ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১ মে ১৯৭১: ইতিহাসের আয়নায় রক্তঝরা দিন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
০১ মে ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম
০১ মে ২০২৬, ১১:২১ পিএম
১ মে ১৯৭১: ইতিহাসের আয়নায় রক্তঝরা দিন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

১৯৭১ সালের ১ মে ছিল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। একদিকে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পূর্ব বাংলায় তাদের পোড়ামাটি নীতি ও নৃশংসতা জারি রেখেছিল, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত ও রাজনৈতিক সমর্থন প্রবল হতে শুরু করে। ভারতের কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রীর ঐতিহাসিক ঘোষণা থেকে শুরু করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের চাপ—সব মিলিয়ে এদিনটি ছিল এক চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ।

এই দিনে ভারতের শিল্পমন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরী ত্রিপুরার আগরতলার শরণার্থী শিবির পরিদর্শনকালে এক ঐতিহাসিক মন্তব্য করে বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন একটি চিরন্তন সত্য ও বাস্তবতা’। তিনি আরও বলেন, এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই এবং বাঙালী শেষ পর্যন্ত জয়ী হবেই। বিশ্ববাসীর উচিৎ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন করা।

একই দিনে ব্রিটিশ বিরোধীদলীয় নেতা হ্যারল্ড উইলসনের অন্যতম পার্লামেন্টারি প্রাইভেট সেক্রেটারি ফ্র্যাঙ্ক জাড পাকিস্তানকে সাহায্যদান অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আলেক ডগলাস-হিউমের কাছে একটি চিঠি প্রদান করেন।

পশ্চিমবঙ্গ সফর শেষে লন্ডনে ফিরে এসে ব্রিটিশ এমপি ব্রুস ডগলাসম্যান দ্য সানডে টেলিগ্রাফ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে শরণার্থীদের ভয়াবহ অবস্থা বর্ণনা করেন। তিনি মুক্তাঞ্চলে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের কথাও উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় সত্তার অবস্থান

সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা ‘প্রাভদা’ এদিন পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয়, ধর্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। পত্রিকার সম্পাদকীয়তে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদক্ষেপকে নিন্দাজনক আখ্যা দিয়ে সতর্ক করে বলা হয়, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যদি নিজেদের এমন অনড় সিদ্ধান্তে অটল থাকে, তবে তা কেবল পূর্ব পাকিস্তানের জন্যই না, ভারত, এশিয়া, সর্বোপরি বিশ্বের জন্য ভীষণ বিপজ্জনক।

ওদিকে, মার্কিন সিনেটর জে ডব্লিউ ফুলব্রাইট কঠোর ভাষায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতার সমালোচনা করে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে বিশ্ববাসীর নীরব থাকা মানে পাকিস্তানি বর্বরতাকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করা। তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকারও তীব্র সমালোচনা করেন।

পাকিস্তানের তথ্য দপ্তর জানায়, সরকার বিশেষ কয়েকজন সাংবাদিককে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ প্রকাশের অনুমতি দেবে, তবে যাদের পূর্বে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো, তারা এই অনুমতি পাবেন না।

ঢাকায় সামরিক কর্তৃপক্ষ নগরীর রেললাইন ও সড়ক পাশের অননুমোদিত বাড়িঘর ও বস্তি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার এক বিবৃতিতে দাবি করে, ‘কিছু সংখ্যক লোক সমাজ-বিরোধীদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে সীমান্তের ওপারে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে ভারত উদ্বাস্তুর ধুঁয়া তুলে ব্যবসা করছে’।

সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতা

এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপে সোভিয়েত ইউনিয়ন ঢাকা এবং কলকাতায় ভারত ও পাকিস্তানের মিশন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি হওয়ায় দুই দেশের দূতাবাসের কর্মীদের রুশ বিমানে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। দুই দেশ সানন্দে সেই প্রস্তাব মেনে নেয়।

ইংল্যান্ডে বিক্ষোভ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা

ইংল্যান্ডের উরস্টার শহরে পাকিস্তানি জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম ম্যাচের বিরুদ্ধে প্রায় ছয়শ প্রবাসী বাঙালী শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডে ‘হত্যাকারী খুনিরা ফিরে যাও’, ‘গণহত্যা অবিলম্বে বন্ধ করো’, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘খুনি ইয়াহিয়ার নিপাত চাই’-সহ নানা স্লোগান লেখা ছিল।

ব্রিটিশ সাহায্য সংস্থা অক্সফাম ও ওয়ার অন ওয়ান্ট ভারতের শরণার্থীদের জন্য জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য ও কাপড়ের জন্য অর্থ সাহায্যের আবেদন জানায়। ভারতের এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মুক্তিযুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার উন্মুক্ত থাকবে এবং বাংলাদেশ থেকে আগত কয়েকজন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হবে।

মুক্তিযুদ্ধের সমরাস্ত্র

মেজর শফিউল্লাহ’র নির্দেশে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের লেফটেন্যান্ট গোলাম হেলাল মোরশেদ খান এক প্লাটুন যোদ্ধা নিয়ে সিলেটের তেলিয়াপাড়া থেকে মাধবপুর হয়ে শাহবাজপুরে পাকিস্তানি হানাদারদের ওপর আক্রমণের জন্য রওয়ানা হন।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী চট্টগ্রামের রামগড়ের আশেপাশের এলাকায় গোলাবর্ষণ শুরু করে। কুমিল্লার বগাদিয়া সেতুর কাছে নায়েক সিরাজ এক প্লাটুন যোদ্ধা নিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর এমবুশ করেন। এতে ১৫-২০ জন পাকিস্তানী হানাদার নিহত হয়।

পাকিস্তানী বাহিনী কুমিল্লার বড়কামতা পুনরায় আক্রমণ করে এবং গ্রামে বাড়িঘরে আগুন দেয়।

দলত্যাগ ও প্রতিক্রিয়া

ময়মনসিংহ থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক সদস্য সৈয়দ বদরুজ্জামান আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। তিনি আওয়ামী লীগকে ‘দেশের শত্রু’ ও ‘ভারতের দালাল’ বলে আখ্যা দেন।

১ মে ১৯৭১-এর ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি জান্তা সামরিক শক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করতে চাইলেও বিশ্বব্যাপী মুক্তিকামী মানুষের সংহতি তা ব্যর্থ করে দিয়েছিল। একদিকে রণাঙ্গনে প্রতিরোধ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক বিজয়—এই দুই ধারা এদিন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড)

২. দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা (২ মে ১৯৭১)

৩. দৈনিক পাকিস্তান (২ মে ১৯৭১)

৪. দ্য সানডে টেলিগ্রাফ (মে ১৯৭১-এর সাক্ষাৎকার)

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২৩ জুন ১৯৭১: আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তোলপাড় এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের উত্তাল দিন

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ

২২ জুন ১৯৭১: নিষেধাজ্ঞা ভেঙে পাকিস্তানে মার্কিন সমরাস্ত্রের চালান

ইরানের ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্থবির

চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক এমপিপুত্র সজীব মুচলেকা দিয়ে মুক্ত

তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক ড্রাগস

২১ জুন ১৯৭১: রণাঙ্গনে প্রতিরোধ যুদ্ধ, যুক্তরাজ্য ও ভারতের যৌথ বিবৃতি

১৮ জুন ১৯৭১: ঢাকায় দুঃসাহসিক গেরিলা আক্রমণ, কান্দাপাড়া গণহত্যা এবং রণাঙ্গনের প্রতিরোধ

বাবা নাকি ৭১-এর শহীদ, অথচ জামায়াত এমপির জন্ম ১৯৮১ সালে

আলজেরিয়াকে উড়িয়ে আর্জেন্টিনার শুভ সূচনা

১০

১৭ জুন ১৯৭১: জগদীশপুর গণহত্যা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক যুদ্ধ এবং প্রতিরোধ

১১

১১ জুন ১৯৭১: বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পক্ষে সংহতি

১২

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন

১৩

৭ জুন ১৯৭১: বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক তৎপরতা ও অবরুদ্ধ বাংলায় প্রতিরোধ

১৪

৬ জুন ১৯৭১: অসাম্প্রদায়িকতার ডাক, রাজনৈতিক সমাধানের ৪ শর্ত

১৫

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর অতিরিক্ত মার্কিন শুল্ক, কোন দেশে কত?

১৬

বাড়ল বিদ্যুতের দাম, মূল্যস্ফীতির আগুনে নতুন চাপ

১৭

নাটোরের ছাতনী গণহত্যা

১৮

৪ জুন ১৯৭১: ছাতনীতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, আন্তর্জাতিক চাপ ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধ

১৯

৩ জুন ১৯৭১: জাতিসংঘে তোলপাড়, বিশ্ব জনমত গঠন ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত

২০