

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি এবং বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ—এই তিন সংকটে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি শুরু করেছে এবং খেলাপি ঋণ কমাতে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা দাবি করেছে।
লক্ষ্য ১০, বাস্তবে ৩০ শতাংশ ছাড়ালো খেলাপি ঋণ
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি শুরুর সময় লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছানোর পর বর্তমানে তা ৩০.৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরের মার্চে এটি ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিলেও আইএমএফ এখন আর শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট নয়। সংস্থাটি খেলাপিদের দেশি-বিদেশি সম্পদ জব্দ ও কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মতো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ দেখতে চায়।
সংকটের কেন্দ্রে একীভূত পাঁচ ব্যাংক
পুরো ব্যাংক খাতের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৮৪ শতাংশই এখন খেলাপি, যা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক রেজুলেশন আইন শক্তিশালী করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর কঠোর তদারকি নিশ্চিত করার বিষয়েও আইএমএফের সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে।
রাজস্ব আদায়ে ১ লাখ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি
অর্থনীতির দ্বিতীয় বড় ক্ষত রাজস্ব খাতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এনবিআর রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা পিছিয়ে আছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে শেষ তিন মাসে প্রতি মাসে গড়ে ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় করতে হবে, যা এক প্রকার অসম্ভব। আইএমএফ কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে করের আওতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল নজরদারির ওপর জোর দিচ্ছে।
ঋণনির্ভর বাজেট ও বহুমাত্রিক ঝুঁকি
রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা পুরো বছরের বাজেটের লক্ষ্যমাত্রাকেও অতিক্রম করেছে।
সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী এ প্রসঙ্গে বলেন, এই ঋণনির্ভরতা তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে:
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে অর্থ সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারকে টাকা দিলে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হয়, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমিয়ে দেয়।
ঋণের সুদ পরিশোধের চাপে বাজেটের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
আইএমএফ কর্মসূচি কেন জরুরি?
সরকারের জন্য বর্তমানে আইএমএফের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি বজায় রাখা অপরিহার্য। এই কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং বা ঋণমান কমে যেতে পারে, যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগ ও অর্থায়ন আরও ব্যয়বহুল এবং সীমিত হয়ে পড়বে।
পর্যবেক্ষকদের অভিমত
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটগুলো কেবল সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে সুশাসন এবং রাজস্ব ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে। আইএমএফের শর্তগুলো কেবল চাপ হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে নিয়ে সরকারকে দ্রুত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।
মন্তব্য করুন