ঢাকা বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

নিবর্তনমূলক আইনে মামলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
নিবর্তনমূলক আইনে মামলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের পর বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হলেও, নিবর্তনমূলক আইনের অপব্যবহার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনের ঘটনা পুরোপুরি থামেনি। বরং, সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার সুরক্ষা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এই প্রতিবেদনে সমস্যার মূল, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য সমাধানের পথ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

১. প্রেক্ষাপট: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। প্রত্যাশা ছিল, দমনমূলক আইনের অপব্যবহার বন্ধ হয়ে একটি উন্মুক্ত, গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হবে। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও—যেমন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রতিস্থাপনে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন—মূল সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনের আগে থেকেই নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নতুন সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল—অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মাথায় আবারও নিবর্তনমূলক আইনে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটতে শুরু করে, যা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: সত্যিই কি নীতির পরিবর্তন ঘটেছে?

২. নিবর্তনমূলক আইনের কাঠামো ও সমস্যা

বাংলাদেশে বর্তমানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনে ব্যবহৃত প্রধান আইনগুলো হলো:

ক) সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫

২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রতিস্থাপনে ২০২৫ সালে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়। কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হলেও এর মূল কাঠামোতে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আইনটি আগের আইনের চেয়ে বেশি দমনমূলক হতে পারে।

সমালোচিত ধারাগুলো:

ধারা ২১ (মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতে প্রচারণা): কোনো ব্যক্তি যদি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ বিপরীতে ‘প্রচারণা’ বা ‘অভিযান’ চালান, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে

ধারা ২৮ (ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত): যে কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার যা ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে’ তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে

ধারা ২৫ (রাষ্ট্রের সমালোচনা): রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক তথ্য প্রকাশ করলে শাস্তির বিধান

ধারা ২৯ (মানহানি): অনলাইনে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ করলে ফৌজদারি মানহানির বিধান

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এই আইন প্রণয়নকে ‘সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের অভিমত, আইনের অস্পষ্ট সংজ্ঞা ও কঠোর শাস্তির বিধান আত্ম-সেন্সরশিপ বাড়িয়ে দেবে।

খ) সন্ত্রাসবিরোধী আইন

২০০৯ সালে প্রণীত সন্ত্রাসবিরোধী আইনটি মূলত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনের জন্য তৈরি করা হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এটি শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ ও সমাবেশ দমনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

২০২৬ সালের মার্চ মাসে সুনামগঞ্জে এক শান্তিপূর্ণ স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ২৭ জন আইনজীবীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ ২৭ জনের নামোল্লেখ ও আরও কয়েক ডজন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করে। রাতে আইনজীবী মণীশ কান্তি দে ও মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আন্তর্জাতিক আইনজীবী সংস্থা অবজারভেটরি ফর দ্য প্রোটেকশন অফ হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস এ ঘটনাকে ‘শান্তিপূর্ণ অভিব্যক্তি দমনে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।

গ) ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা

১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা পুলিশকে ‘উপদ্রব সৃষ্টির সম্ভাবনা’ থাকলে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেয়। এই ধারাটি সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও এখনো বহাল রয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে পুলিশ এটি ব্যবহার করছে।

ঘ) সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় এখনো দায়ীদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।

২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) ও আরও আটটি মানবাধিকার সংস্থা গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের মুক্তি ও সাইবার আইনে দায়ের করা মামলাগুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।

সংগঠনগুলো তাদের চিঠিতে বলেছে: ‘সাংবাদিক, শিল্পী, লেখক—যাঁরা আইনের অপব্যবহারের শিকার হচ্ছেন—আইনটি যেন মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে’।

৩. হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ

এপ্রিল ২০২৬ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন:

‘বাংলাদেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের দাবিতে আন্দোলন করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের দায়িত্ব আরও বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যারও ইঙ্গিত দেয়।’

এইচআরডব্লিউর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকার উভয়ের আমলেই মানহানি, ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে প্রচারণা–জাতীয় অস্পষ্ট ধারাগুলো ব্যবহার করে সমালোচকদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে।

৪. অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মূল্যায়ন

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের ‘দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস হিউম্যান রাইটস’ এপ্রিল ২০২৬ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মতপ্রকাশ, সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার কথা তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ:

