

সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে গ্রেপ্তার না দেখাতে এবং কোনো ধরনের হয়রানি না করতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদন নিষ্পত্তি করে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের আপিল বিভাগ এই আদেশ দেন। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এই আদেশের ফলে সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া খায়রুল হককে গ্রেপ্তার না দেখানোর নির্দেশ কেবল তাঁর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য থাকবে।
আদালতের বক্তব্য ও আইনজীবীদের বক্তব্য
রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহদি হাসান চৌধুরী জানান, এ বি এম খায়রুল হকের শারীরিক অসুস্থতা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাষ্ট্রপক্ষের করা ‘লিভ টু আপিল’ (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে হাইকোর্টে মূল রিট মামলাটির রুল দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন, খায়রুল হকের ক্ষেত্রে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ (গ্রেপ্তার দেখানো) বিষয়ে এই আদেশ অন্য কোনো মামলার ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে প্রযোজ্য হবে না। কারণ, অন্য মামলায় শ্যোন অ্যারেস্টের বিষয়ে আগেই আপিল বিভাগের লিভ মঞ্জুর করা আছে। লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ায় সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া তাঁকে গ্রেপ্তার না দেখানোর অন্তর্বর্তীকালীন আদেশটি বহাল রইল।
খায়রুল হকের আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহীন জানান, সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া গ্রেপ্তার না দেখাতে ও হয়রানি না করার হাইকোর্টের আদেশ আপিল বিভাগ বহাল রেখেছেন এবং রুলটি হাইকোর্টে দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালতে খায়রুল হকের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী, সারা হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান খান, আইনজীবী মাহবুব শফিক ও মোনায়েম নবী শাহীন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহদি হাসান চৌধুরী।
মামলার পটভূমি ও আইনি প্রক্রিয়া
• মূল গ্রেপ্তার: গত বছরের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে এ বি এম খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ীতে যুবদলকর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। • দফায় দফায় গ্রেপ্তার দেখানো: পৃথক মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর গত ৩০ মার্চ রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও আদাবর থানার দুটি হত্যা মামলায় তাঁকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। • রিট দায়ের: এভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ১৩ মে খায়রুল হকের ছেলে আইনজীবী আশিক উল হক হাইকোর্টে রিট করেন। • হাইকোর্টের আদেশ ও আপিল: ১৭ মে রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারির পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া তাঁকে গ্রেপ্তার না দেখানো ও হয়রানি না করার নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষ এই আদেশ স্থগিত চেয়ে চেম্বার আদালতে আবেদন ও লিভ টু আপিল করে, যা পরবর্তীতে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে।
বর্তমান আইনি অবস্থা ও ইতিহাস
আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহীন জানান, ছয়টি মামলায় জামিন পাওয়ার পর নতুন করে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া শুরু হলে রিটটি করা হয়েছিল। হাইকোর্টের ১৭ মে’র আদেশের পর আরও তিনটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৯টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ৮টিতেই তিনি জামিন পেয়েছেন।
উল্লেখ্য, এ বি এম খায়রুল হক ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) বাতিল ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন।
মন্তব্য করুন