

পাকিস্তানের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর প্রভাব নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জেনারেল আসিম মুনির যেভাবে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন, তাতে করে দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটি কি আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানের মুখোমুখি—এমন প্রশ্ন জোরদার হয়ে উঠেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আসিম মুনিরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোহসিন নাকভির সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য এবং ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই জল্পনা-কল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
একচ্ছত্র ক্ষমতার কেন্দ্রে আসিম মুনির
পাকিস্তান সরকারের আড়ালে থেকে মূলত নীতি-নির্ধারণী মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন সেনা প্রধান আসিম মুনির। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি থেকে শুরু করে বর্ষা মোকাবিলা প্রস্তুতি, এমন কি দেশের পারমাণবিক অস্ত্রের তদারকি—সবক্ষেত্রেই তার প্রত্যক্ষ নজরদারি রয়েছে। ভারতের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ নানা কৌশলগত পদক্ষেপের পর আসিম মুনিরের রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুসংহত হয়। সাম্প্রতিক আইনি সংস্কারের মাধ্যমে তার অবসরের সীমা সম্পর্কিত বিধিনিয়ম ফেডারেল সরকারের ইচ্ছাধীন করায় কার্যত অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন ৫৮ বছর বয়সী এই সেনা কর্মকর্তা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিস্ফোরক মন্তব্য ও ‘ভেঙে পড়া’ শাসনব্যবস্থা
পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিকে ঘিরে গুঞ্জন তীব্র হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভির বক্তব্যে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, পাকিস্তানের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা কার্যত ‘ভেঙে পড়েছে’।
দীর্ঘদিন সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকা নাকভি সক্রিয় রাজনীতিতে না থেকেও হঠাৎ সিনেট ও মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পান। একই সঙ্গে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) প্রধান পদ সামলানো নাকভিকে সেনা সদরের অতি ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাকভির মুখ দিয়ে মূলত রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দপ্তরই তাদের মনের কথা প্রকাশ করছে। 'ডন'-এর কলামনিস্ট ইউসুফ নজরের মতে, “নাকভির বক্তব্য সামরিক নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। তবে সমস্ত ক্ষমতা নিজেদের হাতে নেওয়ার পর শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ হলে এর দায়ভার ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এড়াতে পারবেন না।”
নরম অভ্যুত্থান না প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন?
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তান এ পর্যন্ত চারবার (১৯৫৮, ১৯৬৯, ১৯৭৭ ও ১৯৯৯ সালে) প্রত্যক্ষ সামরিক অভ্যুত্থান ও সামরিক আইন দেখেছে। বর্তমানে ইমরান খান বন্দি থাকা এবং শাহবাজ শরিফের দুর্বল জোট সরকারের ওপর ভর করে পাকিস্তান মূলত এক প্রকার ‘হাইব্রিড’ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তবে সাবেক সেনাকর্মকর্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ ধারণা করছেন, পাকিস্তানে সরাসরি সামরিক আইন জারির বদলে এক ধরণের ‘গণতান্ত্রিক আবরণ’ বা অনুগত বেসামরিক সরকারের মাধ্যমে নতুন ব্যবস্থা চালু হতে পারে। অন্যদিকে, লেখক আয়েশা সিদ্দিকাসহ অনেক বিশ্লেষক মনে করেন—সামরিক বাহিনীর জন্য বর্তমানে দুটি পথ খোলা রয়েছে: হয় ব্যারাকে ফিরে গিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, নয়তো সরাসরি শাসনভার গ্রহণ করা। কারণ পর্দার আড়াল থেকে দেশ পরিচালনা করে পাকিস্তানের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট কাটানো সম্ভব হচ্ছে না।
অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও ভূরাজনৈতিক সংকট
বর্তমানে পাকিস্তান বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে:
সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির এই টানাটানিতে পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের অসন্তোষ চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। রাওয়ালপিন্ডি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের হাতে নেবে, নাকি অনুগত প্রশাসন দিয়ে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে—তা দেখতে আন্তর্জাতিক মহল গভীরভাবে নজর রাখছে।
মন্তব্য করুন