

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক, সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ আর নেই।
সোমবার (১ জুন) বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িচালক মোহাম্মদ হানিফ খন্দকার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও তাঁর পারিবারিক সূত্রও গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ছিলেন লাইফ সাপোর্টে
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজডসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গত সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবণতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও তীব্র শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং একপর্যায়ে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। দীর্ঘ লড়াই শেষে আজ বিকেলে তিনি চিরবিদায় নেন।
কোড়ালিয়া থেকে রাজপথের ‘তোফায়েল ভাই’
তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ষাটের দশকে ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উত্থান। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তৎকালীন আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দেশজুড়ে পরিচিতি পান এবং বাঙালির ‘তোফায়েল ভাই’ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এই ছাত্রনেতাই।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও ছয় দফা আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী তোফায়েল আহমেদ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান সংগঠক। যুদ্ধের সময় ‘মুজিব বাহিনী’র অন্যতম আঞ্চলিক অধিনায়ক হিসেবে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি সর্বমোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালেও তিনি বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর আদর্শিক অবস্থান ধরে রেখেছিলেন।
একটি অধ্যায়ের অবসান
তোফায়েল আহমেদের প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। শোকবার্তায় নেতৃবৃন্দ বলছেন, তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু শুধু একজন রাজনীতিবিদের প্রস্থান নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি।
মৃত্যুকালে তিনি স্বজন, সহযোদ্ধা এবং অগণিত অনুসারী রেখে গেছেন। তাঁর জানাজা ও দাফনের বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুতই বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানা গেছে।
মন্তব্য করুন