ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৭ শিল্প অঞ্চলে ৪৫৭ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ, বিপাকে তৈরি পোশাক খাত

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ০২:৫৩ পিএম
৭ শিল্প অঞ্চলে ৪৫৭ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ, বিপাকে তৈরি পোশাক খাত

দেশের শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদের নানামুখী সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ব্যাপক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে চলতি জুন মাস পর্যন্ত দেশের প্রধান ৭টি শিল্প এলাকায় মোট ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে একক কারণ হিসেবে প্রায় ৮৬.৪৩ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়েছে পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশের অভাব ও মালিকপক্ষের চরম আর্থিক সংকটের কারণে। কারখানা বন্ধের এই হিড়িকের ফলে হাজার হাজার শ্রমিক ও কর্মচারী আকস্মিকভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যা সামগ্রিক অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে।

১. সংকটের কেন্দ্রে গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্স

শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অতি সম্প্রতি গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার 'ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড' আর্থিক সংকটের কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১৬ই জুন থেকে কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ৭০০ শ্রমিকসহ প্রায় ২ হাজার ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। অবশ্য মালিকপক্ষ, শ্রমিক ও প্রশাসনের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে আগামী ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও আইনানুগ পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

২. কারখানা বন্ধের মূল কারণসমূহ

শিল্প গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢালাও কোনো একটি কারণে নয়, বরং বহুমাত্রিক সংকটে পড়ে কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে:

ক্রয়াদেশের অভাব: ৪৫৭টি কারখানার মধ্যে ২০৫টি বন্ধ হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে পর্যাপ্ত কাজের অর্ডার না থাকায়।

আর্থিক সংকট: ১৯০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে চলতি মূলধন বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাবে।

শ্রমিক অসন্তোষ: মজুরি ও পাওনা নিয়ে অসন্তোষের জেরে বন্ধ হয়েছে ১১টি কারখানা।

অন্যান্য কারণ: রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট, কাঁচামালের অভাব এবং ফ্যাক্টরি স্থানান্তরসহ বিবিধ কারণে বন্ধ হয়েছে ৫১টি কারখানা।

৩. অঞ্চলভিত্তিক বন্ধ কারখানার পরিসংখ্যান

বর্তমানে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে মোট নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা ১০ হাজার ২৩৮টি। এর মধ্যে অঞ্চলভিত্তিক বন্ধ হওয়া কারখানার চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

শিল্প অঞ্চল মোট কারখানার সংখ্যা স্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানা
গাজিপুর ২৭৬৪ ১৫৫
আশুলিয়া ১৭০৫ ১২৪
চট্টগ্রাম ১৭৭৮ ১১৯
নারায়নগঞ্জ ১৯৬০ ৩৮
ময়মনসিংহ ২৯৩
কুমিল্লা ৩১৭
খুলনা ৬৭৩
সিলেট - কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি

৪. খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ: পোশাক খাতের ওপর বড় ধাক্কা

স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া ৪৫৭টি কারখানার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি (১৫১টি) কারখানা তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতসংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-র সদস্য ১০৮টি এবং নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ-র সদস্য ৩৫টি। এছাড়া টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) ৮টি এবং বেপজার (বেপজা) আওতাধীন ১৯টি কারখানা রয়েছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো সংগঠনের ছাতার নিচে না থাকা ২৮৭টি ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, যাদের টিকে থাকার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকআপ ছিল না।

৫. আইনি প্রক্রিয়া ও শ্রমিক অসন্তোষের ঝুঁকি

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিন জানান, অধিকাংশ কারখানাই শ্রম আইন মেনে নোটিস দিয়ে বন্ধ হচ্ছে। তবে মূল জটিলতা তৈরি হচ্ছে বন্ধের পর শ্রমিকদের পাওনা ও সার্ভিস বেনিফিট পরিশোধে বিলম্বের কারণে। সময়মতো প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্প পুলিশকে মধ্যস্থতা করতে হচ্ছে। আগাম তথ্য না থাকলে এই পরিস্থিতি অনেক সময় সহিংস রূপ নেয়।

বিশেষজ্ঞদের মত ও উত্তরণের পথ

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ মনে করেন, এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক। কোভিড মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। এর ওপর ব্যাংকিং খাতের ঋণ সংকোচন এবং এলসি (LC) খুলতে না পারায় কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হয়েছে।

প্রণোদনা ও স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজনীয়তা

সরকার ইতোমধ্যে বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় সচল করতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, ৩২২টি কারখানা এই প্রণোদনা পেতে আবেদন করেছে, যার মধ্যে ১৯৯টি পুরোপুরি এবং ১২৩টি আংশিক বন্ধ। বর্তমানে এগুলোর যোগ্যতা যাচাই-বাছাই চলছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ এই উদ্যোগকে ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন:

“ঢালাওভাবে সব কারখানাকে সহায়তা দেওয়া ঠিক হবে না। যেগুলো বহু বছর ধরে বন্ধ, সেগুলোর যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো অকেজো হয়ে পড়েছে। কিন্তু যেগুলো অতিসম্প্রতি সাময়িক সংকটে বন্ধ হয়েছে, সেগুলো সঠিক নীতিগত সহায়তায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তাই তৃতীয় পক্ষের (Third Party) অডিটের মাধ্যমে কারখানার প্রকৃত অবস্থা ও রিকভারি রোডম্যাপ যাচাই করে তবেই প্রণোদনা দেওয়া উচিত।”

দেশের কর্মসংস্থান ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শিল্পাঞ্চলের এই স্থবিরতা দ্রুত কাটানো জরুরি। শুধু ঋণের সুবিধা দিয়ে নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং জটিলতা দূর করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন ক্রেতা খোঁজার কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই দেশের উৎপাদন খাতকে আবার সচল করা সম্ভব।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া

জামায়াত এমপি নজরুলের বাসায় উদ্ধারকৃত চিঠিতে মরিয়মের যা লেখা

জামায়াত এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্ররোচনার মামলা

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড: কবিতা, গান ও ক্যানভাসে শরণার্থী জীবনের করুণ আখ্যান

যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ শর্ত দিল ইরান, না মানলে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধ’

নজিরবিহীন জালিয়াতি / বাংলাদেশ ব্যাংকে পদ ছাড়াই ৩৬৫ জনের নিয়োগ ও পদোন্নতি

অপ্রতিম হত্যা: কিশোর গ্যাং, অপরাধ চক্র ও পুলিশের ভূমিকা

আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

‘বারবার মামলা না দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেন’

আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

১০

সিঙ্গাপুরেও মিলল বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব / সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

১১

​​​​​​​শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ চারজনের মধ্যে ৩ জনের লাশ উদ্ধার

১২

মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সংলাপ ও নিরাপদ সমুদ্রপথের তাগিদ

১৩

গুলশানে আ’লীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৩২

১৪

সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের লাশ উদ্ধার

১৫

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

১৬

যেভাবে সমন্বিত ডিজিটাল-রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল ‘গুমচর’

১৭

শাহজালাল বিমানবন্দরের সামনে প্রবাসীর ২০০ গ্রাম স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগ

১৮

এনবিআরে বড় রদবদল: একযোগে ৩৬ অতিরিক্ত কর কমিশনার বদলি

১৯

প্রণোদনার দ্বিতীয় ধাপ: ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণে আরও ১০ ব্যাংকের চুক্তি

২০