বিষয় পর্যবেক্ষণ
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন করে দলের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ, যা সংগঠনের স্বাধীনতার বিপরীত
সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৫ সালে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রতিস্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত ২০২৩ সালের আইন ব্যবহার অব্যাহত ছিল
সাংবাদিক গ্রেপ্তার ডিসেম্বর ২০২৫-এ সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগ সমর্থনের অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার
আদিবাসী সম্প্রদায় বাওম সম্প্রদায়ের কমপক্ষে ৫৯ সদস্য মিথ্যা সন্ত্রাস মামলায় আটক
শ্রম অধিকার স্বল্প মজুরি ও ইউনিয়নবিরোধী দমন-পীড়নের প্রতিবাদে শ্রমিক বিক্ষোভ

আন্তর্জাতিক সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ডিনুশিকা দিসানায়েক বলেছেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অভিব্যক্তির স্বাধীনতার অনেক রূপকেই অপরাধী করে তুলেছে এবং ভারী জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রেখেছে’।

তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই আইন আন্তর্জাতিক আইন ও মানদণ্ডের পরিপন্থী এবং немедленно সংশোধন করা উচিত।’

৫. নাগরিক সমাজ ও থিংক ট্যাংকের বক্তব্য

আর্টিকেল ১৯ (Article 19)—মতপ্রকাশ ও তথ্যের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাটি—অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে জাতীয় মিডিয়া কমিশন ও সম্প্রচার কমিশন গঠনে জারি করা অধ্যাদেশ দুটির তীব্র সমালোচনা করে। তাদের অভিযোগ, মাত্র তিন দিনের জনগণের মতামতের সময়সীমা রেখে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও যথাযথ প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।

সংস্থাটি বলেছে, ‘এই কমিশনগুলোর কাঠামো ও দায়িত্ব সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের ‘সাংবাদিক’ সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়াও বড় সংকটের কারণ’।

নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক এইচআরডব্লিউ বলেছে, ‘অন্তর্বর্তী সরকার এই খসড়াগুলো দ্রুত পাস করার তাড়াহুড়ো করেছে, অথচ মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের প্রতিবেদন দেওয়ার প্রায় এক বছর পর তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি’।

৬. আইনি বিশ্লেষণ: আইন ও সংবিধানের দ্বন্দ্ব

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদ বলে:

‘প্রত্যেক নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বাক্স্বাধীনতা রয়েছে এবং বাক্স্বাধীনতার মধ্যে রয়েছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও অন্য যেকোনো মাধ্যমে প্রচারের স্বাধীনতা।’

অনুচ্ছেদ ৩৯(১)-এ চিন্তার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। চিন্তার স্বাধীনতা বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি যা ভাবতে চান, সেটা ভাবতে পারেন এবং এই চিন্তা তিনি পরিবর্তন করতেও পারেন।

আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তি (আইসিসিপিআর) :

বাংলাদেশ ২০০০ সালে এই চুক্তি অনুমোদন করেছে। চুক্তির ১৯ অনুচ্ছেদের ২ ধারা বলে:

‘প্রত্যেক ব্যক্তির মতপ্রকাশের অধিকার থাকবে; এই অধিকারের মধ্যে থাকবে সীমান্ত নির্বিশেষে সব ধরনের তথ্য ও ধারণা অন্বেষণ, গ্রহণ এবং প্রচারের স্বাধীনতা—মৌখিক, লিখিত বা মুদ্রিত, শিল্পকলার মাধ্যমে বা যে কোনো মাধ্যমে।’

একই চুক্তির ২১ অনুচ্ছেদ শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি স্পষ্টভাবে বলেছে, ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে মত প্রকাশকেও অপরাধী করার আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী।

তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে প্রচলিত নিবর্তনমূলক আইনগুলোর অধিকাংশই এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে প্রচারণা’ বা ‘ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত’-এর মতো অস্পষ্ট সংজ্ঞার ধারাগুলো পরিষ্কার নয়, যার ফলে ব্যাপক অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।

৭. সরকারের অবস্থান ও করণীয়

এই প্রতিবেদন প্রণয়নের সময় পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি বিবৃতিতে বলা হচ্ছে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও ঘটনার বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় স্বাধীনভাবে চলছে। তবে আইন প্রণয়ন ও সংস্কারের বিষয়ে সরকার এখনো সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান জানায়নি।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো সরকারের প্রতি নিম্নলিখিত সুপারিশ করেছে:

ক) আইনি সংস্কার

সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর অস্পষ্ট ধারাগুলো সংশোধন বা বাতিল করা, বিশেষ করে ২১, ২৫, ২৮ ও ২৯ ধারা

মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়ানি বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করা

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা বাতিল করা, কারণ এটি সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী

সন্ত্রাসবিরোধী আইন শুধুমাত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা, শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ ও সমাবেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করা

খ) মামলা পুনর্বিবেচনা

বর্তমানে নিবর্তনমূলক আইনে আটক ও মামলার সম্মুখীন ব্যক্তিদের মামলা পুনর্বিবেচনা ও প্রত্যাহার করা

মিথ্যা সন্ত্রাস মামলায় আটক বাওম সম্প্রদায়ের ৫৯ সদস্যসহ সব নিরীহ ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া

গ) প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করা, গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত ও প্রতিকারের ক্ষমতা দেওয়া

সাংবাদিক ও নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে সংবাদপত্রের ওপর মব হামলা ও সহিংসতার ঘটনার বিচার নিশ্চিত করা

পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার প্রশিক্ষণ দেওয়া, যেন তারা আইনের অপব্যবহার না করে

ঘ) আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণ

বাংলাদেশ আইসিসিপিআর-এর সদস্য হিসেবে ১৯ ও ২১ অনুচ্ছেদের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা

হাভানা প্রিন্সিপাল (আইনজীবীদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক নীতি) মেনে আইনজীবীদের শান্তিপূর্ণ পেশাগত কাজের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা

২০২৪-২০২৬ সালের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ও নির্বাচনের পর বাংলাদেশ একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। কিন্তু নিবর্তনমূলক আইনের অপব্যবহারের পুরোনো চিত্র পুরোপুরি বদলায়নি। ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার—উভয়ের আমলেই সাইবার আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা ব্যবহার করে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার এই আইনগুলোকে ‘দমনমূলক’, ‘অস্পষ্ট’ ও ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পরিপন্থী’ বলে অভিহিত করছে।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি উদার, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে চায়, তাহলে আইন সংস্কার, অস্পষ্ট ধারা বাতিল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার রাজনীতিমুক্তকরণ ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণ—এই চার স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে এগোতে হবে। নাগরিকের সমালোচনাকে দমনের অস্ত্র না ভেবে তা গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে গ্রহণ করাই একটি পরিণত রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য।

[এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত সরকারি পর্যায় থেকে এই বিষয়ে কোনো বড় ঘোষণা আসেনি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ নাগরিক ও বুদ্ধিজীবীদের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর এসব আহ্বানের প্রতি সরকারের প্রতিক্রিয়াই এখন দেখার বিষয়।]

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নিবর্তনমূলক আইনে মামলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: জাতীয় স্বার্থ সংকট ও প্রতিবাদের আওয়াজ

ডিজিটাল অরাজকতা বনাম কর্পোরেট শাসন / সোশ্যাল মিডিয়া কি ‘প্যারালাল সরকার’?

২৯ এপ্রিল ১৯৭১: গণহত্যার বিভীষিকা ও আন্তর্জাতিক জনমতের প্রবল চাপ

শেখ জামাল: এক অকুতোভয় বীর ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক উত্তরাধিকার

নতুন সরকারের আড়াই মাসে ১ হাজার ১৩০টি হত্যা-ধর্ষণ মামলা

পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ: রূপপুরে শুরু হলো ইউরেনিয়াম লোডিং

ফজলুর রহমানের মন্তব্যে তোলপাড় সংসদ / শহীদ পরিবারের কোনো সদস্যের জামায়াতের রাজনীতি করা অসম্ভব

২৮ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের ডাক ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধের নতুন মাত্রা

২৭ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের জাগ্রত কণ্ঠ ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম

১০

পুলিশি বাধায় পিছু হটেননি সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা / নিয়োগপত্রের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি

১১

জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের ডাক মির্জা ফখরুলের

১২

মুক্তিযুদ্ধের দলিলচিত্রের রূপকার কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই

১৩

২৬ এপ্রিল ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক দলিল

১৪

ইউনূসের ১৮ মাস / অর্থনীতির গভীর ক্ষত ও এক ‘ফোকলা’ উত্তরাধিকারের খতিয়ান

১৫

তপ্ত জনপদে অন্ধকারের শাসন

১৬

জয়পুরহাটের পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুর গণহত্যায় আজও আতঙ্কিত স্বজনহারা পরিবার

১৭

২৫ এপ্রিল ১৯৭১: পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির সমীকরণ

১৮

২৪ এপ্রিল ১৯৭১: সীমান্ত উত্তেজনা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রতিরোধ সংগ্রাম

১৯

২২ এপ্রিল ১৯৭১: মুক্তির বারুদ আর পৈশাচিকতার কালো ছায়া

২০