

১৯৭৫ সালে যে দেশে গড়ে একজন নারী ৬টির বেশি সন্তান জন্ম দিতেন, সেই বাংলাদেশে ২০১১ থেকে ২০২২ পর্যন্ত মোট প্রজনন হার (টিএফআর) স্থির ছিল ২.৩-এ। কিন্তু ২০২৫ সালের জরিপে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.৪-এ — স্বাধীনতার পর দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রথম কোনো দেশে জন্মহার বাড়ল। জনসংখ্যাবিদদের ভাষায়, সামান্য এই ০.১-এর বৃদ্ধিই আসলে বিপদঘণ্টা।
ইউটার্নের নেপথ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভাঙন
জাতিসংঘ শিশু তহবিল ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যৌথ জরিপ অনুযায়ী, গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার (সিপিআর) ২০১৯ সালের ৬২.৭ শতাংশ থেকে নেমে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৮.২ শতাংশে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ৫৪ হাজার ২২৫টি পদের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার ৫৫০টি অর্থাৎ ২৭ শতাংশ পদই শূন্য। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশে কনডম, খাবার বড়ি ও ইনজেকশনের মজুত পুরোপুরি শূন্য হয়ে পড়েছিল। সাভারের এক পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, চার-পাঁচ মাস ধরে তাদের কাছে কনডমের সরবরাহ নেই। কিশোরী মায়ের জন্মহারও বেড়েছে — প্রতি হাজারে ৮৩ থেকে ৯২-এ।
কারা কম ব্যবহার করছেন গর্ভনিরোধক
গত ৮ই আগস্ট একটি সম্মেলনে অর্থনীতি বিভাগ ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) ২০২২-এর তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। ১৬ হাজারের বেশি বিবাহিত, উর্বর ও অগর্ভবতী নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, জাতীয় পর্যায়ে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ৭১.১ শতাংশ — শহরে ৭৩.৬ শতাংশ, গ্রামে ৬৯.৮ শতাংশ। গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ ফল একটি "সম্পদ প্যারাডক্স" — সবচেয়ে ধনী পরিবারের নারীরা সবচেয়ে দরিদ্র নারীদের তুলনায় গ্রাম পর্যায়ে ২৭ শতাংশ ও জাতীয় পর্যায়ে ২১ শতাংশ কম গর্ভনিরোধক ব্যবহার করছেন, যদিও শহরে এই পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়। শিক্ষা এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী নির্ণায়ক — উচ্চশিক্ষিত নারীদের ব্যবহারের প্রবণতা শিক্ষাহীনদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিভাগীয় পর্যায়ে সিলেট সবচেয়ে পিছিয়ে, বরিশালের তুলনায় জাতীয় পর্যায়ে ব্যবহারের হার প্রায় ৫৪ শতাংশ কম, ঢাকা ও চট্টগ্রামও উল্লেখযোগ্য পিছিয়ে। সন্তানসংখ্যা ও ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক হিসেবে উঠে এসেছে — চার বা তার বেশি সন্তান থাকা নারীদের ব্যবহারের সম্ভাবনা নিঃসন্তান নারীদের তুলনায় প্রায় সাড়ে আট গুণ বেশি — অর্থাৎ ব্যবহার মূলত চাহিদা-চালিত, সরবরাহ-চালিত নয়।
উপাত্ত যা বলছে
গবেষকদের মডেলে ধর্ম বা সম্পদের চেয়ে সন্তানসংখ্যা ও প্রজনন-ইচ্ছাই বহুগুণ বেশি প্রভাবশালী প্রমাণিত হয়েছে। মডেলের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ে গবেষকরা এইউসি (AUC) মান পেয়েছেন ০.৮৪১, যা "চমৎকার" মানের নির্দেশক, আর বহু-সমরৈখিকতা পরীক্ষায় কোনো ভেরিয়েবলই ঝুঁকিসীমা অতিক্রম করেনি। এর আগে বিএমসি উইমেন্স হেলথ জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় (বিডিএইচএস ২০১৭-১৮ ভিত্তিক) দেখা গিয়েছিল, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ উভয় সমস্যায় ভোগা নারীদের মধ্যে আধুনিক পদ্ধতির বদলে তুলনামূলক কম কার্যকর ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির ব্যবহার প্রায় ৩১ শতাংশ বেশি। এই তথ্য প্রমাণ করে, শুধু গর্ভনিরোধক সহজলভ্য করাই যথেষ্ট নয় — সঠিক পরামর্শ ও মানসম্পন্ন সেবাও সমান জরুরি।
সুপারিশ
গবেষক দলের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথমত সিলেট ও ময়মনসিংহের মতো পিছিয়ে পড়া বিভাগে বাড়তি নজর দরকার, কারণ শিক্ষা বা সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এই অঞ্চলের নারীরা পিছিয়ে। দ্বিতীয়ত, শহরের তুলনায় গ্রামেই কাঠামোগত বৈষম্য বেশি বলে গ্রামীণ এলাকায় ঘরে ঘরে সেবা পৌঁছে দেওয়ার মডেল পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ধনী-দরিদ্র উভয়ের ব্যবহারের হার কাছাকাছি চলে আসায় এখন শুধু বিনামূল্যে সরবরাহ নয়, মানসম্পন্ন কাউন্সেলিং ও পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুযোগই বেশি জরুরি। চতুর্থত, নারীশিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সবশেষে, নতুন দম্পতিদের বিয়ের শুরুতেই পরিবার পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করতে হবে, কারণ বর্তমানে বেশিরভাগ নারী সন্তান জন্মদান "থামাতে" গর্ভনিরোধক শুরু করেন, শুরু থেকে ব্যবধান রাখতে নয়। গবেষকদের ভাষায়, বাংলাদেশ ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান মোটামুটি ঘুচিয়েছে, এখন লক্ষ্য আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবধান ঘোচানো — তা করা গেলেই টিএফআরের (Total Fertility Rate) এই উল্টো যাত্রা রোধ করে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র
মন্তব্য করুন