ঢাকা রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

বাংলাদেশে ফের বাড়ছে সন্তান জন্মহার, ঝুঁকিতে অর্থনীতি

সামিহা সামান্থা
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম
বাংলাদেশে ফের বাড়ছে সন্তান জন্মহার, ঝুঁকিতে অর্থনীতি

১৯৭৫ সালে যে দেশে গড়ে একজন নারী ৬টির বেশি সন্তান জন্ম দিতেন, সেই বাংলাদেশে ২০১১ থেকে ২০২২ পর্যন্ত মোট প্রজনন হার (টিএফআর) স্থির ছিল ২.৩-এ। কিন্তু ২০২৫ সালের জরিপে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.৪-এ — স্বাধীনতার পর দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রথম কোনো দেশে জন্মহার বাড়ল। জনসংখ্যাবিদদের ভাষায়, সামান্য এই ০.১-এর বৃদ্ধিই আসলে বিপদঘণ্টা।

ইউটার্নের নেপথ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভাঙন

জাতিসংঘ শিশু তহবিল ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যৌথ জরিপ অনুযায়ী, গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার (সিপিআর) ২০১৯ সালের ৬২.৭ শতাংশ থেকে নেমে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৮.২ শতাংশে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ৫৪ হাজার ২২৫টি পদের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার ৫৫০টি অর্থাৎ ২৭ শতাংশ পদই শূন্য। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশে কনডম, খাবার বড়ি ও ইনজেকশনের মজুত পুরোপুরি শূন্য হয়ে পড়েছিল। সাভারের এক পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, চার-পাঁচ মাস ধরে তাদের কাছে কনডমের সরবরাহ নেই। কিশোরী মায়ের জন্মহারও বেড়েছে — প্রতি হাজারে ৮৩ থেকে ৯২-এ।

কারা কম ব্যবহার করছেন গর্ভনিরোধক

গত ৮ই আগস্ট একটি সম্মেলনে অর্থনীতি বিভাগ ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) ২০২২-এর তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। ১৬ হাজারের বেশি বিবাহিত, উর্বর ও অগর্ভবতী নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, জাতীয় পর্যায়ে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ৭১.১ শতাংশ — শহরে ৭৩.৬ শতাংশ, গ্রামে ৬৯.৮ শতাংশ। গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ ফল একটি "সম্পদ প্যারাডক্স" — সবচেয়ে ধনী পরিবারের নারীরা সবচেয়ে দরিদ্র নারীদের তুলনায় গ্রাম পর্যায়ে ২৭ শতাংশ ও জাতীয় পর্যায়ে ২১ শতাংশ কম গর্ভনিরোধক ব্যবহার করছেন, যদিও শহরে এই পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়। শিক্ষা এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী নির্ণায়ক — উচ্চশিক্ষিত নারীদের ব্যবহারের প্রবণতা শিক্ষাহীনদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিভাগীয় পর্যায়ে সিলেট সবচেয়ে পিছিয়ে, বরিশালের তুলনায় জাতীয় পর্যায়ে ব্যবহারের হার প্রায় ৫৪ শতাংশ কম, ঢাকা ও চট্টগ্রামও উল্লেখযোগ্য পিছিয়ে। সন্তানসংখ্যা ও ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক হিসেবে উঠে এসেছে — চার বা তার বেশি সন্তান থাকা নারীদের ব্যবহারের সম্ভাবনা নিঃসন্তান নারীদের তুলনায় প্রায় সাড়ে আট গুণ বেশি — অর্থাৎ ব্যবহার মূলত চাহিদা-চালিত, সরবরাহ-চালিত নয়।

উপাত্ত যা বলছে

গবেষকদের মডেলে ধর্ম বা সম্পদের চেয়ে সন্তানসংখ্যা ও প্রজনন-ইচ্ছাই বহুগুণ বেশি প্রভাবশালী প্রমাণিত হয়েছে। মডেলের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ে গবেষকরা এইউসি (AUC) মান পেয়েছেন ০.৮৪১, যা "চমৎকার" মানের নির্দেশক, আর বহু-সমরৈখিকতা পরীক্ষায় কোনো ভেরিয়েবলই ঝুঁকিসীমা অতিক্রম করেনি। এর আগে বিএমসি উইমেন্স হেলথ জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় (বিডিএইচএস ২০১৭-১৮ ভিত্তিক) দেখা গিয়েছিল, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ উভয় সমস্যায় ভোগা নারীদের মধ্যে আধুনিক পদ্ধতির বদলে তুলনামূলক কম কার্যকর ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির ব্যবহার প্রায় ৩১ শতাংশ বেশি। এই তথ্য প্রমাণ করে, শুধু গর্ভনিরোধক সহজলভ্য করাই যথেষ্ট নয় — সঠিক পরামর্শ ও মানসম্পন্ন সেবাও সমান জরুরি।

