ঢাকা মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

পদ্মা সেতু: বাংলাদেশের সক্ষমতা ও গৌরবের মহাকাব্য

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ০২:১১ পিএম
পদ্মা সেতু: বাংলাদেশের সক্ষমতা ও গৌরবের মহাকাব্য

বাংলাদেশের ললাটে এক অনন্য গৌরবের তিলক—পদ্মা বহুমুখী সেতু। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করা এবং প্রমত্তা পদ্মার উত্তাল ঢেউকে শাসন করে নির্মিত এই সেতু আজ আর কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, জেদ এবং অদম্য সাহসের এক মূর্ত প্রতীক।

১. ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জের পাহাড়

পদ্মা সেতুর স্বপ্নযাত্রা সহজ ছিল না। ১৯৯৮-৯৯ সালে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ২০০১ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও মূল কাজ গতি পায় ২০০৯ সালের পর। তবে বড় ধাক্কা আসে ২০১২ সালে, যখন কথিত দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন স্থগিত করে।

বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন ঘোষণা করেছিলেন—“আমরা নিজেদের অর্থায়নেই পদ্মা সেতু গড়ব।” বিশ্বকে তাক লাগিয়ে সেই ঘোষণাই আজ ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

২. কারিগরি প্রকৌশল ও নির্মাণশৈলী

পদ্মা সেতু বিশ্বের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং একটি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্ট। এর কিছু কারিগরি দিক নিচে তুলে ধরা হলো:

দৈর্ঘ্য ও গঠন: মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার এবং সংযোগ সড়কসহ মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৯.৮৩ কিলোমিটার। এটি একটি দ্বি-স্তর বিশিষ্ট সেতু (উপরে চার লেনের সড়ক এবং নিচে রেললাইন)।

পাইলিংয়ের গভীরতা: নদীর তলদেশ থেকে ১২০ থেকে ১২৭ মিটার গভীর পর্যন্ত পাইলিং করা হয়েছে, যা বিশ্বের যেকোনো সেতুর জন্য সর্বোচ্চ রেকর্ড।

ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং: ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল করার জন্য এতে অত্যাধুনিক বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছে।

অন্যান্য উপকরণ: সেতু তৈরিতে যে পাথর ও ইস্পাত ব্যবহৃত হয়েছে, তা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মান নিশ্চিত করেছে।

৩. অর্থনৈতিক বিপ্লবের নতুন দিগন্ত

পদ্মা সেতু কেবল মুন্সীগঞ্জ আর শরীয়তপুরকে যুক্ত করেনি, এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে সরাসরি রাজধানী ঢাকার সাথে সংযুক্ত করেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে:

জিডিপি বৃদ্ধি: এই সেতু চালুর ফলে দেশের মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধি বছরে ১.২% থেকে ১.৫% বৃদ্ধি পাবে।

পরিবহন সময়: আগে যেখানে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে ফেরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বা দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো, এখন তা মাত্র ১০ মিনিটে পার হওয়া সম্ভব হচ্ছে।

শিল্পায়ন: সেতুর দক্ষিণ পাড়ে ইতোমধ্যে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠছে। পায়রা ও মোংলা বন্দরের ব্যবহার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

৪. বিশ্ব মিডিয়ার চোখে পদ্মা সেতু

পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ যখন শেষ পর্যায়ে, তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো একে "বাঙালির জয়" হিসেবে আখ্যায়িত করে।

বিবিসি (BBC) একে দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগকারী অন্যতম বড় অবকাঠামো হিসেবে বর্ণনা করেছে।

আল জাজিরা এর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছে, নিজস্ব অর্থায়নে এমন বিশাল প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রমাণ।

ইকোনমিস্ট এবং রয়টার্স এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিশাল সক্ষমতার পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছে।

৫. একটি জাতীয় অহংকার

পদ্মা সেতু এখন বাংলাদেশের গর্বের স্মারক। এই সেতু প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা আর সাহস থাকলে কোনো বাধা আটকে রাখতে পারে না। এটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস মুছে দিয়েছে। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও কুয়াকাটা ও সুন্দরবনের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এই স্থাপনা।

“পদ্মা সেতু কোনো রড-সিমেন্টের কাঠামো নয়, এটি বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের আবেগের জায়গা এবং অপমানের জবাব দেওয়ার সাহস।”

..............

পদ্মা সেতু এখন কেবল একটি যাতায়াতের পথ নয়, এটি উন্নয়নের মহাসড়ক। এই সেতুটি নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশের কাতার থেকে উন্নত দেশের স্বপ্নে বিভোর এক নতুন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। আগামী প্রজন্মের কাছে এই সেতু সাহসের প্রেরণা হিসেবে টিকে থাকবে চিরকাল।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন

৭ জুন ১৯৭১: বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক তৎপরতা ও অবরুদ্ধ বাংলায় প্রতিরোধ

৬ জুন ১৯৭১: অসাম্প্রদায়িকতার ডাক, রাজনৈতিক সমাধানের ৪ শর্ত

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর অতিরিক্ত মার্কিন শুল্ক, কোন দেশে কত?

বাড়ল বিদ্যুতের দাম, মূল্যস্ফীতির আগুনে নতুন চাপ

নাটোরের ছাতনী গণহত্যা

৪ জুন ১৯৭১: ছাতনীতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, আন্তর্জাতিক চাপ ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধ

৩ জুন ১৯৭১: জাতিসংঘে তোলপাড়, বিশ্ব জনমত গঠন ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত

তোফায়েল আহমেদ / বর্ণাঢ্য রাজনীতির এক ফিনিক্স পাখি

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদ আর নেই

১০

১ জুন ১৯৭১: নগরকান্দা গণহত্যা, রণাঙ্গনে বিজয় ও বিশ্ব কূটনীতির নতুন মোড়

১১

৩১ মে ১৯৭১: ‘সমঝোতার সুযোগ নেই’, বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ ও রণাঙ্গনের খণ্ডচিত্র

১২

৩০ মে ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা, রণাঙ্গনের প্রতিরোধ ও বিশ্ব কূটনৈতিক অঙ্গন

১৩

রক্তস্নাত বুরুঙ্গা গণহত্যা (সিলেট)

১৪

২৬ মে ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা, প্রতিরোধ ও বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গন

১৫

ভীমনালী গণহত্যা: যে নির্মম ট্র্যাজেডি আজও এক উপেক্ষিত

১৬

২২ মে ১৯৭১: গণহত্যা, প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি

১৭

১৬২ পয়েন্টে ১৬০০ গডফাদার: কার ইশারায় ঢুকছে মাদক?

১৮

হত্যা মামলায় রক্তাক্ত সাংবাদিকতা

১৯

১৮ মে ১৯৭১: পাকিস্তানের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তীব্র প্রতিবাদ ও কূটনৈতিক যুদ্ধ

২০