

মার্কিন নিরাপত্তা নীতির ওপর দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট এবং ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। গত শুক্রবার সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এক ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যা ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত।
চুক্তির রূপরেখা অনুযায়ী, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে তাদের সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। যেকোনো বহিঃশত্রুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং তিন দেশের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যেই এই ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ওয়াশিংটনের ওপর অনাস্থা ও বিকল্প সন্ধান
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ঐতিহ্যগত মার্কিন নির্ভরতা এখন নজিরবিহীন চাপের মুখে। ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মিত্র দেশগুলোর মনে সংশয় তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত, যুদ্ধ পরিচালনা এবং সংকট নিরসনে বারবার অবস্থান পরিবর্তনের কৌশল এই আস্থার সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। মার্কিন প্রশাসন বা তাদের মিত্ররা আঞ্চলিক সহযোগীদের নিরাপত্তাঝুঁকিকে পাশ কাটিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই অঞ্চলে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছিল।
ইরান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির প্রভাব
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে ইরানি বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিতে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। পাশাপাশি, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ রাখার তেহরানের সিদ্ধান্তে স্থানীয় অর্থনীতিতে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। জ্বালানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতেও আঘাত আসে। অথচ এই সংকটময় মুহূর্তে ওয়াশিংটন তার মিত্রদের পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ জোগাতে ব্যর্থ হয়, কারণ এর সিংহভাগই ইসরায়েলের সুরক্ষায় নিয়োজিত ছিল। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের সুরক্ষার তাগিদেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিকল্প বলয় তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।
যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেওয়া নয়, কৌশলগত বিকল্প বৃদ্ধি
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই চুক্তি আমেরিকার বিকল্প হিসেবে বা যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে তৈরি হয়নি। কারণ, ওয়াশিংটনের সঙ্গে এসব দেশের দীর্ঘদিনের মিত্রতা রয়েছে এবং মার্কিন সামরিক শক্তির সমকক্ষ পূর্ণাঙ্গ কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে আঞ্চলিকভাবে অনুপস্থিত। বরং ওয়াশিংটনের ওপর একচ্ছত্র নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের কৌশলগত ও নীতিগত নিরাপত্তা বিকল্পগুলোর পরিধি বাড়াতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কেবল একটি সামরিক জোট হিসেবে না দেখে, আঞ্চলিক দেশগুলোর স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার একটি ‘আদর্শগত প্রতিরোধ’ ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা। যুদ্ধোত্তর মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে গড়ার ক্ষেত্রে একে একটি বড় ভূরাজনৈতিক সংকেত বলেই মনে করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন