ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৩ মে ১৯৭১: অবরুদ্ধ স্বদেশ ও বিশ্ববিবেকের আর্তনাদ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬, ০৩:১২ পিএম
৩ মে ১৯৭১: অবরুদ্ধ স্বদেশ ও বিশ্ববিবেকের আর্তনাদ

১৯৭১ সালের ৩ মে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নৃশংসতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার এক সংমিশ্রিত দিন। একদিকে পাক-হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যায় ঢাকার রাজপথ থেকে নাটোরের নিভৃত গ্রাম রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, অন্যদিকে বিশ্বনেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বাংলাদেশের এই মানবিক বিপর্যয়ে বিচলিত হয়ে জোরালো অবস্থান নিতে শুরু করেছিল।

১. ঢাকার চিত্র: এক জীবন্ত মৃত্যুপুরী

৩ মে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘টাইম ম্যাগাজিন’ ঢাকাকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল— ‘ঢাকা এখন মৃত্যুপুরী’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা এখন এক বিপজ্জনক শহর। চারদিকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার টহল আর সাধারণ মানুষের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন শহরটিকে একটি গোরস্তানে পরিণত করেছে।

একই দিন সামরিক কর্তৃপক্ষ এক ফরমান জারী করে মহাখালী থেকে ডিআইটি রোড এবং পুরনো ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের ৫ মে’র মধ্যে ঘরবাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেয়। এছাড়া ছাত্র আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজসহ সাত ছাত্রনেতাকে সামরিক আদালতের সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

২. নাটোর ও ঝালকাঠিতে বর্বরতা ও প্রতিরোধ

এই দিনে নাটোরের ধলা গ্রামের বনপাড়া মিশনে আশ্রয় নেওয়া ৮৬ জন নিরীহ মানুষকে পাক-বাহিনী আটক করে। সন্ধ্যায় তাদের নাটোর-দত্তপাড়া সংলগ্ন ফতেঙ্গাপাড়ায় নারদ নদের তীরে নিয়ে পৈশাচিক নির্যাতনের পর ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে, ঝালকাঠির কীর্তিপাশায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটিতে পাক-বাহিনী হামলা চালালে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মুক্তিযোদ্ধারা রণকৌশল হিসেবে মাদ্রা, ভিমরুলীসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে পৃথক ক্যাম্প স্থাপন করে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।

৩. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিধ্বনি

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: মার্কিন সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি সিনেটে ভাষণ দিতে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে চলা গণহত্যাকে ‘অসহনীয়’ বলে অভিহিত করেন এবং জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। একই দিনে কলকাতায় মার্কিন প্রতিনিধি সভার সাব-কমিটির চেয়ারম্যান কর্নেলিয়াস গ্যালাঘর শরণার্থীদের সাথে কথা বলে শিউরে ওঠেন। তিনি স্পষ্ট জানান, এটি আর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা।

ফিনল্যান্ড সম্মেলন: ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে অনুষ্ঠিত সোস্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিলের সম্মেলনে বাংলাদেশে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি জানানো হয়।

জাতিসংঘের তৎপরতা: জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আগা শাহীর সাথে বৈঠকে বসেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে চান।

৪. রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান

কমিউনিস্ট পার্টির আহ্বান: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক আবদুস সালাম মুক্তাঞ্চল থেকে এক বিবৃতিতে বিশ্বের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতি বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানের জোরালো আহ্বান জানান।

ভারতের ভূমিকা: প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে আশ্বাস দেন যে, শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত আর্থিক ব্যয় কেন্দ্রীয় সরকার বহন করবে। তিনি সীমান্ত রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীদের দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেন।

ভুট্টোর চাতুরি: পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এক সংবাদ সম্মেলনে চতুরতার সাথে দাবি করেন যে, কেবল পশ্চিম পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক, যা দেখে পূর্ব পাকিস্তানীরা উদ্বুদ্ধ হবে। এটি ছিল মূলত বাঙালিদের মূল দাবি থেকে বিচ্যুত করার একটি অপকৌশল।

৩ মে ১৯৭১ তারিখটি প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি বাহিনী কেবল অস্ত্রের জোরে একটি জাতিকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত ক্রমশ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছিল। টাইম ম্যাগাজিনের সেই ‘মৃত্যুপুরী’ ঢাকা আসলে এক নতুন জীবনের আকাঙ্ক্ষায় ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠছিল।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: ৮ম, ৯ম, ১২শ ও ১৩শ খণ্ড।

২. টাইম ম্যাগাজিন আর্কাইভ: ৩ মে, ১৯৭১ সংখ্যা।

৩. দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা ও দৈনিক পাকিস্তান: ৪ মে, ১৯৭১ (পরদিন প্রকাশিত প্রতিবেদন)।

৪. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস: ১ম ও ৭ম সেক্টর।

৫. মূলধারা ’৭১: মঈদুল হাসান।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া

জামায়াত এমপি নজরুলের বাসায় উদ্ধারকৃত চিঠিতে মরিয়মের যা লেখা

জামায়াত এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্ররোচনার মামলা

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড: কবিতা, গান ও ক্যানভাসে শরণার্থী জীবনের করুণ আখ্যান

যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ শর্ত দিল ইরান, না মানলে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধ’

নজিরবিহীন জালিয়াতি / বাংলাদেশ ব্যাংকে পদ ছাড়াই ৩৬৫ জনের নিয়োগ ও পদোন্নতি

অপ্রতিম হত্যা: কিশোর গ্যাং, অপরাধ চক্র ও পুলিশের ভূমিকা

আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

‘বারবার মামলা না দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেন’

আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

১০

সিঙ্গাপুরেও মিলল বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব / সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

১১

​​​​​​​শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ চারজনের মধ্যে ৩ জনের লাশ উদ্ধার

১২

মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সংলাপ ও নিরাপদ সমুদ্রপথের তাগিদ

১৩

গুলশানে আ’লীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৩২

১৪

সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের লাশ উদ্ধার

১৫

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

১৬

যেভাবে সমন্বিত ডিজিটাল-রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল ‘গুমচর’

১৭

শাহজালাল বিমানবন্দরের সামনে প্রবাসীর ২০০ গ্রাম স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগ

১৮

এনবিআরে বড় রদবদল: একযোগে ৩৬ অতিরিক্ত কর কমিশনার বদলি

১৯

প্রণোদনার দ্বিতীয় ধাপ: ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণে আরও ১০ ব্যাংকের চুক্তি

২০