
১৯৭১ সালের ৩০ মে ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম একটি রক্তস্নাত ও ঘটনাবহুল দিন। এদিন অবরুদ্ধ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা মেতে উঠেছিল বর্বরতম হত্যাযজ্ঞে। অন্যদিকে, বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সফল গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে হানাদারদের কোণঠাসা করে তুলেছিলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বনেতাদের জোরালো সমর্থন এবং পাকিস্তানি প্রচারণার বিরুদ্ধে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।
১. দেশজুড়ে বর্বর গণহত্যা ও বধ্যভূমির ইতিহাস
কাঠিরা গণহত্যা (বরিশাল)
৩০ মে ভোরে বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়ার গৈলা ইউনিয়নের কাঠিরা গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এক নৃশংস গণহত্যা সংঘটিত করে।
পটভূমি: ২৯ মে ছিল কাঠিরার গ্রাম্য হাটের দিন। দুপুর আড়াইটার দিকে কুখ্যাত শান্তিবাহিনীর সদস্য প্রফুল্ল আরিন্দা গৌরনদী থানা থেকে পাকিস্তানি সেনাদের আনার জন্য ৪০টি রিকশা ভাড়া করে। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সন্ধ্যায় হাট ভেঙে যায় এবং গ্রামবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।
হত্যাকাণ্ড ও অলৌকিক রক্ষা: ৩০ মে সকাল ৮টার দিকে প্রফুল্ল আরিন্দার নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা ঘোড়ারপাড় গ্রামের পাশ দিয়ে কাঠিরা গ্রামে অতর্কিত হামলা চালায়। জীবন বাঁচাতে বহু মানুষ গ্রামের গির্জায় আশ্রয় নেন। তারা আশা করেছিলেন গির্জার যাজক মাইকেল সুশীল অধিকারী তাদের রক্ষা করতে পারবেন। হানাদাররা গির্জাটি ঘেরাও করে মেশিনগান তাক করে এবং তরুণদের টেনেহিঁচড়ে এনে উঠানে লাইনে দাঁড় করায়। যাজক সুশীল অধিকারী বাধা দিতে গেলে এক সেনা তাকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। এরপর সেনা কমান্ডার সুশীল অধিকারীকে জিজ্ঞেস করে, "ইধার হিন্দু হ্যায়?" দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার সাথে যাজক উত্তর দেন, "এখানে উপস্থিত সবাই খ্রিস্টান।" এই জবানবন্দির পর হানাদারেরা গির্জার ভেতরে থাকা মানুষদের ছেড়ে দেয়। তবে গির্জায় আসার পথে এবং গ্রামের অন্যান্য স্থানে হানাদাররা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৫০ জনেরও বেশি নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
বরগুনা কারাগার গণহত্যা
পটুয়াখালী জেলার সামরিক আইন প্রশাসক মেজর রাজা নাদির পারভেজ খানের নির্দেশে বরগুনা মহকুমা কারাগারে বন্দী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ২৯ ও ৩০ মে দুই দিনব্যাপী নৃশংস গণহত্যা চালানো হয়।
পটভূমি: ১৪ মে পাকিস্তানি বাহিনী গানবোটে বরগুনা দখল করে এবং ১৫ মে পাথরঘাটা থেকে বিশিষ্ট হিন্দু ব্যবসায়ী লক্ষ্মণ দাস ও তার তিন ছেলেসহ (কৃষ্ণ দাস, অরুণ দাস ও স্বপন দাস) বহু মানুষকে ধরে এনে কারাগারে বন্দী করে। পাকিস্তানিরা চলে যাওয়ার পর স্থানীয় শান্তি কমিটি হিন্দুদের নিরাপত্তা ও জীবননাশের ভয় নেই বলে আশ্বস্ত করে শহরে ফিরিয়ে আনে, যা ছিল মূলত একটি ফাঁদ।
হত্যাকাণ্ড: ২৮ মে মেজর নাদির পারভেজ পুনরায় বরগুনায় আসে এবং ২৯ মে কারাগারে প্রহসনমূলক বিচারের নামে গণহত্যা শুরু করে। জেলা স্কুলের ক্লাস শুরুর ঘণ্টা বাজার সাথে সাথেই প্রথম দিন নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৫৫ জনকে হত্যা করা হয়। পরদিন অর্থাৎ ৩০ মে, দ্বিতীয় দিনের মতো পুনরায় তল্লাশি চালিয়ে আরও ১৭ জন বাঙালিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দুদিনের এই পৈশাচিক গণহত্যায় মোট ৭২ জন (কোনো কোনো উৎসে নিহতের সংখ্যা শতাধিক) মুক্তিকামী বাঙালি শহীদ হন। ১৯৯২ সালে বরগুনার শহীদ স্মৃতি সড়কের পাশে এই শহীদদের স্মরণে একটি গণকবর ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।
সুগন্ধা নদীপাড়ের বধ্যভূমি (ঝালকাঠি)
৩০ মে ঝালকাঠি শহরের সুগন্ধা নদীর পাড়ে (বর্তমান পৌর খেয়াঘাট এলাকা) পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। মাত্র এক দিনেই এখানে ১০৮ জন নিরীহ বাঙালি ও স্বাধীনতাগামী মুক্তিযোদ্ধাকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়া। এটি ঝালকাঠির ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত।
২. রণাঙ্গনের বীরত্বগাথা ও প্রতিরোধ যুদ্ধ
এদিন দেশের পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধারা বেশ কয়েকটি সফল সম্মুখ ও গেরিলা অভিযান পরিচালনা করেন:
চৌদ্দগ্রাম-মিয়ারবাজার (কুমিল্লা): ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মুক্তিবাহিনীর চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘বি’ কোম্পানির এক প্লাটুন বীর মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৭ জনের একটি দলের ওপর সফল ‘অ্যামবুশ’ (Ambush) বা ওতপেতে আক্রমণ পরিচালনা করেন। এই আকস্মিক হামলায় ৩ জন পাকিস্তানি সেনা ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।
বিবিবাজার (কুমিল্লা): মুক্তিবাহিনীর আরেকটি দক্ষ গেরিলা দল কুমিল্লার গোমতী বাঁধের ওপর থেকে বিবিবাজারে অবস্থিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শক্ত ঘাঁটিতে অতর্কিত আঘাত হানে। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর বেশ কয়েকজন সেনা হতাহত হয়।
