

১৯৭১ সালের ২২ মে একাধারে যেমন পিরোজপুরের ভীমনালিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী, তেমনি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক দিন।
১. সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খানের ঐতিহাসিক বিবৃতি
এদিন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সীমান্ত গান্ধী নামে পরিচিত প্রখ্যাত পাখতুন নেতা খান আবদুল গাফফার খানের একটি বিবৃতির অনুলিপি প্রকাশ করা হয়, যা তিনি কাবুুল থেকে পাঠিয়েছিলেন। বিবৃতিতে তিনি পাকিস্তান ভাঙার জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টো ও কাইয়ুম খানের ভুল নীতিকে সরাসরি দায়ী করেন। তিনি উল্লেখ করেন:
শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে অবিচার করা হয়েছে।
ইয়াহিয়া খান স্বয়ং শেখ মুজিবকে ‘ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন করেও পরে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
বাঙালিরাই মূলত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ; সুতরাং সংখ্যাগরিষ্ঠরা কখনো দেশ ভাঙতে চায় না।
তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বিরোধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার জন্য মধ্যস্থতা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সামরিক সরকার তাতে সাড়া দেয়নি।
২. কলকাতায় ‘বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ’ গঠন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে বিশ্বজুড়ে এবং বুদ্ধিজীবী মহলে সুসংগঠিত জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে এদিন কলকাতার থিয়েটার রোডে বাংলাদেশের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীরা সমবেত হয়ে ‘বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন।
সভাপতি: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ আর মল্লিক।
কার্যকরী পরিষদের সদস্যবৃন্দ: জহির রায়হান, ওয়াহিদুল হক, মওদুদ আহমদ, অনুপম সেন, সৈয়দ আলী আহসান, খান সারওয়ার মুরশিদ, কামরুল হাসান, রণেশ দাশগুপ্ত, ব্রজেন দাস, মুস্তাফা মনোয়ার ও ফয়েজ আহমদ প্রমুখ।
৩. আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও গণহত্যা
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে এদিন বাংলাদেশের গণহত্যার চিত্র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের খবর গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়।
দ্য স্যাটারডে রিভিউ: ‘পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের বন্যাদুর্গত ও ক্ষুধাপীড়িত মানুষ এখন মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ তথা এক পরিকল্পিত বধ্যভূমির শিকার। স্বায়ত্তশাসনের রায়কে বানচাল করতে ইসলামাবাদ সরকার সামরিক বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে পুরো দেশকে সাক্ষাৎ নরকে পরিণত করেছে।
ন্যাশনাল হেরাল্ড (ইউএনআই-এর বরাতে): ‘আগরতলা হাসপাতালে গণহত্যার প্রমাণ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২৬০ শয্যার আগরতলা জেনারেল হাসপাতালে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ অর্থাৎ ৫৩০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসাধীন, যাদের বেশিরভাগই পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার শিকার। এদের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি হারানো ৯ ও ১৩ বছরের দুটি শিশুও রয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা: ‘ঢাকায় গ্রেনেড আক্রমণের কথা পরোক্ষে স্বীকার’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার বুকে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমণের কথা পাকিস্তান বেতার পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছে। তারা নাশকতার সাথে জড়িতদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছে এবং ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে। এর আগে মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকার গভর্নরের বাসভবন, সিভিল সেক্রেটারিয়েট ও নিউ মার্কেটে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকে সফল হানা দেয়।
হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড: ‘করিমগঞ্জ সীমান্তে পাকিস্তানি সৈন্য সমাবেশ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে আসামের করিমগঞ্জ ও জাকিগঞ্জ সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাদের বাংকার নির্মাণ ও সৈন্য সমাবেশের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
৪. শরণার্থী সংকট ও ভারতের অবস্থান
