

১৯৭১ সালের মে মাস নাগাদ বাংলাদেশের বুকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বর্বরতা যখন চরম রূপ নেয়, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের পাপ ঢাকতে মরিয়া হয়ে ওঠে ইসলামাবাদ। কিন্তু রক্তক্ষয়ী এই মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস কেবল রণক্ষেত্রের অস্ত্রের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর পেছনে ছিল দেশ-বিদেশের বহু মানুষের একক ও মিলিত চেষ্টা, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ এবং তীব্র কূটনৈতিক যুদ্ধ। একাত্তরের ১৮ মে ছিল এমনই এক দিন, যেদিন পাকিস্তানের সুপরিকল্পিত মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার ও বিশ্ববিবেক।
পাকিস্তানের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের তীব্র প্রতিবাদ
একাত্তরের ১৮ মে পাকিস্তানের অব্যাহত ও পরিকল্পিত মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য বিভাগ। তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বিশ্ববাসীকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে কোনো স্বাধীনতা আন্দোলন হচ্ছে না, বরং ব্যাপক জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দমন করতেই সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হয়েছে।
এই জঘন্য অপপ্রচারের কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য বিভাগ বিবৃতিতে উল্লেখ করে, ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইয়াহিয়ার এই মিথ্যাচার বিশ্ববাসী মোটেও বিশ্বাস করেনি। আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ক্ষুণ্ন হওয়া মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং বাঙালিদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বিকৃত করতেই সামরিক জান্তা এই অসত্যের আশ্রয় নিয়েছে। বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের নৃশংস ও পদ্ধতিগত আচরণে বাংলাদেশে ইতিমধ্যে অন্তত ১০ লাখ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য হয়েছেন।
মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলো ঘুরে আসা বিদেশি সাংবাদিকদের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, বাঙালিরা কোনো জাতিগত বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধায়নি। বরং সত্য এই যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যেদিকেই গেছে, সেদিকেই বাঙালিদের হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের কাজে স্থানীয় অবাঙালি দোসরদের লেলিয়ে দিয়েছে। অন্য এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সরকার সাফ জানিয়ে দেয়, ২৬ মার্চ পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করা ৪০ জন বিদেশি সাংবাদিকের কেউই বাংলাদেশে কোনো অবাঙালি মুসলিম হত্যার ঘটনা দেখেননি; সুতরাং পাকিস্তানের এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।
বিশ্বমঞ্চে সত্যের উন্মোচন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে বৌদ্ধ নেতাদের আকুতি
পাকিস্তানি জান্তার বর্বরতা যে কতটা সর্বগ্রাসী ছিল, তা উঠে আসে তৎকালীন পাকিস্তান বৌদ্ধ পরিষদের সভাপতি জ্যোতিপাল মহাথেরোর নেতৃত্বে পাঁচজন বৌদ্ধ নেতার এক আর্তআবেদনে। তাঁরা বিশ্ববাসীর কাছে অভিযোগ করেন, পূর্ব বঙ্গে নির্বিচারে লাখ লাখ মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে। অধিকাংশ বৌদ্ধমঠ ধ্বংস করা হয়েছে এবং কুমিল্লাতেই ৬ জন বৌদ্ধধর্মাবলম্বীকে নৃশংসভাবে খুন করেছে পাকিস্তানি সেনারা। তাঁরা এই পদ্ধতিগত গণহত্যার বিরুদ্ধে সমগ্র পৃথিবীর মানুষের সহানুভূতি ও হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করেন।
ভারতের হুঁশিয়ারি: ‘জাতীয় স্বার্থে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব’
এদিকে বাংলাদেশে পাকিস্তানি নৃশংসতার ফলে ভারতে শরণার্থীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছিল, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। ১৮ মে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এক কড়া বিবৃতিতে বলেন:
"ভারতের ওপর পাকিস্তান কোনো পরিস্থিতি চাপিয়ে দিলে আমরা তা মোকাবিলা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ভারতে শরণার্থীর ক্রমবর্ধমান হার এই অঞ্চলের শান্তির পক্ষে এক বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভারত তার নিজের জাতীয় স্বার্থে চরম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।"
পূর্ববঙ্গে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে পাকিস্তানের দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিকই হবে, তবে পাকিস্তান কেন ভারত থেকে সমস্ত শরণার্থীকে অবিলম্বে সসম্মানে দেশে ফিরিয়ে নিচ্ছে না?
একই দিনে পিটিআই-এর এক খবরে জানা যায়, ভারত পশ্চিমা শক্তিগুলোকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে, বাংলাদেশের পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে নির্দিষ্ট কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তা বিশ্বনেতাদের এখনই ভাবতে হবে। কারণ পাকিস্তান ভারতকে এক চরম সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে।
রণক্ষেত্রের পাশাপাশি ভারতের সাধারণ মানুষও তখন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। দিল্লির এক অনন্য নজিরে, ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মচারীদের পত্নী সমিতি এদিন দিল্লিতে 'বাংলাদেশ সহায়ক কমিটি'-কে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার একটি চেক প্রদান করে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মুখ্য সচিব পি এন হাকসারের স্ত্রী ঊর্মিলা হাকসার এই চেকটি পদ্মজা নাইডুর হাতে তুলে দেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: ওয়াশিংটন ও স্টকহোমের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে পাকিস্তানের পক্ষে ওয়াশিংটনের অন্ধ সমর্থনের তীব্র সমালোচনা করেন মার্কিন সিনেটর ফ্রাঙ্ক চার্চ। তিনি সাফ জানান, যদি যুক্তরাষ্ট্র আসলেই নিরপেক্ষ থাকতে চায়, তবে অবিলম্বে পাকিস্তানে সব ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধ করতে হবে। নির্বাচনে জয়ী নেতাদের হত্যা এবং পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর অত্যাচার চালানোর ঘটনাকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মার্কিন প্রশাসন যে অজুহাত দিচ্ছে, তা প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানান তিনি।
তবে জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহী অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিটির বৈঠকে ভারতের সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করার অপচেষ্টা চালান এবং দাবি করেন, পূর্ব পাকিস্তান থেকে কোনো শরণার্থী ভারতে যায়নি। এমনকি তিনি মার্কিন সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান জে উইলিয়াম ফুলব্রাইটকে চিঠি দিয়ে দাবি করেন, বাংলাদেশে জনতা লুটতরাজ শুরু করায় সেনাবাহিনী কেবল 'আইনশৃঙ্খলা' রক্ষার জন্য বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু পাকিস্তানের এই মিথ্যাচার ইউরোপের গণমাধ্যমে ধোপে টেকেনি। সুইডেনের স্টকহোম থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত দৈনিক ডিজেনস নাইটার ১৮ মে এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে পাকিস্তানকে সব রকমের সাহায্য বন্ধ করার জোর দাবি জানায়। ‘পাকিস্তান ও আমাদের সাহায্য’ শিরোনামের সেই সম্পাদকীয়তে বলা হয়:
"হত্যাকাণ্ড শুরু হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানে আর কোনো আইনের শাসন নেই। সেখানকার স্বৈরশাসকেরা বাইরের দেশের সাহায্য নিয়ে সাধারণ মানুষ হত্যা করছে এবং আর্তদের জন্য পাঠানো আন্তর্জাতিক সাহায্য ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করছে। এমতাবস্থায় সেই খুনি দেশকে সুইডেনের সাহায্যদান অব্যাহত রাখার অর্থ কী?"
ভুট্টোর ক্ষমতার লোভ ও আমলাতান্ত্রিক রদবদল
পশ্চিম পাকিস্তানে বসে পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো অবশ্য স্বীকার করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান সংকট দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট এবং আমলাতন্ত্র দিয়ে এর কোনো সমাধান হবে না। পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর এই মন্তব্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের তাগিদ থাকলেও, ভেতরে ভেতরে ভুট্টো কেবল পশ্চিম পাকিস্তানেই নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার নীল নকশা আঁকছিলেন।
একই দিনে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে প্রাদেশিক সরকারের শীর্ষ পদগুলো থেকে বাঙালিদের সরিয়ে দেয় পাকিস্তান সরকার। পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি, পুলিশের আইজি, বিভাগীয় কমিশনারসহ বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও এসপি-কে তড়িঘড়ি করে পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি করা হয় এবং অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সেসব গুরুত্বপূর্ণ পদে পশ্চিম পাকিস্তানি অনুগত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রিয়ভূমি আর্কাইভ টীকা (কূটনৈতিক যুদ্ধ ও ১৮ এপ্রিলের পটভূমি)
একাত্তরের মে মাসের এই তীব্র কূটনৈতিক লড়াইয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল মূলত এক মাস আগে, ১৮ এপ্রিল ১৯৭১ সালে। সেদিন কলকাতার ৯ নম্বর সার্কাস অ্যাভিনিউতে পাকিস্তানি উপ-দূতাবাসের ডেপুটি হাইকমিশনার এম হোসেন আলীর নেতৃত্বে ৬৫ জন বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারী একযোগে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে প্রবাসে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। মে মাসে এসে পাকিস্তানি জান্তা যখন বিশ্বজুড়ে গণহত্যার দায় এড়াতে মরিয়া, তখন এপ্রিলের সেই ঐতিহাসিক পতাকা উত্তোলন এবং হোসেন আলীর বিশ্ব কাঁপানো সংবাদ সম্মেলনই আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের মিথ্যাচারের দেওয়াল ধসিয়ে দিতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছিল।
১৮ মে ১৯৭১-এর এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার লাল সূর্যটি কেবল গুটিকয়েক রণাঙ্গনে নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বিশ্বজনমত এবং সত্যের অবিচল শক্তির ওপর ভর করে অর্জিত হয়েছিল।
তথ্যসূত্র
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: নবম ও একাদশ খণ্ড (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়)।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস (সেক্টর এক ও দুই)।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি — ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম।
The British, The Bandits and the Borderman — কে এফ রুস্তমজী (K F Rustamji)।
তৎকালীন সমসাময়িক পত্রিকা:
দৈনিক পূর্বদেশ (১৯ মে ১৯৭১)
দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত (১৯ ও ২০ মে ১৯৭১)
দৈনিক যুগান্তর, ভারত (১৮, ১৯ ও ২০ মে ১৯৭১)
দৈনিক পাকিস্তান (২১ এপ্রিল ১৯৭১)
ডিজেনস নাইটার (Dagens Nyheter), সুইডেন (১৮ মে ১৯৭১-এর সম্পাদকীয়)
পাকিস্তান অবজারভার (১৮ মে ১৯৭১)
মন্তব্য করুন