সিঙ্গারবিল (কুমিল্লা): কুমিল্লার সিঙ্গারবিলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থানের ওপর মুক্তিবাহিনীর একটি মর্টার প্লাটুন আকস্মিক ও তীব্র আক্রমণ চালায়। মর্টার শেলের আঘাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বেশ কয়েকজন সৈন্য হতাহত হয় এবং তাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহ দুর্বল হয়ে পড়ে।
৩. প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান
পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান করাচিতে এক বিবৃতিতে দাবি করেছিলেন যে, তিনি ‘পাকিস্তানে বেসামরিক প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চান’। ৩০ মে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান এই বিবৃতির তীব্র ও যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন: “ইয়াহিয়া খানের কোনো কথাই বিশ্বাসযোগ্য নয়। মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনায় যে মতৈক্য হয়েছিল, ইয়াহিয়া তা ঘোষণা করতে রাজি হয়েও শেষ মুহূর্তে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দেন। বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশের বেশি মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট দিয়েছে, তাদের প্রশ্ন বা বিচার করার কোনো নৈতিক অধিকার পাকিস্তানি জান্তার নেই।”
৪. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক তৎপরতা
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বক্তব্য: ম্যানচেস্টারে স্বাধীন বাংলাদেশের সমর্থনে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বক্তব্য দেন। তিনি ২৫ মার্চের কালরাত থেকে শুরু হওয়া পাকিস্তানি বর্বরোতার বিবরণ তুলে ধরেন এবং বলেন, বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের মানুষ এখন জেগে উঠেছে। সমাবেশ থেকে ‘জয় বাংলা’ এবং ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয় ম্যানচেস্টার।
মার্কিন সিনেটের কঠোর অবস্থান: মার্কিন সিনেটে প্রভাবশালী সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডিসহ বেশ কয়েকজন সিনেটর বাংলাদেশের জনগণের প্রতি পুর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেন। তারা সাফ জানিয়ে দেন যে, পাকিস্তানের এই নির্মম গণহত্যাকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন করার কোনো প্রশ্নই আসে না। একই সাথে মার্কিন সিনেটের বৈদেশিক সাহায্য সম্পর্কিত কমিটি পাকিস্তানকে সমস্ত প্রকার আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেয়।
সুইডেনের সর্বদলীয় বিবৃতি: সুইডেনের সব রাজনৈতিক দল যৌথভাবে একটি প্রস্তাব পাস করে পূর্ব পাকিস্তানে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানায়। তারা নির্যাতিত বাঙালিদের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করে।
ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন স্পিকার জাইচেক বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের স্বাধীনতার দাবি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। তিনি মুসলিম বিশ্বকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
শরণার্থী সংকট ও ভারত: ভারতের কেন্দ্রীয় পুনর্বাসন মন্ত্রী রঘুনাথ কেশব খাদিলকর দিল্লিতে জানান, বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৪০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার যৌথভাবে শরণার্থী শিবিরে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া কলেরা রোগ মোকাবিলার চেষ্টা করছে। একই দিনে গান্ধী শান্তি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আর আর দিবাকর পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ সীমান্তের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন এবং গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে বলেন, "বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই, এত মানুষের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না।"
৫. পাকিস্তানের অপপ্রচার ও ছদ্মবেশ
আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে এবং বিশ্ব চোখকে ফাঁকি দিতে ৩০ মে পাকিস্তান সরকার ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনকারী তথাকথিত উদ্বাস্তুদের জন্য ‘অভ্যর্থনা শিবির’ খোলার নাটকীয় সিদ্ধান্ত নেয়। একই সাথে তারা রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞপ্তিতে অপপ্রচার চালায় যে, বাংলাদেশ সরকার এবং এর সামরিক হাইকমান্ডের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে এবং এই প্রতিরোধ আন্দোলন অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। অথচ মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।
২. মুক্তিবুদ্ধে প্রবাসী বাঙালি: যুক্তরাজ্য — আবদুল মতিন, সাহিত্য প্রকাশ।
৩. ঝালকাঠি বধ্যভূমি ও গণহত্যা জরিপ রিপোর্ট — ড. এম. এ. হাসান (ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি)।
৪. কাঠিরা গণহত্যা — হিমু অধিকারী।
৫. বাংলাপিডিয়া: বরগুনা জেলা ও বরগুনা গণহত্যা অধ্যায়।
৬. দৈনিক পাকিস্তান, ৩১ মে ১৯৭১।
৭. দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা (ভারত), ৩১ মে ১৯৭১।
৮. দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা (ভারত), ৩১ মে ১৯৭১।
মন্তব্য করুন