২৪ মার্চ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম দিয়ে ৭,০০০-এরও বেশি শরণার্থী মিজোরামের মিজো পাহাড়ে আশ্রয় নেয়, যা ছিল সে সময়ের সবচেয়ে বড় অন্তপ্রবাহ। দিল্লির ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা মোট শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩ লাখ ৯৩১ জনে।
ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্য: ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে বলেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ইচ্ছা ভারতের নেই, তবে শরণার্থীদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে ভারত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রামের হুঁশিয়ারি: আসামের করিমগঞ্জ ও হলদিবাড়ীর শরণার্থী শিবির পরিদর্শন শেষে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দেন, পাকিস্তান যদি ভারতীয় সীমান্তে গোলাগুলি বজায় রাখে, তবে ভারত আর ‘নীরব দর্শক’ হয়ে থাকবে না।
অটল বিহারি বাজপেয়ীর নেতৃত্ব: দিল্লিতে ‘জনসংঘ’ তাদের সংসদীয় দলের সভায় বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দেওয়ায় ভারত সরকারের নিন্দা জ্ঞাপনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং অটল বিহারি বাজপেয়ীকে অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
৫. মার্কিন দূতাবাস ও চিকিৎসকদের গোপন চিঠি
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং ‘অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকান ফিজিশিয়ানস’ (এপিপি)-এর মার্কিন চিকিৎসকেরা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে একটি গোপন চিঠি পাঠান। চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন থেকে পাকিস্তানকে দেওয়া সামরিক সাহায্য, অস্ত্র ও গোলাবারুদ পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ বেসামরিক বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
৬. অবরুদ্ধ বাংলাদেশ: গণহত্যা ও প্রতিরোধ যুদ্ধ
ভীমনালি গণহত্যা (পিরোজপুর)
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার হিন্দু-অধ্যুষিত ভীমনালি গ্রামে এদিন এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটে। কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারের নির্দেশে প্রায় ৫০০ সশস্ত্র রাজাকার গ্রামটি ঘিরে ফেলে। বারুই বাড়ির সামনে প্রায় ২০০ বাঙালি হিন্দু লাঠি ও বর্শা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রায় দুই ঘণ্টার অসম যুদ্ধে ১৫-১৮ জন গ্রামবাসী শহীদ হন। প্রতিরোধের মুখে লালু খান নামে এক রাজাকার নিহত হয়। পরবর্তীতে ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারের নেতৃত্বে ৮০টি হিন্দু পরিবারের ঘরবাড়ি লুটপাট করে গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া এদিন শরীয়তপুরের বেশ কিছু গ্রামেও পাকিস্তানি সেনারা তাণ্ডব চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে।
মুক্তিবাহিনীর বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ
শালদা নদী (ব্রাহ্মণবাড়িয়া): ক্যাপ্টেন আবদুল হকের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা শালদা নদীতে পাকিস্তানি হানাদারদের একটি ডিফেন্স ঘাঁটিতে আকস্মিক আক্রমণ চালায়। এতে ৪ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত এবং ১১ জন আহত হয়।
নালিতাবাড়ি ব্রিজ ধ্বংস: অনেকবার ব্যর্থ হওয়ার পর এদিন কমান্ডার আবুল হাশেমের নেতৃত্বে এবং বিডিআর সদস্য ফরহাদের সহায়তায় মুক্তিবাহিনী ও ইপিআরের ৪টি কোম্পানি নালিতাবাড়ি ব্রিজটি সফলভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়, যা পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জের জোয়াইয়ের দুর্গম অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের ২৮ দিনব্যাপী একটি বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়।
দালালদের তৎপরতা
ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর মিয়া তোফায়েল নতুন করে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের দাবি তোলেন। চট্টগ্রামে নেজামে ইসলামীর মহাসচিব মওলানা সিদ্দিক আহমদ এবং রংপুরে সাবেক এমএনএ সিরাজুল ইসলাম ও আব্দুর রহমান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: সপ্তম, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।
২. দৈনিক পাকিস্তান, ২৩ মে ১৯৭১।
৩. দৈনিক পূর্বদেশ, ২৩ মে ১৯৭১।
৪. দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা (ভারত), ২৩ মে ১৯৭১।
৫. দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা (ভারত), ২৩ মে ১৯৭১।
৬. যুগান্তর (ভারত), ২৩ মে ১৯৭১।
মন্তব্য করুন