সুপারিশ

গবেষক দলের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথমত সিলেট ও ময়মনসিংহের মতো পিছিয়ে পড়া বিভাগে বাড়তি নজর দরকার, কারণ শিক্ষা বা সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এই অঞ্চলের নারীরা পিছিয়ে। দ্বিতীয়ত, শহরের তুলনায় গ্রামেই কাঠামোগত বৈষম্য বেশি বলে গ্রামীণ এলাকায় ঘরে ঘরে সেবা পৌঁছে দেওয়ার মডেল পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ধনী-দরিদ্র উভয়ের ব্যবহারের হার কাছাকাছি চলে আসায় এখন শুধু বিনামূল্যে সরবরাহ নয়, মানসম্পন্ন কাউন্সেলিং ও পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুযোগই বেশি জরুরি। চতুর্থত, নারীশিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সবশেষে, নতুন দম্পতিদের বিয়ের শুরুতেই পরিবার পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করতে হবে, কারণ বর্তমানে বেশিরভাগ নারী সন্তান জন্মদান "থামাতে" গর্ভনিরোধক শুরু করেন, শুরু থেকে ব্যবধান রাখতে নয়। গবেষকদের ভাষায়, বাংলাদেশ ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান মোটামুটি ঘুচিয়েছে, এখন লক্ষ্য আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবধান ঘোচানো — তা করা গেলেই টিএফআরের (Total Fertility Rate) এই উল্টো যাত্রা রোধ করে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র

  • Moral, S. (2026). World Population Day: Total fertility rate rises in Bangladesh. Prothom Alo.
  • AFP (2026). Poor planning fuels Bangladesh contraceptive crisis. Prothom Alo (Bangladesh in World Media).
  • Islam, M. N. (2026). Bangladesh's fertility U-turn: The case for demographic governance. The Business Standard.
  • The Daily Star (2026). High fertility isn't good news. Editorial.
  • Hossen, M. J., Nishan, R. H., & Samantha, S. Factors Affecting Contraceptive Use amongst Women: A Comparative Analysis of Urban, Rural and National Level Population of Bangladesh. University of Dhaka.
  • Khan, M. N., Islam, M. M., & Islam, R. M. (2022). Pattern of contraceptive use among reproductive-aged women with diabetes and/or hypertension: findings from Bangladesh Demographic and Health Survey. BMC Women's Health, 22(230).
অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশে ফের বাড়ছে সন্তান জন্মহার, ঝুঁকিতে অর্থনীতি

দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপতি ভোট

সামরিক শক্তির প্রচ্ছায়ায় পাকিস্তানের রাজনীতি / আরেকটি অভ্যুত্থানের দিকে কি এগোচ্ছে ইসলামাবাদ?

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মোড়: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’

ছায়ানটে ‘গাই বাংলার গান’ পর্ষদের সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘অন্তর্দাহ’ ১০ আগস্ট

চাঁদে আঘাত হানবে রকেটের টুকরো, বিস্ফোরণের শক্তি ৩ টন বোমার সমান

একটি গান, একটি সংকেত, আর ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসাহসিক এক রাত / অপারেশন জ্যাকপট: রক্তে লেখা নৌ-সংগ্রামের মহাকাব্য

ভৌগোলিক বাধায় থমকে গেল ঢাকার বহু বছরের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা / “বাংলাদেশ কখনোই আসিয়ানের সদস্য হতে পারবে না”

১৭১ দিনের বেকারত্ব: প্রশিক্ষণ বিতর্কে অনড় সরকার

কীভাবে বাংলাদেশের জুলাইয়ের হতাহতের তালিকা প্রমাণ নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন তুলেছিল

১০

জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে অভিযোগকারীকে আসামি এবং ভিকটিমকে বিবাদী করার অভিযোগ

১১

জুলাই শহীদ গেজেটে আন্দোলন-বহির্ভূত মৃত্যুর নাম যেভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো

১২

হাঁড়ি জ্বলছে না বাসায়, ঢাকা জুড়ে চরম গ্যাস সংকট

১৩

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি, উত্তপ্ত চট্টগ্রাম-ফেনী / হবিগঞ্জে বাধার পর সিলেটেও এনসিপির গাড়িবহরে হামলা

১৪

আবু সাঈদ হত্যা / এক মৃত্যুর হাজারো প্রশ্ন

১৫

‘ভারতীয় এজেন্ট’ আতঙ্ক ও শহীদ গেজেট বিতর্ক

১৬

কওমি মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ও জঙ্গিবাদ: এক অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র

১৭

গ্রিন ইয়ার্ডের আড়ালে রক্তের দাগ / জাহাজভাঙায় শতকোটির বিনিয়োগেও থামছে না মৃত্যু

১৮

অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় শেষ হলো ‘বর্ষামঙ্গল উৎসব ১৪৩৩’

১৯

তীব্র গ্যাসসংকটে ধুঁকছে শিল্পখাত, উৎপাদনে স্থবিরতায় চরম ভোগান্তিতে গ্রাহক

২০