

১৯৭১ সালের ১১ মে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে দিনটি ছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং দেশের অভ্যন্তরে বীরত্বপূর্ণ লড়াই ও বর্বরতার এক সংমিশ্রণ। একদিকে মার্কিন সিনেটে এডওয়ার্ড কেনেডির ঐতিহাসিক ভাষণ, অন্যদিকে বাংলার জনপদে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ—সব মিলিয়ে একাত্তরের এই দিনটি ছিল বিশ্ববিবেকের কাছে এক বড় পরীক্ষা।
১. মার্কিন সিনেটে এডওয়ার্ড কেনেডির জোরালো আহ্বান
একাত্তরের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ) চলমান সহিংসতার বিরুদ্ধে এক জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে যে নৃশংসতা চলছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। কেনেডি বলেন:
“নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে এই মানবিক সংকট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। লাখ লাখ আর্তমানবের জীবন রক্ষা করা বিশ্বের প্রতিটি সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।”
তিনি ভারত অভিমুখে ধাবমান কোটি শরণার্থীর সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য বিশ্বনেতৃবৃন্দের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির অনুরোধ করেন।
২. ব্রিটেনের উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ তৎপরতা
একই দিনে ব্রিটিশ কমন্স সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার অ্যালেক ডগলাস হোম পাকিস্তানের চরম অর্থনৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় তলানিতে ঠেকায় পাকিস্তান দেউলিয়া হওয়ার পথে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সমিতি গঠন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দেয় ব্রিটেন। অন্যদিকে, জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন মহাসচিব উ থান্ট-এর সাথে সাক্ষাৎ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর মানবেতর জীবনযাপন ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন।
৩. ভারতের সহমর্মিতা ও সংহতি
বাংলাদেশের মানুষের লড়াইকে সমর্থন জানাতে ভারতের সাধারণ মানুষ এদিন অভূতপূর্ব সংহতি প্রদর্শন করে।
পাঞ্জাব কেশরী ও হিন্দ সমাচার: পত্রিকা দুটির স্বত্বাধিকারী লালা জগৎ নারায়ণ ১ লক্ষ টাকার চেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ত্রাণ তহবিলে তুলে দেন।
ব্যাংক কর্মচারীদের সংহতি: পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের প্রায় ২ লক্ষ ব্যাংক কর্মচারী এদিন 'বাংলাদেশ দিবস' পালন করেন। কলকাতায় ব্যাংক কর্মচারীরা মিছিল নিয়ে বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশনের সামনে সমবেত হন এবং ৮০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
৪. দেশের অভ্যন্তরে প্রতিরোধ ও বর্বরতা
১৯৭১ সালের ১১ মে রণক্ষেত্রগুলোতে মুক্তিযোদ্ধারা যেমন পরাক্রম দেখিয়েছেন, তেমনি পাকিস্তানি বাহিনী মেতেছিল নারকীয় হত্যাযজ্ঞে।
শুভপুর সেতু ও মীরগঞ্জ যুদ্ধ: চট্টগ্রামের শুভপুর সেতুর দুই পাড়ে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধ হয়। কুমিল্লার মীরগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
হাতিয়ায় হত্যাযজ্ঞ: এদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ দখল করে নেয় এবং সেখানে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়।
গোপালগঞ্জের মানিকহার: গোপালগঞ্জের মানিকহার গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটিতে পাকিস্তানি সেনারা চারপাশ থেকে ঘিরে হামলা চালায়, যার ফলে উভয় পক্ষে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।
ঢাকার চিত্র: রাজধানী ঢাকায় এদিন দখলদার বাহিনীর সহযোগিতায় শান্তি কমিটির ২৫টি ইউনিয়ন শাখা গঠন করা হয়, যা মুক্তিকামী মানুষের জন্য এক বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
৫. পাকিস্তান ও মুসলিম বিশ্বের তৎপরতা
পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার নামে এদিন নুরুল আমিন ও নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্যদিকে, বিশ্ব মুসলিম কংগ্রেস (জর্ডান) ভারতের ভূমিকার প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভি ভি গিরিকে তারবার্তা পাঠায়, যা ছিল মূলত সত্য গোপনের এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
১১ মে ১৯৭১ ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। একদিকে এডওয়ার্ড কেনেডির মতো বিশ্বনেতাদের সমর্থন বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে আন্তর্জাতিকভাবে জোরালো করেছিল, অন্যদিকে তৃণমূলের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ এটি পরিষ্কার করে দিয়েছিল যে—বিজয় সুনিশ্চিত।
তথ্যসূত্র
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস (সেক্টর ১, ২, ৩ ও ৯)
দৈনিক পূর্বদেশ, ১২ মে ১৯৭১
আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ১২ মে ১৯৭১
একাত্তরের দিনপঞ্জি: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আর্কাইভ
মন্তব্য করুন