগোপনে চলে যায় এবং সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ‘স্লিপার সেল’ গঠন করে। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আইএস-এর উত্থান ঘটলে জেএমবির একটি অংশ ‘আইএস বেঙ্গল’ বা ‘নব্য জেএমবি’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। এই অংশটি ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকার হোলি আর্টিসান বেকারিতে হামলা চালায়।
এছাড়া ২০১৮ সালে ভারতে ‘জামায়াতুল মুজাহিদীন ইন্ডিয়া’ (জেএমআই) গঠিত হয়, যারা ২০১৪ সালের বর্ধমান বিস্ফোরণ এবং ২০১৮ সালের বুদ্ধগয়া বোমাহামলায় জড়িত ছিল। পরবর্তীতে ২০১৭-২০১৯ সালে গঠিত ‘জামা’য়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ নামের নতুন জঙ্গি সংগঠনেও জেএমবির সাবেক সদস্যরা যুক্ত হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগে জঙ্গি সংগঠনগুলো নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সাজা শেষ হওয়া এবং ২০২৪ সালের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালানো জেএমবির একাধিক অভিজ্ঞ ও চরমপন্থী সদস্য বর্তমানে বাইরে অবস্থান করছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই চরমপন্থী সদস্যরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার চেষ্টা করতে পারে। ২১ বছর পর এসে কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান দিয়ে নয়, বরং রাজনীতিমুক্ত আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এই জঙ্গিবাদ মোকাবিলার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
মন্তব্য করুন