

১৯৭১ সালের ৯ মে ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের এক সংকটময় ও রক্তক্ষয়ী দিন। একদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে জাতিসংঘের মন্থরতায় জনমনে ক্ষোভ ঘনীভূত হচ্ছিল, অন্যদিকে পাকিস্তানি বাহিনী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষের ওপর বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছিল।
আন্তর্জাতিক অঙ্গন: জাতিসংঘের মন্থরতা ও প্রতিবাদ
ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের হাহাকার বিশ্ববিবেকে নাড়া দিলেও জাতিসংঘের পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত ধীর।
জাতিসংঘের মিশন: শরণার্থী বিষয়ক উপ-হাইকমিশনার চার্লস মেস এদিন ভারতে জানান, বাংলাদেশে অসহনীয় পরিস্থিতির কারণে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছে। তবে এই মিশন পাঠাতে মহাসচিব উ থান্ট দীর্ঘ ১০ দিন দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন বলে মিশনের প্রতিনিধিরা স্বীকার করেন।
নিউইয়র্কে বিক্ষোভ: জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে এদিন শতাধিক মানুষ বিক্ষোভ করেন। সেখানে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগকারী বাঙালি কূটনীতিক এ এইচ মাহমুদ আলী সংহতি প্রকাশ করেন।
বিলেতে তৎপরতা: ব্রিটেনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ব্রাডফোর্ড ও বার্মিংহামে সভায় বক্তব্য দিয়ে বিশ্বজনমত গঠনে কাজ করেন।
ভারতের অবস্থান: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরী ও রঘুনাথ কেশব খাদিলকার শরণার্থীদের সহায়তায় বড় শক্তিগুলো এবং জাতিসংঘের ওপর নৈতিক চাপ সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তান্ডব ও নৃশংসতা
৯ মে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর পৈশাচিক হামলা চালায়:
গজারিয়া গণহত্যা: মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার গোশাইরচর, নয়ানগরসহ পাঁচটি গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ৩৬০ জন নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। গ্রামগুলোতে অগ্নিসংযোগ করে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়।
নবাবগঞ্জ ও নাটোর: ঢাকার নবাবগঞ্জের বর্ধনপাড়া ও কলাকোপায় ২০ জন এবং নাটোরের কলম ও হাতিয়ান্দহে আরও ২০ জন গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
সামরিক তৎপরতা: লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজি সিলেট সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। অন্যদিকে, পঞ্চগড়ের অমরখানায় পাকিস্তানি বাহিনী দুর্ভেদ্য বাংকার ও পিলবক্স তৈরি করে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ঘাঁটি গড়ে তোলে।
মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা
শত প্রতিকূলতার মাঝেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করেন:
কুমিল্লা: কটকবাজার ও বগাদিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে।
কক্সবাজার: এখানে দিনব্যাপী তুমুল যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি আক্রমণ সফলভাবে প্রতিহত করেন।
কোটালীপাড়া: বীর বিক্রম হেমায়েত উদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিবর্ষণে আতঙ্কিত হয়ে পাকিস্তানি সেনা ও পুলিশ পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
নওগাঁ: পত্নীতলার হরতকীডাঙ্গায় সম্মুখ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর গতিরোধ করেন এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করেন।
১৯৭১ সালের ৯ মে’র ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম কেবল সশস্ত্র যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল বিশ্ববিবেকের বিরুদ্ধে এক নৈতিক লড়াই। একদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর পোড়ামাটি নীতি আর অন্যদিকে প্রবাসী সরকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের ইস্পাতকঠিন মনোবল যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করে দিচ্ছিল।
তথ্যসূত্র
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস (সেক্টর ২ ও ৭)
মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালি: যুক্তরাজ্য – আবদুল মতিন (সাহিত্য প্রকাশ)
দৈনিক পূর্বদেশ, ১০ মে ১৯৭১
আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ১০ মে ১৯৭১
একাত্তরের দিনপঞ্জি ও নথিপত্র।
মন্তব্য করুন